পুষ্টির ঝুঁকিতে উত্তরাঞ্চলের শিশুরা

  • আপডেট সময় শনিবার, জুন ২৪, ২০২৩
  • 250 পাঠক

দিশারী ডেস্ক। শনিবার। ২৪ জুন, ২০২৩

————————————-

শিশুদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে অপুষ্টি। এর শিকার শিশুর শাররিক বৃদ্ধি হয় কম। তাদের বুদ্ধিগত বিকাশও হয় ধীরে। এমনকি অপুষ্টি শিশুকে ঠেলে দিতে পারে প্রতিবন্ধিতার দিকেও। রক্তাল্পতা থেকে ঝুঁকি বাড়ে হৃদরোগের।

অপুষ্টির এমন সব ক্ষতির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের শিশুরা। গবেষণা বলছে, মায়েদের পুষ্টি সচেতনতার অভাবে ক্রমেই বাড়ছে সংকট।

সম্প্রতি মাতৃ পুষ্টিজ্ঞান এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে শিশুর পুষ্টির অবস্থার নির্ধারক শীর্ষক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জার্নাল অব মাল্টিডিসিপ্লিনারি সায়েন্টিফিক রিসার্চ। সেখানেই এমন চিত্র ওঠে এসেছে। গবেষণাটির প্রধান গবেষক হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিলকিস বানু।

তিনি বলেন, ‘দেশের উত্তরাঞ্চলে শিশুদের প্রতিপালনে মায়েদের পুষ্টিজ্ঞানের বর্তমান অবস্থা চিহ্নিত করতে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়। পুষ্টিজ্ঞান বিষয়ে তথ্য নিতে গবেষকরা ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সন্তান রয়েছে—এমন ৫৩৭ মায়ের সাক্ষাৎকার নেন। বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মায়েদের এ গবেষণার আওতায় আনা হয়।’

গবেষণাটিতে রাজশাহী বিভাগের ২৯১ জন মায়ের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এর মধ্যে রাজশাহী জেলার ৮৯ জন, নওগাঁর ৪৩, সিরাজগঞ্জের ৭৪ এবং বগুড়ার ৮৫ জন। অন্যদিকে গবেষণায় অংশ নেন রংপুর বিভাগের ২৪৬ জন মা। এর মধ্যে রংপুর জেলার ৭২ জন, দিনাজপুরের ৫৯, গাইবান্ধার ৬০ এবং পঞ্চগড়ের ৫৫ জন।

গবেষক জানান, গবেষণায় অংশ নেয়া প্রায় ৫৬ শতাংশ মায়ের শিশু পুষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান নেই। মাত্র ৭ শতাংশ মা খুব ভালো জ্ঞান রাখেন। ৩৭ শতাংশ মায়ের পুষ্টিজ্ঞান দুর্বল। কিছু মা কর্মজীবী হওয়ায় তারা শিশুর যত্নের জন্য যাকে রেখেছেন তাদেরও আনা হয়েছে গবেষণার আওতায়। এদের ৫৮ শতাংশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। ৭ শতাংশ প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। ১১ শতাংশ প্রাথমিক পেরিয়েছেন। বাকি ১৪ শতাংশ মাধ্যমিক শেষ করেছেন। ফলে তাদের পুষ্টিজ্ঞানও সীমিত।

তিনি আরো জানান, উত্তরদাতাদের প্রায় ৬২ শতাংশ প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ রঙের খাবার দেয়ার চেষ্টা করে। ৪১ শতাংশ মা শিশুর দুধে চিনি যোগ করেন। সন্তানের খাবারের তালিকা ঘন ঘন পরিবর্তন করেন ৪১ শতাংশ মা। প্রায় ৯৭ শতাংশ মা শিশুকে শালদুধ খাইয়েছেন। ৮৮ শতাংশ মা শিশুর খাদ্যতালিকায় আধা-সলিড খাবার দেন। ৬৬ শতাংশ মা জানেন শিশুরা প্রতিদিন কী খাবার খায়। প্রায় ৭৩ শতাংশ মা শিশুদের ফাস্টফুড দেন। প্রায় ৫০ শতাংশ মা ওষুধের জন্য শিশুদের নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যান।

এ প্রসঙ্গে বিলকিস বানু বলেন, ‘শৈশবের অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুষ্টিশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টি সম্পর্কে মায়ের যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে শিশুর অপুষ্টির শিকার হওয়ার শঙ্কা অনেক বেশি। নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থা, মায়েদের শিক্ষার হার কম থাকা এবং একচেটিয়া স্তন্য পান না করা পরিবারগুলোয় পুষ্টির চিত্র বেশি খারাপ দেখা গেছে। এজন্য প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং সেবিকাদের মাধ্যমে মায়েদের আরো বেশি সচেতন করা প্রয়োজন।’

গত ২৩ মে ‘শিশু অপুষ্টির মাত্রা ও প্রবণতা’ নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংক। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে অপুষ্টির শিকার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার। বয়সের তুলনায় এদের উচ্চতা কম বা খর্বকায়। ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ ৪৬ হাজার বা ৩৯ শতাংশ। এছাড়া ১৪ লাখ ৩৮ হাজার বা ৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু রোগা-পাতলা বা কৃষকায়।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বলছে, দেশে ২৪ শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। অর্থাৎ দেশে চারটি শিশুর মধ্যে একটি শিশুর উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। তবে গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে নানা ধরনের উদ্যোগের ফলে দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট) প্রকাশিত এ জরিপের তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী খর্বকায় শিশু ছিল ৪১ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬ শতাংশে। ৩১ শতাংশে নেমেছে ২০১৮ সালে। সর্বশেষ ২০২২ সালে তা নেমেছে ২৪ শতাংশে।

জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের শিশুপুষ্টির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দেশে কম ওজনের শিশুর হার কমছে না। বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সী কম ওজনের শিশু ২২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালেও এ হার ছিল ২২। অন্যদিকে কৃষকায় শিশুর হার বাড়ছে। ২০১৭-১৮ সালে কৃষকায় শিশু ছিল ৮ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১১ শতাংশ। এটি পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতির লক্ষণ।

বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের রংপুর অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুকে দানাদার বা শস্য, ডাল বা ডাল জাতীয়, বীজ বা বাদাম, মাছ-মাংস, ডিম, দুধ, ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ শাক-সবজি এবং অন্যান্য শাকসবজি খাওয়ানোর কথা বলি। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের শিশুরা দানাদার খাবারের পাশাপাশি দুধ এবং মাছ-মাংস খায়। ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ শাকসবজি তাদের খাওয়ানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের এ সংকট প্রকট।’

তিনি যোগ করেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করা পরিবারগুলো সংকটের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। করোনাকালে কাজ হারিয়ে অগণিত পরিবার দরিদ্র হয়ে পড়েছে। এখন মাত্রাতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করা পরিবারগুলো চাহিদামতো পুষ্টির জোগান দিতে পারছে না। পরিবারের আয় কমে গেলে শিশুরা অপুষ্টির শিকার হবে—এটাই স্বাভাবিক।

এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. এবিএম আবু হানিফ বলেন, ‘আমাদের দেশে শিশুদের পুষ্টি সমস্যা নতুন নয়। এটি মায়েদের থেকেই আসছে। এজন্য দেশে সমন্বিত টিকাদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করছেন। পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। আমাদের আরো উন্নতি করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ-সংক্রান্ত সেবা দেয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে তীব্রতম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর চিকিৎসায় বিশেষ কর্নার চালু রয়েছে। এখানে প্রশিক্ষিত নার্স ও চিকিৎসক রয়েছেন। নিবিড় সেবার মাধ্যমে চিকিৎসার পাশাপাশি সেখানে থেরাপিউটিক খাবারও পাচ্ছে আক্রান্ত শিশুরা।’

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!