দিশারী ডেস্ক।। ৭ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বাংলাদেশের অপরাধ জগতের চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে বা ক্রমশ যাচ্ছে। মাদক, অস্ত্র চোরাচালান, খুন, অপহরণ, ছিনতাই ও প্রতারণার মতো অপরাধগুলো এখন ডিজিটাল মাধ্যম ও সাইবার পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডার্ক ওয়েব ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিচ্ছে। অপরাধ লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে। বিশেষ করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীর অস্ত্রের স্থান বা জায়গা দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন আর ল্যাপটপের ডিজিটাল পদ্ধতি।
গোপন ও নিরাপদ আস্তানার পরিবর্তে অপরাধের নতুন সদর দপ্তর এখন ভার্চুয়াল জগৎ। নির্দেশ আসে মোবাইল ফোনের পর্দায়, লেনদেন হয় ডিজিটাল মাধ্যমে আর সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিরা। শেষ পর্যন্ত রক্ত ঝরে রাজপথে, পড়ে থাকে কোনো নিথর দেহ আর আতঙ্কে ঘুম হারাম হয় সাধারণ মানুষের। অপরাধ বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ আর অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে বর্তমান অপরাধ পরিস্থিতির এমন ভয়ংকর বাস্তবতা।
ভুয়া ওয়েবসাইট, ফিশিং লিংক এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) মাধ্যমে কণ্ঠস্বর ও মুখাবয়ব নকল (ডিপফেক) করে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। ফেসবুক পেজ, টেলিগ্রাম চ্যানেল ও ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে হোম ডেলিভারির মাধ্যমে চলছে মাদকের কারবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোড ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে অস্ত্র বেচাকেনা ও অর্থের লেনদেন হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। টার্গেট করা ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাক করে বা আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। সমস্যা হলো, এসব অপরাধী আন্তঃসীমান্ত ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, ফলে সনাতন পদ্ধতিতে তাদের ধরা কঠিন হচ্ছে।
———————————————————————————————————————-
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে প্রযুক্তি, সমাজ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সংকট। সাইবার অপরাধের অর্থপ্রবাহ বন্ধ করা, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং নেপথ্যের গডফাদারদের বিচারের আওতায় আনা, এই তিন ক্ষেত্রে একযোগে অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ আজকের অপরাধী কেবল গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে নেই, সে লুকিয়ে আছে ডিজিটাল পর্দার আড়ালে। তার নির্দেশ পালন করছে পথভ্রষ্ট কিশোরেরা। আর তার অস্তিত্বের প্রমাণ মিলছে দেশের কোথাও না কোথাও পড়ে থাকা আরেকটি লাশে।
———————————————————————————————————————-
প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং হত্যাকাণ্ডের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো একই অপরাধকাঠামোর পরস্পর নির্ভরশীল চারটি স্তর। এক স্তর অর্থ জোগায়, আরেক স্তর পরিকল্পনার ছক আঁকে, তৃতীয় স্তর সৃষ্টি করে রক্তাক্ত পরিণতি আর চতুর্থ স্তর করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং, থানা-পুলিশ-আদালত করার পাশাপাশি কেউ বিপদে পড়লে তাকে এবং তার পরিবারকে সাহায্য করে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এ অদৃশ্য নেটওয়ার্কের ভয়াবহতা হলো, এর অধিকাংশ সদস্য দৃশ্যমান হলেও প্রথম আর চতুর্থ স্তরের সদস্যরা থেকে যাচ্ছে আড়ালেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর অর্থের উৎসে বড় পরিবর্তন এসেছে। চাঁদাবাজি বা মাদক ব্যবসার পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ, ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি এবং অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা এখন অর্থের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।
ঘটনাগুলো দেখতে বিচ্ছিন্ন হলেও তদন্তকারীরা বলছেন, এগুলোর শিকড় প্রায় ক্ষেত্রেই একই জায়গায় গিয়ে মিশছে। সেই শিকড়ের এক প্রান্ত লুকিয়ে আছে মোবাইল ফোন, এনক্রিপটেড অ্যাপ, অনলাইন জুয়া ও সাইবার প্রতারণার অন্ধকার জগতে। আরেক প্রান্ত ছড়িয়ে আছে পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ চক্রের মধ্যে। মাঝখানে রয়েছে কোটি-কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ। আর শেষ প্রান্তে পড়ে থাকে রক্তাক্ত লাশ।
———————————————————————————————————————-
দেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অপরাধ বিশ্লেষক এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, এখন বিরাজ করছে ভয়ংকর বাস্তবতা, প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ। অপরাধ জগতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতিতে। আগে চাঁদাবাজি, ডাকাতি কিংবা মাদক ব্যবসাই ছিল মূল আয়ের উৎস। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা, ফিশিং, ভুয়া বিনিয়োগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক জালিয়াতি এবং অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা।
———————————————————————————————————————-
তিনি আরও বলেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে অবস্থান করা সংঘবদ্ধ চক্রগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এনক্রিপটেড যোগাযোগব্যবস্থার কারণে তাদের শনাক্ত করাও কঠিন। তবে আমরা আশাবাদী যে, পুলিশ তৎপর। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ সিম, ল্যাপটপ, সার্ভার, কল-রাউটিং ডিভাইস, ভিওআইপি যন্ত্রপাতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, অপরাধের নির্দেশনা এখন অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে দেয়া হয়। মাঠে যারা কাজ করে, তারা অনেক সময় মূল হোতার পরিচয়ই জানে না। প্রযুক্তির আড়ালে থাকা এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান বাহিনী হচ্ছে কিশোর গ্যাং। বেশ কয়েকটি সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ, মাদকাসক্তি, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক অবহেলা এবং অপরাধী চক্রের প্ররোচনায় অনেক কিশোর অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। রাজধানীতে সাম্প্রতিক অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে শত শত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র, মাদক এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধে ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিভাইস। কিন্তু প্রশ্ন ওঠছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা কি সত্যিই এই অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি ? মূলত অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধরা পড়ছে মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা। কিন্তু অর্থদাতা, প্রযুক্তি অপারেটর এবং নেপথ্যের নির্দেশদাতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অপরাধ এখন আর শুধু অন্ধকার গলিতে নয়। তার সদর দপ্তর চলে গেছে ভার্চুয়াল জগতে। তার সৈনিক।
Leave a Reply