দিশারী ডেস্ক।। ২৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত মহাসড়কগুলো যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে জাতীয় ও আঞ্চলিক মিলিয়ে দেশের ২৫৭টি মহাসড়কের অধিকাংশ এলাকা কার্যত অরক্ষিত।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পথগুলো ধারণ করছে এক ভয়ংকর রূপ। কোথাও চলন্ত গাড়িতে রড-পাইপ ছুড়ে ডাকাতি হচ্ছে, কোথাও যাত্রীবেশে অজ্ঞান পার্টি সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে, আবার কোথাও খুনের পর লাশ ফেলে রাখা হচ্ছে সড়কের পাশে। কোরবানির পশু ও ঈদযাত্রার বিপুল অর্থপ্রবাহকে টার্গেট করে মহাসড়কে এখন উৎসব শুরু করেছে সংঘবদ্ধ ডাকাত ও চাঁদাবাজ চক্র।
—————————————————————————————-
অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য অধিকাংশ মহাসড়ক
—————————————————————————————-
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাইওয়ে পুলিশের আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হলেও পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির অভাবে মহাসড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থা এখন খাদের কিনারায়। তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৪৪৬ জন চিহ্নিত ডাকাতের সিংহভাগই জামিনে বেরিয়ে আবার অন্ধকার ট্র্যাকে ফিরে এসেছে। যাদের অধিকাংশকেই পুলিশ এখনো স্পর্শ করতে পারেনি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড, চৌদ্দগ্রাম ও কুমিল্লার বিভিন্ন অংশে এখন আতঙ্কের নাম ‘লোহার পাইপ’ গ্রুপ। খবর : অন্য দৈনিক
গত ৮ মে সীতাকুণ্ডে পুলিশের গাড়িতেও ডাকাতির চেষ্টা চালায় এরা। ৭ মে চৌদ্দগ্রামে গরুবোঝাই ট্রাক আটকে চালককে কুপিয়ে ১০টি গরু লুটে নেয় সশস্ত্র ডাকাত দল। ১৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের সলঙ্গা এলাকায় ১৪টি গরুসহ একটি ট্রাক ছিনতাই হয়। পরে আশুলিয়া এলাকা থেকে ওই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শুধু গরুবাহী ট্রাক নয়, সাধারণ যাত্রীবাহী ও ব্যক্তিগত যানবাহনও এখন ডাকাতদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। গত এপ্রিলে কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীকে খুনের ঘটনা মহাসড়ক নিরাপত্তার কঙ্কালসার অবস্থাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার থেকে কালামপুর পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার এলাকা এখন অঘোষিত ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’। এখানে অন্তত ১৫টি পয়েন্টে ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারিরা। এই এলাকায় আগে ১২০টি সিসি ক্যামেরা সচল থাকলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা সেগুলো খুলে নিয়ে গেছে। ফলে ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রযুক্তিশূন্য এই এলাকায় অপরাধীদের তৎপরতা চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট, সিঅ্যান্ডবি, রেডিও কলোনি, সাভার স্ট্যান্ড, বিশমাইল ও নবীনগর এলাকায় প্রতিনিয়ত সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ যাত্রী ও পোশাকশ্রমিকেরা।
————————————————————————————————————–
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মহাসড়কে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ‘স্টপেজ সন্ত্রাস’। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ব্যারিকেড দিয়ে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই জুটছে নির্মম মারধর।
————————————————————————————————————–
এক ট্রাকচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যেতে কয়েক জায়গায় পুলিশের নাম ভাঙিয়ে এবং স্থানীয় চক্রকে টাকা দিতেই হয়। টাকা না দিলে গাড়ি আটকে রেখে মারধরের ভয় দেখায়। সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে হাটিকুমরুল, হাটিকুমরুল-বনপাড়া এবং পাবনা-বগুড়া মহাসড়কে ডাকাত আতঙ্ক বাড়ছে। অপরাধীরা অনেক সময় ভুয়া ডিবি বা হাইওয়ে পুলিশের পোশাক পরে চেকপোস্ট সাজিয়ে অপরাধ করছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২৫৭টি মহাসড়ক রয়েছে, যা মোট ৮৮৮৮ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ১১০টি এবং আঞ্চলিক মহাসড়ক ১৪৭টি। এই বিশাল নেটওয়ার্কের মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৯৯১ কিলোমিটার এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম রয়েছে, যা মোট মহাসড়কের মাত্র ৩৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ ! বাকি দুই-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার) মহাসড়ক কার্যত অরক্ষিত।
জানা গেছে, জনবলের সংকটের কারণে দেশের প্রায় ২২টি জেলায় হাইওয়ে পুলিশের কোনো কার্যক্রমই নেই। এই অবস্থায় দিনের আলো ফুরিয়ে ব্যস্ততা কমতেই মহাসড়কগুলো অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।
জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে অপরাধীরা মহাসড়ককেই প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। মাদক কারবারিরা এখন যাত্রীবাহী দূরপাল্লার বাস, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স কিংবা জরুরি পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যানে বিশেষ চেম্বার তৈরি করে মাদক পাচার করছে। অনেক সময় পরিবহনের চালক ও শ্রমিকদের একটি অংশও এই লোভনীয় বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী হাইওয়ে পুলিশ এখনো মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ঘাটতিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে এই ইউনিটের পেশাদারিত্ব ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হাসানুল কবির বলেন, চালকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। বিশেষ করে পশুবাহী ট্রাকের ঝুঁকি এখন সবচেয়ে বেশি।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কগুলোতে টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। ঈদুল আজহা সামনে রেখে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক বা যানবাহনকে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ এসকর্ট দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। চালক ও ব্যবসায়ীদের এককভাবে না গিয়ে পুলিশের এসকর্ট দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলাচল করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে মহাসড়কে টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। একইভাবে পশুর চামড়াবাহী যানবাহনেও দেয়া হবে বিশেষ নিরাপত্তাসুবিধা।
————————————————————————————————————–
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। চন্দ্রা সড়কও আনা হয়েছে নজরদারির আওতায়। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন ইউনিট থেকে অতিরিক্ত ১ হাজার জনবল হাইওয়ে পুলিশে সংযুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এসব জনবল যুক্ত হলে দেশের প্রায় সব মহাসড়কই পুলিশি নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে। এ ছাড়া হাইওয়ে পুলিশের অধীন থাকা ৮০টি থানা ও ফাঁড়িকে টহল জোরদারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
————————————————————————————————————–
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশুবাহী যানবাহন যেন নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কে ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে এবং সার্বিক অপরাধ দমনে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছি।
Leave a Reply