স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বেড়েছে, সেবার মান বাড়েনি

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫ পাঠক

খান সাইফুল ।। ৩০ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ওঠে এসেছে রোগনির্ণয়ের যন্ত্রপাতির বড় অংশ বিকল পড়ে থাকা, রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাব এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে এই গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়।

‘ উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার দ্রুত মূল্যায়ন’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের কর্মশালায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের (এইচইইউ) অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও গবেষণা দলনেতা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এইচইইউ’র মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক।

ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউএইচসি) অর্জনে তিনটি মূল নিয়ামক রয়েছে—নীতি, অর্থ বরাদ্দ এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা। নীতি ও বাজেটের ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ের কার্যকারিতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

তিনি জানান, নয় মাসব্যাপী পরিচালিত এই গবেষণায় দেশের আটটি বিভাগের মোট ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান জরিপের আওতায় আনা হয়। এর পাশাপাশি ৯৫টি গুণগত বা ইন-ডেপ্থ সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করা হয়েছে। জরিপের আওতায় দুটি টারশিয়ারি বা বিশেষায়িত হাসপাতাল, আটটি জেলা পর্যায়ের (সেকেন্ডারি) এবং ১২টি উপজেলা ও প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল।

গবেষণায় মূলত ছয়টি বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয়েছে—রোগনির্ণয় সুবিধা, চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ, জনবল ও যন্ত্রপাতির সমন্বয়, অবকাঠামো, বাজেট প্রণয়ন সম্পর্কে ধারণা এবং তথ্যের ব্যবহার।

—————————————————————————————————————-

গবেষণার তথ্যমতে, হাসপাতালগুলোতে ডায়াগনস্টিক বা রোগনির্ণয় সেবার বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। মূলত রিএজেন্ট বা রাসায়নিকের অভাব এবং যন্ত্রপাতির অকার্যকারিতার কারণে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এক্স-রে বা ইসিজির মতো সাধারণ পরীক্ষাগুলোর ক্ষেত্রেও রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে রেডিওলজি ও ইমেজিং সেবার মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অকার্যকর বা বিকল অবস্থায় পড়ে আছে।

——————————————————————————————————————–

নিত্যপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী বা এমএসআর (মেডিকেল অ্যান্ড সার্জিক্যাল রিকুইজিট) সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিস্তর ফারাক লক্ষ করা গেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, জীবন রক্ষাকারী ও জরুরি মুহূর্তে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বেশ অভাব রয়েছে। তুলা, সিরিঞ্জ, গ্লাভস বা গজের মতো সাধারণ সামগ্রী অনেক সময়ই পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না। মাতৃ ও নবজাতক সেবার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো শোচনীয়।

তথ্য অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ ক্ষেত্রেই নবজাতকের নাড়ি কাটার ক্ল্যাম্প (আম্বিলিক্যাল কর্ড ক্ল্যাম্প) এবং অন্যান্য জরুরি সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ৬২ শতাংশ ইডিসিএল এবং ৩৩ শতাংশ অন্যান্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এলেও সময়মতো তা হাসপাতালে পৌঁছায় না।

জনবল সংকট ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ড. জিল্লুর বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, জরিপকৃত এলাকাগুলোতে ৬ হাজার ৪০৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ জন। শুধু পদ শূন্য থাকাই সমস্যা নয়, বরং আধুনিক যন্ত্রপাতি চালানোর মতো প্রশিক্ষিত কর্মীরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। কর্মঘণ্টার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ঘাটতি। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে কাজ হচ্ছে গড়ে ৩৬ ঘণ্টা। তাছাড়া কর্মীদের প্রশিক্ষণের পর তাদের কাজের বাস্তব প্রয়োগ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ৫৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে একেবারেই অনুপস্থিত।

বাজেট বরাদ্দের অসামঞ্জস্য নিয়েও গবেষণায় আলোকপাত করা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ নতুন ভবন নির্মাণের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ বিদ্যমান অবকাঠামো ও দামি যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ একেবারেই অপর্যাপ্ত।

তাছাড়া কেনাকাটা বা প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত হওয়ায় হাসপাতালগুলোকে নিত্যদিনের কাজ পরিচালনায় ধীরগতির শিকার হতে হচ্ছে। তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা বা ‘এভিডেন্স-বেজড ম্যানেজমেন্ট’ পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে আছে। প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাজেট প্রস্তুত প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের ধারণার অভাব রয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ড. হোসেন জিল্লুর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে প্রধান বাধা কেবল বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং বরাদ্দকৃত অর্থকে কার্যকর সেবায় রূপান্তর করার কাঠামোগত সক্ষমতার অভাব।’

তিনি শুধুমাত্র বাজেট বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে, সেবার মান, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বৃদ্ধির ওপর জরুরি ভিত্তিতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিগত সময়ের কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট কিছু আর্থিক হিসাব তুলে ধরেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা হয়েছে ১৮ কোটি টাকায়। এখানে প্রতি মেশিনে ৬ কোটি টাকা পর্যন্ত দুর্নীতি হয়েছে। এমন দুটি মেশিন ফরিদপুর ও খুলনায় পাঠানো হলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে তা অব্যবহৃত পড়ে আছে।

এছাড়া মন্ত্রণালয়ে একটি ফাইল এক মাস আটকে রেখে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা ঘুষ দাবির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

পিপিআর নিয়ম অনুযায়ী অডিটের জন্য ৫ শতাংশ বা তার বেশি অর্থ রাখার কথা থাকলেও অনেকেই ঠিকাদারদের অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন বলে মন্ত্রী অভিযোগ করেন।

এ সময় তিনি স্বাস্থ্যখাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্য সহ্য করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিতে সরকারের বিভিন্ন পরিসংখ্যানভিত্তিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!