মর্যাদার রকমফের। কিন্তু ইসলাম কি বলে ?

  • আপডেট সময় শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ পাঠক

আইনাল হক।। ০১ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

সবাই মর্যাদা চায়। কেউ সম্পদ দিয়ে মর্যাদা খোঁজে। কেউ ক্ষমতা দিয়ে। কেউ আবার সৌন্দর্য, পদ কিংবা পরিচিতির মাধ্যমে নিজেকে বড় মনে করে। কিন্তু এসবের কোনোটিকেই ইসলাম মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেনি। কোরআন মানুষকে শিখিয়েছে ভিন্ন এক সত্য, যা সব যুগে সমানভাবে প্রযোজ্য। যে সত্য মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে। অহংকার নয়, বিনয় শেখায়। বাহ্যিক পরিচয় নয়, অন্তরের বিশুদ্ধতাকে মূল্য দেয়।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘ হে মানুষ ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। এরপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত। ’ (সুরা হুজুরাত ১৩)

এই আয়াত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক নীতিকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। এখানে আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করেছেন। শুধু মুসলমানদের নয়। কারণ মানুষের সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি সর্বজনীন।

আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, সব মানুষের উৎস এক। সবাই একই পিতা আদম (আ.) এবং একই মাতা হাওয়া (আ.)-এর সন্তান। তাই বংশ, জাতি কিংবা গোষ্ঠী নিয়ে অহংকার করার কোনো সুযোগ নেই। যাদের সূচনা একই, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি কেবল জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে হতে পারে না।

মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করার উদ্দেশ্য আল্লাহ নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হলো পরিচয়। পারস্পরিক সহযোগিতা। সামাজিক বিন্যাস। কখনোই একে অপরকে ছোট করা নয়। তাই জাতিগত অহংকার ইসলামের শিক্ষা নয়।

———————————————————————————————————-

ইসলাম বর্ণবাদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষের গায়ের রঙ, ভাষা কিংবা জন্মস্থান কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে বড় বা ছোট করে না। এগুলো আল্লাহর সৃষ্টি বৈচিত্র্যের অংশ। এগুলো নিয়ে গর্ব করারও সুযোগ নেই, আবার লজ্জা পাওয়ারও কারণ নেই।

———————————————————————————————————-

আজ পৃথিবীর অনেক সংঘাতের মূলেই রয়েছে বর্ণবাদ। কোথাও কালো মানুষ অবহেলিত। কোথাও অভিবাসীদের তুচ্ছ করা হয়। কোথাও বংশের অহংকারে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করে। ইসলাম এসব বিভাজনের অবসান ঘটিয়ে তাকওয়াকে মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

তাকওয়া কী? তাকওয়া হলো আল্লাহভীতি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাক্সক্ষা। প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে স্মরণ রেখে জীবন পরিচালনা করা। হারাম থেকে দূরে থাকা। ফরজ পালন করা। মানুষের অধিকার রক্ষা করা। প্রতিটি কাজে আল্লাহর জবাবদিহির অনুভূতি রাখা।

তাকওয়া শুধু মুখের দাবি নয়। এটি মানুষের চরিত্রে প্রকাশ পায়। একজন তাকওয়াবান মানুষ সত্যবাদী হন। আমানতদার হন। বিনয়ী হন। অন্যায় থেকে দূরে থাকেন। মানুষের প্রতি সদাচরণ করেন। নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন।

অনেক সময় মানুষ ধনসম্পদকে মর্যাদার মাপকাঠি মনে করে। কিন্তু কোরআন জানিয়ে দিয়েছে, সম্পদ আল্লাহর পরীক্ষা। এটি সম্মানের নিশ্চয়তা নয়। ধনী হওয়া মানেই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া নয়। আবার দরিদ্র হওয়াও অসম্মানের বিষয় নয়।

ক্ষমতাও মর্যাদার মানদণ্ড নয়। ইতিহাসে বহু ক্ষমতাবান শাসকের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। আবার অনেক সাধারণ মানুষ আল্লাহর কাছে ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত। কারণ তাদের হৃদয় ছিল তাকওয়ায় পরিপূর্ণ।

সৌন্দর্যও মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড নয়। মানুষের বাহ্যিক রূপ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু অন্তরের সৌন্দর্য ও তাকওয়া মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না। বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। ’ (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, আল্লাহর কাছে বাহ্যিক চাকচিক্যের কোনো মূল্য নেই, যদি অন্তর কলুষিত হয় এবং আমল নষ্ট হয়।

———————————————————————————————————-

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণেও রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবসমতার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো অনারবের ওপর আরবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি হলো তাকওয়া। (মুসনাদ আহমাদ)

———————————————————————————————————-

এই ঘোষণা মানবাধিকারের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যখন পৃথিবীর বহু সমাজে বর্ণবৈষম্য ছিল স্বাভাবিক, তখন ইসলাম মানুষকে সমতার শিক্ষা দিয়েছে।

সাহাবিদের জীবনেও আমরা এর বাস্তব উদাহরণ দেখি। বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ। একসময় তিনি দাস ছিলেন। কিন্তু তাকওয়া, ইমান ও আত্মত্যাগের কারণে তিনি ইসলামের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা লাভ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সম্পর্কে বিশেষ প্রশংসা করেছেন।

সালমান ফারসি (রা.) ছিলেন পারস্যের মানুষ। সুহাইব আর-রুমি (রা.) ছিলেন রোমাঞ্চল থেকে আগত। জন্মভূমি ও জাতিগত পরিচয় তাদের মর্যাদা নির্ধারণ করেনি। তাদের ইমান ও তাকওয়াই তাদের সম্মানিত করেছে।

———————————————————————————————————-

অহংকার মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইবলিসও অহংকারের কারণেই আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। সে নিজেকে নিয়ে গর্ব করেছিল। আদম (আ.)-কে তুচ্ছ করেছিল। তাই ইসলাম অহংকারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহিহ মুসলিম)

———————————————————————————————————-

অন্যকে ছোট করা, অপমান করা কিংবা নিজেকে বড় মনে করা হৃদয়ের রোগ। একজন মুমিন নিজের ভুল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অন্যের ত্রুটি নিয়ে নয়।

তাকওয়া অর্জনের জন্য নিয়মিত ইবাদত করতে হবে। কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে। হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে। হালাল উপার্জন করতে হবে। মানুষের অধিকার আদায় করতে হবে। প্রকাশ্য ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করতে হবে।

১পরিবারেও তাকওয়াকে মূল্য দিতে হবে। সন্তানদের শেখাতে হবে, মানুষের সম্মান তার পোশাক, অর্থ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে নয়। বরং তার চরিত্র, সততা ও আল্লাহভীতির কারণে।

সমাজেও একই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধনী বলে কাউকে অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া কিংবা দরিদ্র বলে কাউকে অবহেলা করা ইসলামের শিক্ষা নয়। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও যোগ্যতা, আমানতদারিতা ও তাকওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা, জনপ্রিয়তা কিংবা বাহ্যিক সাফল্যকে মর্যাদার মাপকাঠি মনে করা হয়। অথচ আল্লাহর কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই, যদি ইমান, তাকওয়া ও সৎকর্ম না থাকে।

একজন মানুষ পৃথিবীতে যত বড় পরিচয়ের অধিকারীই হোন না কেন, কেয়ামতের দিন তার বংশ, সম্পদ কিংবা পদমর্যাদা কোনো কাজে আসবে না। সেখানে মূল্যায়ন হবে ইমান, তাকওয়া ও সৎকর্মের ভিত্তিতে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!