সরকারি সুযোগ-সুবিধায় প্রায় ৯৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই শহরে

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ৩ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ৭ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম, বয়স ২২ বছর। বর্তমানে ঢাকায় একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন। আর্থিক সংকটের কারণে পেরোতে পারেননি অষ্টম শ্রেণীর গণ্ডি।

আরিফুল ইসলাম জানান, তার ২০১৮ সালে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু টাকার অভাবে করতে পারেননি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন। দরিদ্র বাবা জানিয়ে দেন, তার পক্ষে পড়ালেখার খরচ জোগানো সম্ভব নয়। এতে অভিমান করে আরিফুল কাউকে না জানিয়েই ঢাকায় চলে আসেন। আর্থিক সংকটের কারণে তার ভাইও ষষ্ঠ শ্রেণীর পর পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়।

শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক স্তরে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, নিম্ন মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করার হার প্রায় ৭১ শতাংশ। উচ্চ ব্যয় ও গ্রামীণ এলাকায় পর্যাপ্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাবই মূলত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

———————————————-

মাধ্যমিক শিক্ষা

———————————————-

আরিফুল ইসলাম জানান, যখন তিনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন তাদের উপজেলায় কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল না। বর্তমানে একটি সরকারি বিদ্যালয় হলেও সেখানে যাতায়াত করা তাদের ইউনিয়ন থেকে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। ফলে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পক্ষে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারাই কেবল উপজেলা সদরে থেকে সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে পারেন।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক স্তরে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ জন। তাদের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪২ জন। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর ৬৮ দশমিক ১৩ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের। অথচ সরকারি সুযোগ-সুবিধায় গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে পিছিয়ে।

————————————————————————————————————

ব্যানবেইসের সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৯৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৫৩টি গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত, যা মোট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বাকি ৯২ দশমিক ৬৩ শতাংশই শহরাঞ্চলে অবস্থিত।

————————————————————————————————————

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, আমাদের দেশে শিক্ষায় আর্থিক বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট মাধ্যমিক স্তরে। এর বড় কারণ এ স্তরের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি। বিশেষত গ্রামাঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওরাঞ্চল এক্ষেত্রে সবচেয়ে অবহেলিত। সরকার এমপিওভুক্তির মাধ্যমে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করলেও সেটি একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।

মাধ্যমিক শিক্ষায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে এলাকাভিত্তিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন এ শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশকে জাতীয়করণ একটি সমাধান হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ যেসব স্কুলকে জাতীয়করণ করা হবে সেগুলোর শিক্ষকদের যোগ্যতা নিশ্চিত করা।

প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত চালুর অনুমোদন দেয়া হয়। সে সময় দেশের মোট ৭২৯টি বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ কার্যক্রম ৬০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু ছিল, যার মধ্যে ৪৭৭টিই ছিল গ্রামাঞ্চলে।

তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছরের ১২ মার্চ এসব আপগ্রেডেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে গ্রামাঞ্চলে সরকারি অর্থায়নে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ আরো সীমিত হয়ে পড়েছে।

————————————————————————————————————

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাধ্যমিক শিক্ষাকে ধাপে ধাপে জাতীয়করণের দাবি জানানো হলেও বাস্তবে সে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং এমপিওভুক্তির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে হয়েছে।

————————————————————————————————————

তিনি অভিযোগ করেন, নির্ধারিত নীতিমালা বা প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা না করেই অনেক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এতে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল লাভবান হলেও শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন হয়নি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। একই সঙ্গে এমপিওভুক্তির আড়ালে গ্রামাঞ্চলে সরকারি বিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়টিও উপেক্ষিত হয়েছে। আপগ্রেডেড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রামীণ এলাকায় মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ আরো সংকুচিত করেছে।

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন রাশেদা কে চৌধুরী। তার মতে, একসঙ্গে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে—প্রথমে অষ্টম, তারপর দশম এবং শেষে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। অন্তত অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে অনেক বাধা দূর হবে।

এদিকে ২২ এপ্রিল গণসাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও ধাপে ধাপে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করে তা অবৈতনিক করার পরিকল্পনার কথা জানান। তবে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা মনে করেন, এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে নেয়া হয়। তবে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের উপায় খোঁজা হচ্ছে। সরকার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!