ব্যারিস্টার নাজির আহমদ।। ০৯ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।
রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান ছিলেন সিলেট তথা বাংলাদেশের এক সুর্য সন্তান। আজ তাঁর ৯১তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৪ সালের ৩‘রা নভেম্বর বাংলাদেশের সিলেট জেলার বিরাহীমপুরের এক বনেদি ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এই কৃতি সন্তান জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর বাবা আহমেদ আলী খান বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের প্রথম মুসলিম ব্যারিস্টার। তিনি গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে ১৯০১ সালে ব্যারিস্টার হন। তিনি নিখিল ভারত আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ও আসাম কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মাহবুব আলী খানের মা যুবাইদা খাতুন ছিলেন এক বিদুষী মহিলা। দু’ভাই ও এক বোনের মধ্যে মাহবুব আলী খান ছিলেন কনিষ্ঠ।
সিলেটের বিরাহীমপুর, কলকাতা ও ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকার পুরানাপল্টন লাইনের বাড়িতে মাহবুব আলী খানের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। তিনি কলকাতা ও ঢাকাতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। তার কলেজ জীবনের শিক্ষা ঢাকা কলেজে। শেরে সিলেট ও অবিভক্ত পাকিস্তানের মন্ত্রী আজমল আলী চৌধুরী এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল (অব:) এমএজি ওসমানী ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই।
১৯৫২ সালে মাহবুব আলী খান ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় সম্মিলিত বাহিনী স্কুল থেকে তিনি সম্মিলিত ক্যাডেট হিসেবে সফলভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ডার্টমাউথ রয়্যাল নেভাল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করে ব্রিটিশ রণতরী ট্রায়ামপতে ১৯৫৪ সালে প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
———————————————————————————————————–
গ্র্যাজুয়েশন লাভের পর মাহবুব আলী খান ১৯৫৫ সালে সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দু’কন্যা – শাহিনা খান (বিন্দু) এবং ডাঃ জুবাইদা খান (বিনু)। ডা. জুবাইদা খান (পরবর্তীতে ডা: জুবাইদা রহমান) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী এবং সাবেক প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জৈষ্ঠ্য পুত্রবধূ।
মাহবুব আলী খান তাঁর মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখেন তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা জুবাইদা রহমানের নাম। এ থেকে প্রমাণিত হয়ে যে তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা জুবাইদা রহমানকে তিনি কতটুকু হৃদয় থেকে ভালবাসতেন।
———————————————————————————————————–
১৯৫৬ সালের ১লা মে মাহবুব আলী খান স্থায়ী কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে কৃতী অফিসার হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক পুরস্কৃত হন। তিনি ১৯৬০ সালে পি. এন. এস (পাকিস্তানি নেভাল শীপ্) তুগ্রিলের গানারি অফিসার ছিলেন এবং ১৯৬৪ সালে পি. এন. এস টিপু সুলতানের টর্পেডো ও এন্টি সাবমেরিন অফিসার ছিলেন।
১৯৬৭-৬৮ সালে মাহবুব আলী খান রাওয়ালপিন্ডিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে জয়েন্ট চিফস সেক্রেটারিয়েট স্টাফ অফিসার (ট্রেনিং এবং মিলিটারি এসিস্ট্যান্স) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৭০ সালে পি. এন. এস হিমালয়ে টর্পেডো ও এন্টি সাবমেরিন স্কুলের অফিসার ইনচার্জ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে সিওয়ার্ড ডিফেন্স অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে মাহবুব আলী খান চট্টগ্রামে মার্কেন্টাইল একাডেমির প্রথম বাঙালি কমান্ড্যাট নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে নৌ-সদর দফতরে পার্সোনাল বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি নৌবাহিনীর সহকারী স্টাফ প্রধান (অপারেশন ও পারসোনাল) নিযুক্ত হন।
১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভি কর্তৃক হস্তান্তরিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম রণতরী বি. এন. এস (বাংলাদেশী নেভাল শীপ্) ওমর ফারুকের (প্রাক্তন এইচ. এম. এস ন্যাভডকে) অধিনায়ক হন মাহবুব আলী খান। এ রণতরী গ্রহণের পর তিনি তা নিয়ে আলজেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, মিসর, সৌদি আরব এবং শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোয় শুভেচ্ছা সফরের পর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের নৌবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হন এবং ১৯৮০ সালের ১লা জানুয়ারি বিয়ার অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত হন।
মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে বিশ্বমানের আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে মাহবুব আলী খান সচেষ্ট হন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় আইনও তৈরি করেন। ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমায় দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ জেগে ওঠে। তারপর থেকেই বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় দেশের সরকারই দ্বীপটিকে তাদের মালিকানা বলে দাবি করে থাকে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের নেতৃত্বে এই দ্বীপটি নৌবাহিনী বাংলাদেশের দখলে রাখতে সক্ষম হয়। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অনেক জলদস্যুকে কঠিন হস্তে পরাহত করেছেন তিনি। এছাড়া মাহবুব আলী খান সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও পেনশন কমিটির চেয়ারম্যান, দেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের জাতীয় বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশে উপজেলা পদ্ধতির অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন।
———————————————————————————————————–
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশে সিপাহি- জনতার বিপ্লবের পর ক্ষমতার দৃশ্যপটে আসেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর সরকারের সময় নৌবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মাহবুব আলী খান তৎকালীন সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া ‘জাগদল’-এর সদস্য ছিলেন। তিনি সরকারি চাকরিরত অবস্থায় জাগদল-এ দায়িত্বশীল পদে আসীন হননি।
১৯৮২ সালে দেশে সামরিক আইন জারিকালে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৮২ সালের ১০ই জুলাই থেকে ১৯৮৪ সালের ১লা জুন পর্যন্ত তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
—————————————————————————————————————-
কৃষিমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়ার সবুজ ও কৃষি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালে তিনি দেশের রাস্তাঘাট, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেন। মাহবুব আলী খান মনেপ্রাণে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি বিপ্লব, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছেন।
জেনারেল (অব:) এমএজি ওসমানী তাঁর সম্পর্কে চাচাত ভাই হওয়ায় নৌবাহিনীর উন্নয়নে আরও বেশি কাজ করতে পেরেছেন মাহবুব আলী খান। জেনারেল ওসমানী তাকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করেছেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বড় ভাই রেজাউর রহমান নৌবাহিনীতে মাহবুব আলী খানের সহকর্মী ছিলেন। সে সুবাদে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মাহবুব আলী খানেরও নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এরই ফলশ্রুতিতে ও ধারাবাহিকতায় মাহবুব আলী খানের কনিষ্ঠ কন্যা জুবাইদা খান জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
——————————————————————————————————-
১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট ক্রাশ করে দুর্ঘটনা কবলিত হলে সেই দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ তদারকির দায়িত্ব পালন শেষে ৬ আগষ্ট হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এ দেশপ্রেমিক মহান ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান হয়। তাকে ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান একজন ক্ষনজন্মা পুরুষ ছিলেন। ক্ষনজন্মা পুরুষ খুব বেশি দিন বেঁচে থাকেন না। অন্য কথায় মহান স্রষ্টা খুব বেশি দিন বাঁচিয়ে হয়তো তাদের এই ধরাতে রাখেন না। তাদের আগমন ও প্রস্থান হয় এই পৃথিবীতে অনেকটা উল্কার মতো। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া মাত্র ৪৪ বছর বেঁচে ছিলেন ; ৩৯ বছর বয়সে সেনাপ্রধান, ৪১ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতি এবং ৪৪ বছর বয়সে এই ধরা ত্যাগ।
——————————————————————————————————-
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম যদিও ৭৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন তাঁর কাব্য জীবন ছিল ৪৪ বছর বয়সের মধ্যে মাত্র ২৩ বছর। এত অল্প হায়াতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া ও কবি নজরুল ইসলাম জাতিকে যা দিয়ে গেছেন তারা যদি দীর্ঘ জীবন পেতেন তাহলে জাতি তাদের কাছ থেকে কি যে কি পরিমাণ সেবা ও কনট্রিবিউশন পেত তা সহজেই অনুমেয়।
ঠিক তেমনি রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান মাত্র ৪৯ বছর বেঁচে ছিলেন। ৪৫ বছর বয়সে তিনি নৌবাহিনীর প্রধান হোন। বাকি চার বছরে যথাক্রমে তিনি উপ সামরিক আইন প্রশাসক, যোগাযোগ মন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রী ছিলেন।
এই অল্প জীবনে সিলেট ও বাংলাদেশকে যা দিয়েছেন তা অতুলনীয়। সিলেট গেলে তাঁর উন্নয়নের ছোঁয়া পাওয়া যায়। শাহজালাল সেতু ও সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ককে লামাকাজি সেতুসহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজে তার অবদান অপরিসীম। তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে, বঙ্গোপসাগরে অনেক জলদস্যুর পতন ঘটাতে এবং সর্বোপরি নৌবাহিনীকে আধুনিকায়ন করণে তাঁর যুগান্তকারী ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
লেখক : নাজির আহমদ : বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk
Leave a Reply