——————————————————————————————————————————–
কিন্তু বাস্তবতা হলো- বর্তমানে দেশ উৎপাদন করতে পারছে মাত্র ১২,০০০ থেকে ১৪,০০০ মেগাওয়াট। ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ মেগাওয়াটে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭১টিরও বেশি কেন্দ্র হয় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, নয়তো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অনেক নিচে চলছে। এই সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন করতে না পারাটাই হলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
এর জন্য প্রধানত দায়ী ওই পাঁচ লুটেরা এবং তৎকালীন সরকারের লুটপাটের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন। আরও দুঃখজনক হলো যে, এসব কেন্দ্রের উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। এই কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু পেট্রোবাংলা সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই যে ৩০০ মিলিয়নের ঘাটতি, তা সরাসরি কয়েক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
সূত্র : অন্য দৈনিক
কেন এই গ্যাস সংকট ? পেট্রোবাংলার অভ্যন্তরীণ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে নতুন গ্যাস কূপ খননের তাগিদ দিয়ে এলেও সেখানে বিনিয়োগ না করে জোর দেওয়া হয়েছে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে বা ডলার সংকট দেখা দিয়েছে, তখনই দেশের বিদ্যুৎ খাত মুখথুবড়ে পড়েছে। এটি শুধু একটি কারিগরি সংকট নয়, বরং নীতিগত ব্যর্থতা। লুটপাট করার অদ্ভুত এক সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। পায়রা ও রামপালের মতো বিশাল ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো যখন পূর্ণ সক্ষমতায় চলে, তখন জাতীয় গ্রিডে স্থিতিশীলতা থাকে। কিন্তু মাসের পর মাস বকেয়া পরিশোধ না করায় ইন্দোনেশিয়া বা অন্যান্য সরবরাহকারীরা কয়লা পাঠানো বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে। ফলে এই কেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। অন্যদিকে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২,০০০ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) তথ্যমতে, যদি পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাওয়া যেত, তবে এই খাত থেকেই আরও ২,০০০ থেকে ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব হতো। কিন্তু উদ্যোক্তারা তেল কিনতে পারছেন না, কারণ সরকারের কাছে তাদের প্রায় ১৬,৫০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া পাওনা আটকে আছে। লুটপাটের জন্য যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল তার মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন বর্তমান সরকারকে।
——————————————————————————————————————————–
এই সংকটের নেপথ্যে যে আইনি ও নীতিগত কাঠামোটি সবচেয়ে বেশি দায়ী, তা হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও সরকার তাদের একটি নির্ধারিত অর্থ প্রদান করতে বাধ্য থাকে, শুধু তারা ‘প্রস্তুত’ আছে এই যুক্তিতে। বিশ্বের অনেক দেশে এই পদ্ধতি থাকলেও বাংলাদেশে এর প্রয়োগ হয়েছে অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং বৈষম্যমূলকভাবে। চুক্তির শর্তগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যে, অনেক কেন্দ্রের মালিক বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে কেন্দ্র বসিয়ে রাখতেই বেশি আগ্রহী থাকেন, কারণ তাতে কোনো জ্বালানি খরচ ছাড়াই নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যায়।
——————————————————————————————————————————–
কিন্তু এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো, সেটা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০০৮ সালে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে। এ সময় তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বিদ্যুৎ উৎপাদনের আপদকালীন সমাধানের জন্য বেসরকারি উদ্যোগের প্রস্তাব দেন। এখানেই আজকের লোডশেডিংয়ের গল্পের শুরু।
তৌফিক-ই-ইলাহীর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যুৎ সচিব করা হয় আবুল কালাম আজাদকে। আবুল কালাম আজাদ বিদ্যুৎ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর ‘কুইক রেন্টাল’ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। এজন্য আইন সংশোধন করা হয়। এর মাধ্যমে দুর্নীতির ফ্লাডগেট উন্মোচন করে দেন আবুল কালাম আজাদ। বলা হয়, দ্রুত বিদ্যুৎসংকট মোকাবিলার জন্য ‘কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ স্থাপন করতে হবে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যাঁরা স্থাপন করবেন, তাঁদের বিদ্যুৎ সরকার কিনুক না কিনুক তাঁদের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রদান করা হবে। এ ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান করা হবে ডলারে।
আবুল কালাম আজাদ শুধু এ রকম একটি বিধিবদ্ধ আইনব্যবস্থাই করেননি, বরং এসব দুর্নীতি এবং লুণ্ঠন যেন আইন এবং বিচারের ঊর্ধ্বে থাকে, সেজন্য দায়মুক্তি আইন বা ইনডেমনিটি অ্যাক্ট করেছিলেন। বিদ্যুৎ খাতে যেসব কেনাকাটা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে সেগুলোর জন্য কোনো বিচার করা যাবে না।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে লুণ্ঠনের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয়। সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা, উপনেতা, পাতিনেতা কুইক রেন্টালের জন্য আবেদন করতে থাকেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেনের বিনিময়ে বিদ্যুতের কুইক সেন্টারের লাইসেন্স দেওয়া শুরু হয়। বিদ্যুৎ খাত হয়ে ওঠে হরিলুটের আখড়া।
বিদ্যুৎ খাতে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় লুটেরার আবির্ভাব ঘটে এরপর। তার নাম নসরুল হামিদ বিপু। বাংলাদেশে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ খাত ধ্বংসের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী এই দুর্নীতিবাজ লুটেরা। টানা ১০ বছরের বেশি সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন নসরুল হামিদ বিপু। এ সময়ে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন।
১০ বছর ধরে রীতিমতো লুটের উৎসব করেছেন। তাঁর দুর্নীতির কাহিনি আরব্য রজনির রূপকথাকেও হার মানায়। শুধু বিপু একা নন, ভাই, স্ত্রী, ছেলে, মামা সবাই লুটেছেন বিদ্যুৎ খাতের বিপুল পরিমাণ অর্থ। ১০ বছরে বিপুর লুণ্ঠনের পরিমাণ ১ লাখ কোটির বেশি টাকা, যা দেশের এক বছরের জাতীয় বাজেটের চেয়ে বেশি।
তাঁর রাজত্বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে টাকাই ছিল শেষ কথা। নিজেই কোম্পানি খুলে হাতিয়ে নিয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। গড়েছেন দুর্নীতির পারিবারিক সিন্ডিকেট।
এ রকম একটি দুর্নীতির রোমহর্ষক কাহিনি হলো মাতারবাড়ী প্রকল্প।
জাপানের মারুবেনি করপোরেশন, ডাচ্-সুইস জ্বালানি কোম্পানি ভিটল এবং পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি কোম্পানির যৌথ ব্যবসায়িক জোট বা কনসোর্টিয়ামকে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দেশের বৃহত্তম এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিপু। এ কনসোর্টিয়াম আসলে ছিল বিপুর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে ৩০৫ মিলিয়ন ডলার বা আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে টার্মিনালটি নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু মাত্র ১০০ ডলার পরিশোধিত মূলধনের একটি কোম্পানি-পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল কীভাবে ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের কাজ পাওয়া একটি কনসোর্টিয়ামের অংশ হতে পারে ? অনুসন্ধানে দৃশ্যপটে আসেন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু স্বয়ং। পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি হিসেবে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশে নিবন্ধিত।
——————————————————————————————————————————–
নথিপত্র ও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল নামে এ কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রক স্বয়ং নসরুল হামিদ বিপুর আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামিদ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাহীরাই পাওয়ারকোর হর্তাকর্তা। একসময় নসরুল হামিদ নিজেই হামিদ গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পারিবারিক এ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করে। এর কয়েকটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও ছিলেন বিপু।
——————————————————————————————————————————–
পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর বিপুল পরিমাণ শেয়ারের মালিক তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের ব্যবসা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে দাখিলকৃত নথিপত্র অনুযায়ী, পাওয়ারকোর প্রধান শেয়ারধারী হলেন কামরুজ্জামান চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি। তাঁর পরিচয়সংক্রান্ত নথিপত্র ও সমাজমাধ্যমের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কামরুজ্জামান চৌধুরী হলেন নসরুল হামিদ বিপুর আপন মামা। কামরুজ্জামান চৌধুরী নিজেও দীর্ঘদিন ধরে হামিদ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর ছেলে, ভাই ও ভাইয়ের ছেলেরা হামিদ গ্রুপের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কাজ করেছেন ও করছেন।
সিঙ্গাপুরে দাখিলকৃত নথিপত্র অনুযায়ী পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনালের একজন বিকল্প পরিচালক হলেন মুরাদ হাসান। পাশাপাশি তিনি কোম্পানিটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা বা সিও হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, পাওয়ারকোর সিও হিসেবে তিনি বিপিসির সঙ্গে সরাসরি মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্পের দরকষাকষিতে অংশ নিয়েছিলেন।
এই মুরাদ হাসানই আবার ‘ডেলকো বিজনেস অ্যাসোসিয়েট’ নামে হামিদ গ্রুপের একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও ছিলেন। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় নসরুল হামিদ হলফনামায় জানান, তিনি নিজেই ডেলকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সে সময় তিনি কোম্পানিটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ারেরও মালিক ছিলেন। বর্তমানে ডেলকোর মালিকানা তাঁর ছেলে জারিফ হামিদ ও ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদের হাতে। শুধু মুরাদ হাসানেই সীমাবদ্ধ নয় ডেলকো ও পাওয়ারকোর সম্পর্ক। অঘোষিত ও গোপন এ সম্পর্কের সূত্র খুঁজে দেখা যায় বারিধারার ৩২ প্রগতি সরণিতে। পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল প্রথম নিবন্ধিত হয়েছিল এ ঠিকানায়।
এ ঠিকানায় কেইমরিচ, সুনন ও ইউরো নামে তিনটি অফিস ফার্নিচার ব্র্যান্ডের শোরুম রয়েছে। বাংলাদেশে এ বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর পরিবেশক হলো ডেলকো। ডেলকোর ওয়েবসাইটেও তাদের শোরুমের ঠিকানা : ৩২ প্রগতি সরণি, বারিধারা। আবার সুনন বাংলাদেশ বা ডোমেইনটির রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড অনুযায়ী, এ ঠিকানাতেই ইন্তেখাবুল হামিদের নামে নিবন্ধিত হয়েছে ডোমেইনটি। অর্থাৎ ডেলকোর শোরুমের ঠিকানাতেই নিবন্ধিত হয়েছিল পাওয়ারকো।
——————————————————————————————————————————–
বিপুর ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু নিজেও হামিদ গ্রুপের এশাধিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ ইন্তেখাবুল হামিদের সঙ্গে পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল খানের সংযোগ রয়েছে। এই ভারতীয় নাগরিক দুবাইভিত্তিক এশটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি শিপিংলাইনের মধ্যপ্রাচ্য শাখা পরিচালনা করেন।
——————————————————————————————————————————–
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাওয়ারকোর সঙ্গে জড়িত আরেক ব্যক্তি হলেন কোম্পানিটির সহকারী মহাব্যবস্থাপক তারেক খলিল উল্লাহ, যিনি দীর্ঘদিন হামিদ গ্রুপে কর্মরত ছিলেন। তিনি ইন্তেখাবুল হামিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, হামিদ গ্রুপের আরও দুজন কর্মকর্তা পাওয়ারকো গঠনের সময় আরজেএসসি অফিসে উপস্থিত ছিলেন। কোম্পানি হিসেবে পাওয়ারকোর নিবন্ধনের সময় এ দুজনকে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়।
জাহাঙ্গির আলম নামে একজন সাক্ষীর পরিচয়পত্র ও লিংক্ড ইন প্রোফাইল দেখে জানা যায়, তিনি হামিদ গ্রুপের একজন সহকারী ব্যবস্থাপক। শেষ পর্যন্ত মাতারবাড়ীর কাজ না পেলেও নসরুল হামিদ বিপুর মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের কাজ পায় মারুবেনিভিটল, পাওয়ারকো এবং ডেলকো। কোনো দরপত্র ছাড়াই এলএনজি সরবরাহের কাজটি তিন দফায় পেয়েছিল ডাচ্-সুইস জ্বালানি কোম্পানি ভিটল। আবার এ ভিটলের সঙ্গেই যৌথভাবে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনালের ৩০% মালিকানা পায় পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেট্রোবাংলার কাছে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি সরবরাহের তিনটি কাজ ভিটল পেয়েছে পাওয়ারকোর সঙ্গে তাদের কনসোর্টিয়ামটি গঠিত হওয়ার পর। কনসোর্টিয়াম গঠনের পর বিপুর মন্ত্রণালয় থেকে কাজ পেয়েছে আরেক সদস্য মারুবেনিও। ২০২১ সালের মে মাসে মারুবেনি ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (ইজিসিবি) সঙ্গে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে।
ইজিসিবিও নসরুল হামিদ বিপুর নিয়ন্ত্রণাধীন। ভিটল ও মারুবেনি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিতর্কে জর্জরিত। ২০১২ ও ২০১৪ সালে নাইজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি প্রকল্পের কাজ পেতে ঘুষ প্রদানের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে শতাধিক মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে বাধ্য হয় মারুবেনি। এরই সূত্র ধরে নয় মাসের জন্য তাদের অর্থায়নে হওয়া প্রকল্পে মারুবেনির অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিল জাপানের বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা।
অন্যদিকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ভিটলের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ব্রাজিল, ইকুয়েডর ও মেক্সিকোয় ঘুষ প্রদানের দায়ে মার্কিন বিচার বিভাগের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে প্রসিকিউশন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার এশটি চুক্তি করে; যার অংশ হিসেবে ১৬৪ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেয় ভিটল।
——————————————————————————————————————————–
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নসরুল হামিদের ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু ও সাবেক সেতুমন্ত্রীর ভাতিজা মিলে অন্তত চারটি কোম্পানির মাধ্যমে পাঁচ বছরে বাগিয়ে নিয়েছেন ৮ হাজার কোটি টাকার কাজ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঢাকা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) থেকে অ্যাডভান্স মিটারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার নামের দুটি প্রকল্প বাগিয়ে নেয়। এ দুটি প্রকল্পের অর্থমূল্য ছিল ২ হাজার কোটি টাকা।
——————————————————————————————————————————–
এ ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে একই কোম্পানি মোবাইল অ্যাপস অ্যান্ড কাস্টমার পোর্টাল প্রতিষ্ঠার নামে ডিপিডিসির থেকে বাগিয়ে নেয় আরও একটি মেগা প্রকল্প। এ প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫০০ কোটি টাকা। নসরুল হামিদের ভাই একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক ও সিকিউরিটি নামে আটটি মেগা প্রকল্প হাতিয়ে নেন।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১ জুন বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) থেকে বাগিয়ে নেন ৫০ লাখ মিটার স্থাপনের কাজ। এ প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সাধারণত এশটি বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত কমপক্ষে ২০টি ধাপে তৎকালীন সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হতো। গত দুই বছওে ২৭টি সোলারভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে নসরুল হামিদের ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু পান দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এভাবেই বিগত ১০ বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় হয়ে উঠেছিল বিপুর পারিবারিক সম্পত্তি। নসরুল হামিদ বিপু দেশে টাকা নিতেন না।
ঘনিষ্ঠদের তিনি বলতেন, ‘ টাকা দেখলে তার ঘেন্না’ লাগে।’ ‘ডলার’ কিংবা ‘ইউরো’তে ছিল তার আসক্তি। তার দুর্নীতির অর্থের লেনদেন হতো বিদেশে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের অন্তত ১৬টি দেশে বিপু ও তার পরিবারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে অনেকেই মনে করেন আরও অনেক দেশেই বিপুর লুণ্ঠনের টাকা রয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব দেশে বিপুর অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে, তার মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বারমুডা, মাল্টা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, মোনাকো, সাইপ্রাস ও তুরস্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি কোম্পানি খুলে ওই কোম্পানির মাধ্যমে নসরুল হামিদ বিপুর হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই কোম্পানি প্রতিষ্ঠাকালে বিপু তার নিজের যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত বাসভবনের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। পাঁচ বেডরুমের ওই বাসার বাজার মূল্য ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪১৫ মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশি টাকায় এর মূল্য ৪২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। সেখানে শরীফ হায়দার নামে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে স্ত্রী সীমা হামিদকে নিয়ে ‘পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি ট্রেড করপোরেশনের লাইসেন্স নেন। এই করপোরেশনের আওতায় মোবিল গ্যাস স্টেশনসহ দেড় ডজনের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ফ্লোরিডায় অবস্থিত ওই গ্যাসস্টেশনটি কেনা হয় কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে। আর শরীফ হায়দারের মাধ্যমেই হাজার কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছেন বিপু।
——————————————————————————————————————————–
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে বিপুর স্ত্রী সীমা হামিদের নামে তিনটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। বিপুর ছেলে জারিফ হামিদ দুবাইতে পাম বিচে বিলাসবহুল বাংলোতে বসবাস করেন। সেখানে তার একাধিক ব্যবসা রয়েছে। লন্ডনে স্টাটফোর্ড এলাকায় রয়েছে বিপুর বাড়ি। এ ছাড়াও ম্যানচেস্টারে বিপুর ব্যবসা রয়েছে। কানাডায় বিপুর একটি আবাসিক হোটেল এবং একটি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। বিপুর অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরে স্টক এক্সচেঞ্জ নিবন্ধিত। যেখানে রয়েছে বিপুর হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। মাল্টায় বিপুর স্ত্রী সীমা হামিদের নামে একটি বার ও ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ায় জারিফ রাবার ফ্যাক্টরির সিংহভাগ শেয়ার আছে বিপুর ছেলে জারিফের নামে। এই শেয়ারের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ৮৫০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতের লুণ্ঠিত এসব টাকায় বিভিন্ন দেশে রয়েছে বিপুর সম্পদের পাহাড়। দেশেও বিপুর হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। যেসব সম্পদ দেখাশোনা করছেন ইউনূস সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী। রিজওয়ানার কারণেই বিপুর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান মামলা নেই।
——————————————————————————————————————————–
বিদ্যুৎ খাত ধ্বংসের শেষ খলনায়ক ছিলেন সাবেক বিদ্যুৎ সচিব, পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস। আহমেদ কায়কাউস বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ছিলেন দুই বছরের কম সময়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেই বিদ্যুতের সর্বোচ্চ লুণ্ঠন করেছেন তিনি। বিগত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে কোনো পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। হয়েছে পরিকল্পিত লুটপাট। যার ফলে এখন গলা পর্যন্ত ঋণে জর্জরিত বিদ্যুৎ খাত অন্ধকারে। আজকের এই লোডশেডিংয়ের জন্য দায়ী বিদ্যুৎ নিয়ে বিগত সরকারের লুণ্ঠননীতি।








Leave a Reply