দিশারী ডেস্ক।। ১১ আগষ্ট, ২০২৬৭ খ্রিস্টাব্দ।।
সম্পত্তি সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধের জের ধরে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরজুবিলীর মৃত নুরেজ্জামান ফরাজি প্রকাশ মাইজ্জা মিয়ার পুত্র রফিক উদ্দিন ফরাজি একটি পরিকল্পিত ও নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার বর্ণনা রয়েছে বিভিন্ন সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে।
বিনয়ী, ভদ্র, মেধাবী ও সমাজহিতৈষী রফিক উদ্দিন ফরাজির এমন বেদনাদায়ক মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
————————————————————————————————–
অভিযোগের তীর স্বজনদের বিরুদ্ধে
————————————————————————————————
রফিক উদ্দিন ফরাজি সমাজে জাপানি রফিক হিসেবে বহুল পরিচিত। একজন সুশিক্ষিত, মেধাবী হিসেবেও তার পরিচিতির ভার বন্ধুমহলে চমৎকার। তিনি নোয়াখালীতে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে বন্ধু অলি উদ্দীন আহমদসহ ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাবি বিশ্ববিদ্যালয়ে জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি। মনোবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে ১৯৮৭ সালে পাড়ি দেন জাপানে। এরপর ভাগ্যের চাকা ঘুরোতে দেশ থেকে আত্মীয়-স্বজনসহ অনেককে জাপানে নিয়ে যান। সবারই ভাগ্য পরিবর্তনে আপ্রান চেষ্টা ছিল তার।
————————————————————————————————————————-
জাপানে নোয়াখালীবাসীর আধিক্যতার বদৌলতে প্রতিষ্ঠা করেন “গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবেও কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স নামক ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটির।
দেশের জাতীয় ব্যক্তিবর্গ জাপান সফরে গেলে অধিকাংশ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ রফিক উদ্দিন ফরাজির খুবই প্রশংসা করতেন। রফিক উদ্দিন ফরাজি নব্বইয়ের দশকে জাপানি কন্যা ” হিরোমী তামাগাওয়ার” সাথে বিয়েরবন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই পুত্র ও স্ত্রী রয়েছে জাপানে। জাপানি নাগরিকত্ব রয়েছে তাঁর। নাসার মাধ্যমে কয়েক বছর আগে চাঁদেও জমি খরিদ করেছিলেন। স্ত্রী হিরোমীর না মে সুবর্ণচরের চর কাজী মোখলেছ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন হিরোমী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
বন্ধু অলি উদ্দীন আহমদকে প্রচুর অর্থ দিয়েছিলেন চরজব্বার ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য বলে জানালেন জীবদ্দশায়। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন রফিক উদ্দিন ফরাজি।
————————————————————————————————————————-
জাপানসহ অসংখ্য দেশে রপ্তানি করেন ঢাকায় নিজের প্রতিষ্ঠিত “রাফকো ফ্যাশন লিমিটেড” এর প্রস্তুুতকৃত পোশাক। রপ্তানিকারক হিসেবে সুপরিচিত রফিক উদ্দিন ফরাজির প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কর্মরত রয়েছে প্রায় অর্ধসহস্রাধিক রেমিট্যান্সযোদ্ধা মজদুর শ্রমিক।
৫ আগস্ট, বুধবার কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জে সংঘটিত কথিত সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সমাজের বিভিন্নমহলের নানা অভিযোগে জানা যায়, ওইদিন ভোরে ঢাকা থেকে সুবর্ণচরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন ঢাকা মেট্টো গ-২৭-৭০২৬ প্রাইভেট কারটি নিয়ে। গাড়িটির চালক ছিলেন বরিশালের টুটুল নামের একজন ড্রাইভার।
অভিযোগ রয়েছে, এদিন গাড়ির প্রকৃত চালক বাবুল বরিশালের টুটুলকে গাড়ির চালক হিসেবে পাঠান। এরপর ভোরে ঢাকা হতে রওয়ানা দিয়ে আনুমানিক সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে পৌঁছে যান কুমিল্লা চান্দিনা থানাধীন ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানা এলাকায়।এরইমধ্যে পথে কথিত দুর্ঘটনার নামে চান্দিনা হাসপাতালে পৌঁছে রফিক উদ্দিন ফরাজির প্রানহীন দেহটি। এ সময় তার সাথে রক্ষিত হাতের মোবাইল, গলার চেইন, মানি ব্যাগ, কিছুই ছিলনা। একইসঙ্গে, ছিলনা ওই চালকের নিয়োগ করা সেই চালকটিও। সবার আগে মৃত্যুর খবর পেয়ে যায় বাবুল। তিনিই স্বজনদের জানান এমন মৃত্যুর খবর।
————————————————————————————————————————————
বাবুল ড্রাইভার মুঠোফোনে জানান, তিনি রফিক ফরাজিকে প্রায় সময় নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আনা নেয়া করতেন। তিনি জানান, রফিক ফরাজির নির্ধারিত কোন গাড়ি ছিলনা। আমি রেণ্ট কারের ব্যবসা করি। সে কারণে তিনি আমার গাড়ি নিতেন প্রায়। তবে সেদিন আমি ছিলাম না। সেদিন বরিশালের টুটুল চালক হিসেবে ছিলেন।
————————————————————————————————————————————

সরেজমিনে গাড়িটি ও স্থানীয় এলাকার পারিপার্শ্বিকতায় জানা যায়, ওয়ানওয়ে সড়কে চলমান রফিক উদ্দিন ফরাজির গাড়ীটির সামনের ডান পাশে সামান্য ক্ষতিগ্রস্তের নমুনা রয়েছে । যাতে ওয়ানওয়ে হিসেবে মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।
আবার সামনে ওভারটেক করার সময় ডানে থাকা কোন পরিবহনের সাথে ধাক্কা লাগতে পারে বলে ধারণা করারও কারণ নেই। যদি এমন হয়, তাহলে চালক মারাত্মকভাবে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন নিশ্চয়। অক্ষত ও সুস্থ্য চালককে হাসপাতাল কিংবা থানায় পাওয়া যায়নি বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়।
একজন জানালেন, চালক কর্তৃক সরবরাহকৃত তথ্য মোতাবেক রফিক উদ্দিন ফরাজি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে তাঁর শরীরে কোন আঘাত বা ক্ষত চিহ্ন নেই কেন ?
———————————————————————————————————————————-
অনেকের ধারণা, কিছুদিন আগে রফিক ও তার এক ভাই চরওয়াপদার সাবেক চেয়ারম্যান মনির আহমেদের পুত্র আবিরের সাথে পারিবারিক সম্পত্তির হিসেব নিকেশ নিয়ে বেশ বাকবিতন্ডা হয়। এ সময় ভাতিজা আবির তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। আর এমন হুমকির পরিণতি হয়তোবা চালক বাবুলের মধ্যস্থতায় নিষ্পন্ন হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।
————————————————————————————————————————————
তবে এ বিষয়ে মনির আহমেদ মুঠোফোনে বলেন, পাারিবারিকভাবে আমাদের কিছু ঝামেলা ছিল। তবে তা সমাধান হয়ে গেছে। এমন ঘটনায় তার পুত্র জড়িত নেই বলেও দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় মনির আহমেদের পুত্র আবির বলেন, তিনি আমার চাচা। আমাদের পারিবারিক বিষয়াদী নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বরং, তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।

এদিকে, রফিক উদ্দিন ফরাজির ময়না তদন্ত শেষের পরপরই ৬ আগষ্ট, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। আর এমন তড়িগড়িতে দাফন সম্পন্ন করা নিয়েও রয়েছে অনেকের নানা আলোচনা, সমালোচনা এবং বিস্ময়।
রফিক উদ্দিন ফরাজির মৃত্যু কি সড়ক দুর্ঘটনায়,না হত্যা জানতে চায় শুভানুধ্যায়ীরা। জাপানি নাগরিকত্ব পেয়েও দেশপ্রেমিক রফিক উদ্দিন ফরাজি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য স্ত্রী সন্তানদের জাপান রেখে বাংলাদেশে থাকেন, এটাই কি অপরাধ ছিল ?
বহু বছরের বিশ্বস্ত চালকের দেয়া অন্য চালক কেন আবার আরেকজন চালক দিলেন, তা যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। রফিক উদ্দিন ফরাজি জীবদ্দশায় কখনো পেছনে তার পাশে কাউকে বসাতেন না। বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, ওই গাড়ীতে আরেকজন তৃতীয় ব্যক্তি ছিল, তাহলে কে সে ?

স্থানীয়রা দাবি করছেন, জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও তৈরি পোষাক রপ্তানিকারকের এই সন্দেহজনক মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদারদাতা দেশ জাপানের নাগরিক হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর রহস্য উদঘাটন হওয়া জরুরি।
রফিকের মৃত্যুর নাটকীয়তা উদঘাটনে সরকারের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাসংস্থাসহ সংশ্লিষ্টমহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সুবর্ণচরের জনগণ।
Leave a Reply