শিরোনাম:

তবুও ঢাকার অচল ক্যাথলবে ছুটছে হৃদরোগী ,পথেই ফুরাচ্ছে জীবন

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

দেশে প্রতি ২ মিনিটে হৃদরোগে প্রাণ হারাচ্ছে একজন মানুষ। বছরে এ সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৮৪ হাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে, মোট মৃত্যুর প্রায় ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশের কারণ হার্ট অ্যাটাক ; হৃদরোগের অন্যান্য জটিলতা যুক্ত করলে তা দাঁড়ায় প্রায় ২১ শতাংশ, যা একক রোগ হিসেবে দেশে সর্বোচ্চ। অথচ জীবন রক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসার সুযোগ এখনো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক।

সরকার কোটি-কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন বিভাগীয় ও বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাথল্যাব স্থাপন করলেও জনবল ও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের অভাব, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণে অনেক ল্যাব অচল বা সীমিত পরিসরে চলছে। কোথাও যন্ত্র বসানোর কয়েক বছর পরও সেবা শুরু হয়নি, কোথাও এনজিওগ্রাম হলেও হচ্ছে না এনজিওপ্লাস্টি। ফলে হার্ট অ্যাটাকের পর প্রতিটি মিনিট মূল্যবান হওয়া সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রোগীদের ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। পথে নষ্ট হচ্ছে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময়, বাড়ছে মৃত্যু ও স্থায়ী জটিলতার ঝুঁকি।

———————————————————————————————————————————–

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা রোগীর জীবন রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্তদের প্রায় ২৫ শতাংশ চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যান। চিকিৎসা শুরু হলেও পরবর্তী কয়েক মাসে মৃত্যু হয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে না পারা এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ। তবে দেশে হৃদরোগের চিকিৎসার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে ওঠেছে ক্যাথল্যাবের অপ্রতুলতা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোয় স্থাপিত একাধিক ক্যাথল্যাবের অচল বা সীমিত কার্যক্রম।

———————————————————————————————————————————–

সরকার বিপুল অর্থ ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাথল্যাব স্থাপন করেছে। তবে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রশিক্ষিত নার্সের অভাবে অনেক ল্যাব পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যায়নি। কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটিতে কার্যক্রম বন্ধ, আবার কোথাও জনবল সংকটে সীমিত পরিসরে সেবা চলছে। ফলে আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও হৃদরোগীদের ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে, আর অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হচ্ছে বিপুল অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি।

———————————————————————————————————————————–

দেশে কার্যকর ক্যাথল্যাবগুলোর বড় অংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে রাজধানীর বাইরে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টির মতো জরুরি সেবাও নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের পর যত সময় নষ্ট হয়, হৃৎপেশির ক্ষতিও তত বাড়ে। বুকে ব্যথা শুরুর পর দ্রুত রোগ নির্ণয় ও রক্তনালির ব্লক শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী এনজিওপ্লাস্টি করা গেলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি ও স্থায়ী জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু দেশের বাস্তবতায় বিপুলসংখ্যক রোগী সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছতে পারে না।

———————————————————————————————————————————–

রোগী দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছলেও সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মিলছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। হার্ট অ্যাটাকের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত থ্রম্বোলাইটিক চিকিৎসা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব হাসপাতালে তাৎক্ষণিক এনজিওপ্লাস্টির ব্যবস্থা নেই, সেখানে স্ট্রেপটোকাইনেজ (এসটিকে) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে এ ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক গবেষণায় প্রায় ৩০০ রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, হাসপাতালে পৌঁছেই প্রয়োজনীয় ইনজেকশন পাওয়া রোগীদের তুলনায় বাইরে থেকে ওষুধ কিনে এনে চিকিৎসা শুরু করা রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দ্রুত ক্যাথল্যাবের সুবিধা পাওয়া গেলে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

হৃদরোগ চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সংকট দেখা যাচ্ছে ক্যাথল্যাব ব্যবস্থাপনায়। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চালুর পর সেখানে কয়েকশ এনজিওগ্রাম করা হলেও পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের রোগীদের এনজিওগ্রাম বা এনজিওপ্লাস্টির মতো বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য যেতে হচ্ছে ঢাকায়। দক্ষিণাঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই চিত্র। সেখানে ২০১৯ সালে ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হলেও দীর্ঘ সময়ে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের রোগীদের ভোগান্তি নিয়মিত ঘটনা। বন্ধ রয়েছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাথল্যাবও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবির জানান, এটা সাময়িক সমস্যা, তারা কাজ করছেন। দ্রুতই ল্যাব চালু হবে।

একইভাবে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ক্যাথল্যাবেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। এছাড়া দেশের অন্যান্য সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ক্যাথল্যাবগুলোও নানা কারণে সীমিত পরিসরে চলছে। কোথাও যন্ত্রপাতির ত্রুটি, কোথাও দক্ষ জনবলের সংকট, আবার কোথাও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্টের অভাবে এনজিওপ্লাস্টির মতো জরুরি সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেও একাধিক ক্যাথল্যাব রয়েছে। দেশের শীর্ষ বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতাল হওয়ায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই কোনো না কোনো ল্যাবের কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় সকাল থেকেই রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে এনজিওগ্রামের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের সিরিয়ালের জন্য দিনের পর দিন হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে।

নেত্রকোনা সদর থেকে আসা আসমা বেগম জানান, স্বামীর এনজিওগ্রামের জন্য কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ঘুরছেন তিনি। গতকাল চতুর্থ দিনেও নির্দিষ্ট কোনো সিরিয়ালের তারিখ পাননি। আসমা বেগমের মতো একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন রাজধানীর বাইরে থেকে আসা আরো অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরা। খবর : ভিন্ন দৈনিক

চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে ক্যাথল্যাব না থাকায় রোগীকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় বিভাগীয় শহর বা ঢাকায়। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেয়ার এ দীর্ঘ প্রক্রিয়াতেই পেরিয়ে যায় মূল্যবান সময়। ফলে রোগী ঢাকায় পৌঁছার আগেই অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় শেষ হয়ে যায়। যারা বেঁচে থাকে, তাদেরও হৃৎপেশির স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন ক্যাথল্যাব স্থাপন করলেই সংকট কাটবে না। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যেসব হাসপাতালে ক্যাথল্যাব বসানো হয়েছে, আগে সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট নিয়োগ, টেকনিশিয়ান ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে বিভাগীয় ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা হাসপাতালগুলোয় ২৪ ঘণ্টা জরুরি হৃদরোগ সেবা চালুর পাশাপাশি যেখানে ক্যাথল্যাব নেই, সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতের তাগিদ দেন তারা।

———————————————————————————————————————————–

সার্বিক বিষয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন,  হার্ট অ্যাটাকের সংকটজনক মুহূর্তে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় রোগী আনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হওয়ায় রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে, পাশাপাশি পরিবারকেও বড় ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। তবে শুধু চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ না থেকে রোগ প্রতিরোধের দিকেও সমান নজর দিতে হবে। 

———————————————————————————————————————————–

সারা দেশে ক্যাথল্যাবের সংকট ও হাসপাতালে রোগীর বাড়তি চাপ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী আরো বলেন, কেবল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বাড়িয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ঢাকাকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিটি বিভাগে উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসার অবকাঠামো ও সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র ও আধুনিক ক্যাথল্যাব স্থাপনে কার্যকর সরকারি উদ্যোগের তাগিদ দেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, হৃদরোগ চিকিৎসার উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে সুপারস্পেশালাইজড মানের হাসপাতালে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরেও এ চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের কাজ চলছে।’ যশোরে একটি ক্যাথল্যাব স্থাপনের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বর নাগাদ প্রধানমন্ত্রী এটি উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুহার যে হারে বাড়ছে, সে অনুযায়ী চিকিৎসা অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করা না গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।

 

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!