প্রাথমিকে শ্রেণী উপযোগী বাংলা-ইংরেজি পড়তে ও বুঝতে পারে না ৫১% শিক্ষার্থী

  • আপডেট সময় সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ২৪ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে সংস্থাটির বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন শিক্ষা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাও তীব্র। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা বড় ধরনের লার্নিং ক্রাইসিসে (শিখন ঘাটতি) রয়েছে। ১০ বছর বয়সী শিশু শিক্ষার্থীদের ৫১ শতাংশই তাদের বয়স উপযোগী সাধারণ বাংলা-ইংরেজি লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে না। পাশাপাশি তারা শ্রেণী উপযোগী গাণিতিক দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না।

———————————————————————————————————————–

দুই কোটি শিশুর ভঙ্গুর ও দুর্বল প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশে

———————————————————————————————————————–

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বিশালতা ও ভঙ্গুরতার এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি হলেও নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। বিপুলসংখ্যক শিশু প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় রয়েছে। শহর থেকে চর, হাওর, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত এ রাষ্ট্রীয় শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিকের এ ব্যাপক বিস্তার বাংলাদেশের একটি বড় সাফল্য।

বিশ্বব্যাংকের ‘ লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ ’ শীর্ষক প্রোগ্রাম ইনফরমেশন ডকুমেন্টে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতায় ঘাটতির চিত্র ওঠে এসেছে। চলতি বছর প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গত দুই দশকে প্রাথমিকে সর্বজনীন সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষা সমাপ্তির হার বৃদ্ধি এবং জেন্ডার সমতা অর্জনে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখিয়েছে। তবে প্রাথমিকের পরিধি বিস্তৃত হলেও শিক্ষার্থীদের শ্রেণী উপযোগী দক্ষতা নিশ্চিতে বড় ধরনের ঘাটতি আছে। সূত্র : অন্য দৈনিক।

বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক স্তরে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি শিশু। সরকারি ৬৫ হাজার ৫৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৫২ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে এ প্রতিবেদনে কওমি ধারার শিক্ষার্থীদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত নয়।

প্রাথমিক স্তরে শিখন ঘাটতির পেছনে বেশকিছু কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল পাঠদান পদ্ধতি, স্কুল নেতৃত্বের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, জলবায়ুজনিত বিঘ্ন ও শিক্ষায় কম অর্থায়ন।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এসব সমস্যা জীবনমুখী মৌলিক দক্ষতা বিকাশে বাধা দেয়, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাগ্রাহ্যতা ও কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা সংস্কারের পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতিতে পরিবর্তনশীল কর্মসংস্থান ও সমাজের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীর জন্য সমতাভিত্তিক ও গুণগত শিখন নিশ্চিত করার ওপর জরুরি ভিত্তিতে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিখন ঘাটতির পেছনে করোনার প্রভাব, বারবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, শিক্ষায় পর্যাপ্ত বাজেট ও পরিকল্পনার অভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করোনার সময়ে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বড় ধরনের শিখন ঘাটতি হয়েছে। এ ঘাটতি কাটিয়ে ওঠতে নানা ধরনের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও সেগুলো খুব একটা কার্যকর হয়নি।

এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও করোনা-পরবর্তী সময়ে পড়ালেখার প্রতি উদাসীনতা-অমনোযোগিতা বেড়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে শিক্ষকদের একটি বড় অংশ পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে হতাশ। বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকায় মেধাবীরা এ পেশায় আসতে কম আগ্রহী হচ্ছেন।’

মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন আরো বলেন, এমন বাস্তবতার নেতিবাচক প্রভাব শ্রেণীকক্ষে পাঠদানেও পড়ছে। এ অবস্থা নিরসনে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষকতা পেশায় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি, যেন মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হন।

চলতি বছর জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, ডিজিটাল শিক্ষা ও একুশ শতকের দক্ষতা প্রয়োগে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন দেশের শিক্ষকরা। প্রায় ৬০ শতাংশ নিজেদের দক্ষ দাবি করেন। তবে বাস্তবে শ্রেণীকক্ষে তা দেখাতে পারছেন কেবল এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক। আট বিভাগের ১৬টি উপজেলার ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ২১ শতকের দক্ষতার উপলব্ধি এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ অনুসন্ধান’ বিষয়ক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৫৩টি, যার মধ্যে ২৭ হাজার ৭৩৪টিই শূন্য। এসব পদে বর্তমানে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৩ আগস্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ‘কমিউনিটি এনগেজমেন্ট ইন প্রাইমারি এডুকেশন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের আলোচ্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে (পিইডিপি-৫) সংস্থাটির অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ৪১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকার এ প্রকল্পে সরকারি ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি আর দাতা সংস্থাগুলোর অনুদান ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা।

দাতা সংস্থার মধ্যে রয়েছে এডিবি, বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনিসেফ ও ইউনেস্কো। এ প্রকল্পের আটটি মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে স্কুল ইউনিফর্ম, ব্যাগ, জুতা ও মোজা প্রদান, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ট্যাব ও প্রশিক্ষণ প্রদান, ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ট্রি’ গ্রিন স্কুলিং কার্যক্রমের আওতায় গাছ রোপণ, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ স্থাপন এবং ডিজিটাল ডিভাইস, এসএলআইপি (স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান) বাস্তবায়ন, সব শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, ১৫ হাজার ৬৪১টি শ্রেণীকক্ষ, ১ হাজার ৫০০টি ওয়াশ ব্লক, ১০ হাজার বাউন্ডারি ওয়াল ও অভিভাবক শেড নির্মাণ এবং ফাউন্ডেশন লিটারেসি অ্যান্ড নিউমেরাসি (এফএলএন) কার্যক্রম।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন করতে হলে সবার আগে দক্ষ শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষে গুণগত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, সরকার ওয়ান টিচার-ওয়ান ট্যাবের কথা বলছে, নতুন কারিকুলামের কথা বলছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে এর কোনোটিই তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে না, যদি আমরা মেধাবী-দক্ষ শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষে যথাযথ পাঠদান নিশ্চিত করতে না পারি। মেধাবী-দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিতের জন্য প্রথমেই দরকার প্রাথমিক শিক্ষকদের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান নিশ্চিত করা। আমরা পিইডিপি-২-এর সময়েই প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডারের কথা বলেছিলাম। এটি করা হলে প্রাথমিকে মেধাবী-দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা নিয়ে সংশয় থাকত না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো যথাযথ পাঠদান ও মনিটরিং।

তিনি আরো বলেন, কারিকুলামের পরিবর্তন প্রয়োজন আছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পুরো শিক্ষাক্রম শতভাগ বদলে ফেলতে হবে। সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলো যেন অতীত সরকারের প্রকল্পের মতো শুধু ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন যেন নিশ্চিত হয়।’

প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির বিষয়টি ওঠে এসেছে জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও। শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার স্তর নির্ণয়ে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গাণিতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে দুই বছর পরপর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এ প্রতিবেদন তৈরি করে।

সর্বশেষ ২০২২ সালে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাংলায় ও ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ছিল ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ।

—————————————————————————————————————————-

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গবেষণার ফলাফল একই বাস্তবতা তুলে ধরছে। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। মূলত করোনার ধাক্কা থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের নানা দুর্বলতা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। পাশাপাশি গত দুই বছরে প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাঙ্গনে যে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, সেটিও এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

—————————————————————————————————————————-

তিনি আরো বলেন, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছে। তবে শুধু কারিকুলাম সংস্কার করলেই হবে না; শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে যেসব দুর্বলতা ওঠে আসছে, সেগুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের কথা বলছি। শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় এমনকি এক দশকের আগের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও এ সময়ে শ্রেণী অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনকারী শিক্ষার্থীর হার কমেছে। ২০১১ সালের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেবার তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ বাংলায় ও ৫০ শতাংশ গণিতে শ্রেণী অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছিল। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ছিল ২৫ আর গণিতে ৩৩ শতাংশ। সে অনুযায়ী প্রায় এক যুগে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনের দিক থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলায় এ হার কমেছে ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। গণিতের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্সে অবনতির মাত্রা ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় পারফরম্যান্সে উন্নতি হলেও গণিতে অবনতির মাত্রা ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।

অথচ এ সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছিল ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (পিইডিপি-৩) আওতায় ব্যয় করা হয় ১৮ হাজার ১৫৩ কোটি ৮৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০১১ সালে ‘প্রাথমিক শিক্ষায় সব শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা’র লক্ষ্য সামনে রেখে প্রকল্প শুরু করে তৎকালীন সরকার, যা শেষ হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। এর পর পরই ২০১৮ সালের জুলাইয়ে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-৪) কার্যক্রম শুরু করে সে সময়ের সরকার। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছিল ১৫ হাজার ৩১৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এ দুই প্রকল্পের অধীনে ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছিল প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং শিশুদের শ্রেণী উপযোগী শিখন দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন  বলেন, দীর্ঘদিনের ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামোর অংশ হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন শ্রেণী উপযোগী শিখন দক্ষতা অর্জন করতে পারে তার জন্য লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।৷ শিক্ষকরা যেন খুব আকর্ষণীয় কনটেন্টের মাধ্যমে; ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টারি, গান, মিউজিকের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারেন—সেজন্য “‍ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব” প্রোগ্রাম শুরু হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রাথমিকে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও ক্রীড়া-সংস্কৃতিচর্চাতেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে মাহদী আমিন আরো বলেন, ‘মানসম্মত পাঠদানের জন্য দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রাথমিকে শিশুদের নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়েছে, যেখানে দেশজুড়ে সব শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। চতুর্থ শ্রেণী থেকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতির দুটো পাঠ্যপুস্তক যুক্ত করা হচ্ছে। এক কথায় আগামী দিনগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম আরো বেশি সৃজনশীল এবং আরো বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হবে। শ্রেণীকক্ষগুলোকে শিক্ষা প্রদানের জন্য আরো বেশি আকর্ষণীয় করা হবে।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!