ডেস্ক রিপোর্ট
১২.০১.২০২৩
———–
নীরবে নিভৃতে দাম বাড়ছে টয়লেট্রিজ পণ্যের। সুগন্ধি সাবান, কাপড় ধোঁয়ার সব ধরনের সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার, টুথপেস্টের দাম সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা বেড়েছে। শতাংশের হিসেবে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে এসব নিত্যপণ্যের উচ্চ দামে নাকাল সাধারণ মানুষ বাড়তি দামে টয়লেট্রিজ পণ্য কিনতে গিয়ে অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। উৎপাদনকারীরা এই দাম বাড়ানোকে যৌক্তিক বললেও অস্বাভাবিক বলছে প্রতিযোগিতা কমিশন। ইতোমধ্যেই ৫ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কমিশন।
টয়লেট্রিজ পণ্যের এমন দাম বাড়ার বিষয়ে এক মুদি দোকানদার বলেন, ‘ভাই সব জিনিসের দাম বেড়েছে, আড়াল দিয়া সুগন্ধি সাবান, গুড়া সাবান, পেস্টেরও দাম বাড়ছে। ক্রেতা আহে জিগায় দাম বাড়ে কেন। কথাকাটি হয়, বেচাকেনা করার চাইতে ব্যাখ্যাই দিতে হয় বেশি। গায়েরমূল্য দেখাইয়া বুঝাইতে হয় ক্রেতাদের।’
আরেক বিক্রেতা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমাদের কী করার আছে বলেন, আমরা কোম্পানি থেকে বেশি দামে পাই বেশি দামে বিক্রি করি। কোম্পানি যদি কম দামে দিতে পারে তাহলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারি। কম দামে পণ্য পাইলে আমাদের জন্য আরও ভালো হয়, বেচাকেনাটা বেশি হয়। জানুয়ারি মাস থেকেই সাবান, গুড়া পাউডারের দাম বাড়ছে।
পণ্য কিনতে আরেক গ্রাহক বলেন, ‘আগে একটা ছোট আকারে সুগন্ধি সাবান ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় কিনতাম এখন তা কিনতে হয় ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। গুড়া সাবানের দামেরও একই অবস্থা—হু হু করে বাড়ছে। কীভাবে যে সামাল দিয়ে চলতাছি তা শুধু আমি ছাড়া কেউ জানে না।’
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ও সর্বশেষ বাজার দরের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে লাইফবয় এবং লাক্সের একটি সাবানের দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় থাকলেও ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তা বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে। একইভাবে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ডেটল সাবান ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও জানুয়ারি মাসে তার দাম ওঠে ৮০ টাকায়। একই সময়ে ৪০ টাকা দরের তিব্বত সাবান বিক্রি হয় ৬০ টাকায়। এ ছাড়া জানুয়ারিতে ৪০ টাকা থাকা মেরিল সাবান জানুয়ারিতে আসে ৫৫ টাকায়। একই সঙ্গে এই সময়ে ৫০ টাকা দরের স্যাভলন সাবান বিক্রি হয় ৭০ টাকা দরে।
ক্যাবের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ডিটারজেন্ট পাউডার চাকা এবং তিব্বতের ১ কেজির দর ১০০ টাকায় থাকলেও জানুয়ারিতে তার দাম ওঠে ১৪০ টাকায়। এই সময়ে ১০০ টাকার এক কেজি হুইল পাউডার বিক্রি হয় ১৪৫ টাকায়। একইভাবে ১ কেজি সার্ফ এক্সেল ডিটারজেন্ট পাউডারের দাম ৭০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয় ২৮০ টাকায়।
বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগে টয়লেট্রিজ পণ্যসংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। সংস্থাটি বলছে, প্রতিযোগিতা কমিশন আইনের ১৫ এবং ১৬ ধারা লঙ্ঘন করেছে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। আর কমিশনের করা এই মামলার শুনানি এখনও চলমান।
প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ’যে পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশন মামলা করেছে তার শুনানি চলছে। শুনানিতে দাম বৃদ্ধির বিষয়টি প্রমাণিত হলে কমিশনের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
প্রতিযোগিতা কমিশনের আইন অনুযায়ী, অভিযুক্ত কোনো কোম্পানির অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভারের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ যাচাই করতে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
কমিটির প্রধান ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘গত কয়েক মাসে দাম যৌক্তিকভাবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়িয়েছে কি না তা যাচাই-বাছাই করতে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে ভোক্তা-অধিকারের দুজন, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একজন, দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশের একজন, কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের একজন এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের একজন করে সদস্য রয়েছেন। সঠিকভাবে যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা যাবে।’
দাম বৃদ্ধির বিষয়ে ইউনিলিভার বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশনসের ডিরেক্টর বলেন, ‘ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়াসহ আমদানি এবং উৎপাদন ব্যয় প্রকটভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাবান, ডিটারজেন্ট, পেস্ট, লিকুইড ক্লিনারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের জন্য আবশ্যক ছিল। তবে আমরা টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম সব সময় গ্রাহকের নাগালের মধ্যেই রাখতে চেষ্টা করি। কারণ, এসব পণ্যের দাম বাড়লে গ্রাহকরা পণ্যটির ব্যবহার কমিয়ে দেন বা পণ্যটির ব্যবহার থেকে বিরত থাকেন।’
টয়লেট্রিজ পণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘ভোক্তা সাধারণকে সচেতন হবে। বেশি দামে যেসব প্রতিষ্ঠান বিক্রি করবে তাদের পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রিতে ভাটা পড়লে আপনা-আপনিই দাম কমাতে বাধ্য হবে।’