দিশারী ডেস্ক।। ০৬ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
নতুন ভোরের নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে মানুষ নিজ নিজ কাজে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হন। কিন্তু দিনশেষে সবার আর ঘরে ফেরা হয় না। সড়কেই ঝরে যায় স্বপ্ন। লাগাতার দুর্ঘটনার কারণে দেশের সড়কগুলো এখন নিষ্ঠুর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অথচ এসব মৃত্যুর দায় নিতে রাজি নয় কোনো পক্ষই।
——————————————————————————————————–
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ ১২ বছর ৩ মাসে দেশে ৭০ হাজার ৯৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৭ হাজার ৪০৬ জন এবং পঙ্গুত্বের অভিশাপ ঘাড়ে নিয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ জন।
——————————————————————————————————–
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ- এই তিনের জটিল সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে এই ভয়াবহ বাস্তবতা।
গত সোমবার ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মুক্তাগাছায় বালুবাহী ট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে নারী-শিশুসহ ৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই দিন সুনামগঞ্জে ৫ ও টাঙ্গাইলে ২ জনসহ মোট ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
এর আগের দিন রোববার সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় ট্রাকের ধাক্কায় পিকআপে থাকা ৯ জন নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রাকের ধাক্কায় শ্রমিকরা পাখির বাচ্চার মতো ছিটকে পড়ে যান। কারণ হিসেবে ওঠে এসেছে- চালকের বদলে হেলপার গাড়িটি চালাচ্ছিল। একই দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা ও ঝিনাইদহে ঝরেছে আরও চার প্রাণ।
শুধু এই দুর্ঘটনাগুলোই নয়, প্রায় প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। কোথাও বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, কোথাও আবার বেপরোয়া ট্রাকের চাপায় ঝরে যাচ্ছে একাধিক প্রাণ। মহাসড়ক থেকে আঞ্চলিক সড়ক সবখানেই আছে ঘাতক গাড়ির চাকা। এসব দুর্ঘটনার বড় অংশই প্রাণঘাতী। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বাড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি।
নিরাপদ সড়ক নিয়ে নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুর্ঘটনার সংখ্যা কমার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক।
——————————————————————————————————-
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রাণ যাচ্ছে ৮ হাজার মানুষের। যার ৬০ শতাংশই ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সি কর্মক্ষম মানুষ। পঙ্গু হাসপাতাল (নিটোর) সূত্র জানায়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ৫৬ শতাংশ রোগীই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না, একটি সাজানো পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে চিরতরে।
——————————————————————————————————-
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ অব্যবস্থাপনা, আইনের প্রয়োগহীনতা এবং ত্রুটিপূর্ণ সড়ক-নকশা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এটি কমানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে ঢাকা শহরের পরিবহনচালকদের মাঝে যাত্রী ধরার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তিনি আরও বলেন, মহাসড়কের পাশে অবৈধ হাটবাজার এবং ধীরগতির যানের অবাধ চলাচল রুখতে না পারলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. সাইদুর রহমান বলেন, সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না। সড়ক দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে বলেন, উন্নত দেশগুলো বৈজ্ঞানিক পন্থায় দুর্ঘটনা কমিয়ে এনেছে, আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসেইন। তিনি বলেন, বেপরোয়া গতি ও ফিটনেসবিহীন যানের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে চালক ও পথচারীদের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
——————————————————————————————————–
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তার নির্মাণত্রুটি এবং চালকদের মোবাইল ফোন আসক্তির মতো কারণগুলো পুরোনো হলেও প্রতিকার নেই। পুরোনো ও লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন অবাধে রাজত্ব করছে মহাসড়কে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সিসিটিভি বা অটোমেটেড ফাইন সিস্টেম এখনো সীমাবদ্ধ কাগজে-কলমে।
——————————————————————————————————–
তারা মনে করেন, এই মৃত্যুমিছিল থামাতে হলে তিনটি পদক্ষেপ অনিবার্য প্রথমত, চালকদের শতভাগ পেশাদার প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, সড়কে আইন প্রয়োগে ‘ জিরো টলারেন্স ’ নীতি গ্রহণ করা এবং তৃতীয়ত, স্কুল পর্যায় থেকেই সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা। অন্যথায়, ‘ একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না ’ এই প্রবাদটি মানুষের চেতনাকে কখনোই স্পর্শ করতে পারবে না।
১২ বছরের পরিসংখ্যান
চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি মাসে দেশে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৪৬ জন নিহত ও ১ হাজার ২০৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ৪৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪৭ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৮১ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৩ নারী ও ৪১ শিশু রয়েছে। মার্চ মাসে সারা দেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬১২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে ১ হাজার ২৪৬ জন আহত হয়েছেন।
১২ বছরের পরিসংখ্যান : বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ১৫৭৬ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬০৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৬৩১ জন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।
২০২৪ সালে ৬ হাজার ৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫৪৩ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৬০৮ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত এবং ১০ হাজার ৩৭২ জন আহত হয়েছেন।
২০২২ সালে ৬ হাজার ৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত ও ১২ হাজার ৩৫৬ জন আহত হন। ২০২১ সালে ৫ হাজার ৬২৯টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮০৯ জন নিহত ও ৯ হাজার ৩৯ জন আহত, ২০২০ সালে ৪ হাজার ৮৯১টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জন নিহত ও ৮ হাজার ৬০০ জন আহত হন।
২০১৯ সালে ৫ হাজার ৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮৫৫ জন নিহত ও ১৩ হাজার ৩৩০ জন আহত এবং ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২২১ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৪৬৬ জন আহত হয়েছেন।
২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হন। ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছেন।
২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৮১টি দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত ও ২১ হাজার ৮৫৫ জন আহত এবং ২০১৪ সালে ৫ হাজার ৯২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫৮৯ জন নিহত ও ১৭ হাজার ৫২৪ জন আহত হন।
Leave a Reply