দিশারী ডেস্ক।। ২৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগ। কাউন্টারের সামনে অসংখ্য রোগী ও তাদের স্বজন। ভিড় ঠেলে ঘামে ভেজা মুখ নিয়ে বেরিয়ে এলেন নোয়াখালী সদর উপজেলা কাদির হানিফের বয়োবৃদ্ধ জালাল উদ্দিন। ডাক্তার দেখাতে আসেন সকাল-সকাল। বহির্বিভাগের একটি টিকিট কেটে ডাক্তারও দেখান। চারটি ওষুধ লিখে দিয়েছেন ডাক্তার। কিন্তু হাসপাতালের সরকারি ফার্মেসি থেকে তাকে দেয়া হয়েছে মাত্র এক পাতা ওষুধ। অন্যগুলো কিনে নিতে বলা হয়েছে বাইরে থেকে।
———————————————————–
নোয়াখালীর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল
———————————————————–
জালাল উদ্দিনের কণ্ঠে অসহায়ত্ব, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কথা কে শোনে ! আমরা গেলে ফার্মেসি থেকে ওষুধ দিতে চায় না। কিন্তু হাসপাতালের নার্স বা স্টাফরা এলে তাদের সব ওষুধ দেয়া হয়। পাশেই এক নার্সকে দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ওই নার্স আমার পরে এসেও অনেক ওষুধ নিয়ে গেলেন।
একই রকম ক্ষোভ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা করিম মিয়ারও। প্রেসক্রিপশনে পাঁচটি ওষুধ লেখা থাকলেও হাসপাতাল থেকে মিলেছে শুধু প্যারাসিটামল। সরকারি হাসপাতালে নার্স, স্টাফ আর তাদের স্বজনদের কারণেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ওষুধ পাচ্ছে না বললেন তিনি।
শুধু জালাল উদ্দিন বা করিম নন, নোয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শত-শত সাধারণ রোগীর প্রতিদিনের চিত্র এটি। বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রেসক্রিপশন নিয়েই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালের তথ্য, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) মাধ্যমে এবং স্থানীয় দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হয়েছিল কয়েক কোটি টাকার ওষুধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ আরও বাড়িয়ে অনেক টাকার ওষুধ কেনা হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইডিসিএল কিনেছে কয়েক কোটি টাকার ওষুধ। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে আরো কোটি টাকার ওষুধ কেনার কথা রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয় শতাধিক ধরনের ওষুধ। এর মধ্যে ইডিসিএল থেকে আসে আরো অনেক ধরনের ওষুধ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় অর্থে টেন্ডারের মাধ্যমে অবশিষ্ট প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা হয়। সব মিলিয়ে হাসপাতালটিতে মাত্র কয়েকটি ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসাসেবা নেয় দেড় থেকে দুই হাজার রোগী। দুই মাস ধরে এখানে চলছে তীব্র ওষুধ সংকট। স্টোরে সব ওষুধ নেই, সরবরাহ নেই সরকারি ফার্মেসিতেও। দ্রুত ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়ার মূলে রয়েছে, বরাদ্দের সিংহভাগ চলে যায় ‘ ভেতরের’ মানুষের কাছে— অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ তুলছেন হাসপাতালের স্টাফ, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সিং স্টুডেন্টরা। হাসপাতালে বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও স্টুডেন্ট নার্সের সংখ্যা কয়েক শত। এ ছাড়া চিকিৎসক, সরকারি নার্স, কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবক মিলিয়ে কর্মরত আরও কয়েক শতাধিক কর্মী। এই কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেশিরভাগের নজর থাকে সরকারি ওষুধের দিকে। তারা কোনো ¯িøপ বা অনুমোদন ছাড়াই নিজের ও স্বজনদের জন্য প্রয়োজনের বেশি ওষুধ তুলে নিচ্ছেন। ফলে ওষুধ মিলছে না সাধারণ রোগীদের।
এদিকে সরকারি ওষুধের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ও খোদ হাসপাতালের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা। নার্স ও স্টাফদের অতিরিক্ত ওষুধ নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে উল্টো প্রশ্ন করেন, হাসপাতালের ওষুধের মান নিয়েই তো সংশয় রয়েছে, এই ওষুধ কে নেবে ?
ওষুধের মান নেই এমন কথা মানতে নারাজ হাসপাতালের তত্বাবধায়ক। তবে ওষুধ সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বললেন, প্রতিদিন বহির্বিভাগে আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী আসেন। এ বছরের বাজেটের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। নতুন বাজেট না এলে এই সংকট কাটবে না। নার্স ও স্টাফদের ওষুধ নেয়ার বিষয়ে তার স্পষ্ট বক্তব্য, প্রয়োজন ছাড়া নার্স বা স্টাফরা ওষুধ নিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
Leave a Reply