এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি, আমদানি হবে ভরসা

  • আপডেট সময় রবিবার, ৩ মে, ২০২৬
  • ৮ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ০৩ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি চাষযোগ্যতা হারাচ্ছে। অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, শিল্পকারখানা নির্মাণ, বন উজাড়, পরিবেশদূষণ এবং ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি নির্বিচারে কেটে নেয়ায় কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ক্রমেই চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চাল সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার এবং ভার্টিক্যাল চাষ পদ্ধতির ব্যবহার খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি গবেষণার ফলাফল কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারলে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষিজমি সংরক্ষণ দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যদিও ফসলি জমি হ্রাসের প্রবণতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির এবং কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প দেখছেন না কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

————————————————————————————————————

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষিব্যবস্থা ও খাদ্য নিরাপত্তার বর্তমান চিত্র ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। বর্তমান পরিস্থিতিতেও কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

————————————————————————————————————

কৃষি ভূমি সুরক্ষা আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, দেশের তিন ফসলি জমিতে বাড়িঘর, ভবন বা কোনো ধরনের প্রকল্প নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কৃষিজমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত আবাসন বা রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকেও বিরত থাকার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি দুই ফসলি জমিও শিল্প বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া রোধ, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন নিষিদ্ধ এবং অনুমতি ছাড়া কৃষিজমি ভরাট বা অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধ রাখার বিষয়েও পরিষ্কার নির্দেশনা আছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এসব আইন ও নীতি কাগজেই সীমাবদ্ধ। মাঠ পর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত। ফলে কৃষিজমি সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে আবাদি জমির চাষযোগ্যতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে চাষযোগ্য জমির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কৃষি খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

অন্যদিকে, কোথায় আবাসন বা শিল্পকারখানা স্থাপন করা যাবে-এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ও নগর পরিকল্পনায় নীতিমালা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। ফলে নির্বিচারে ফসলি জমিতে বসতি, নগরায়ণ ও শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা অব্যাহত রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে।

————————————————————————————————————

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমছে। ২০২১ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ দশমিক ১১ মিলিয়ন হেক্টর, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন হেক্টরে। জমির এই হ্রাস সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। গত পাঁচ বছরে আবাদি জমি প্রায় ২ শতাংশ কমে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির হার স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে।

————————————————————————————————————

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো হলেও বাস্তবায়নে রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। কৃষিজমির যথেচ্ছ ব্যবহার, দুর্বল নজরদারি এবং নীতিমালার অকার্যকর প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সূত্র : অন্য দৈনিক।।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহাম্মদ বলেন, কৃষির উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে মন্ত্রণালয় নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি কৃষিজমিতে স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়েছে এবং স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে কৃষিজমি নষ্ট করা যাবে না ; এটি কৃষির জন্যই সংরক্ষিত থাকবে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশের কৃষিকে আরও আধুনিকায়ন করা হবে। ভার্টিক্যাল চাষ পদ্ধতি- যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরের ভেতরে বা বদ্ধ স্থানে মাটি ছাড়া উল্লম্বভাবে ফসল উৎপাদন করা হয়- খাদ্য ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি উচ্চফলনশীল ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. পরিমল কান্তি বিশ্বাস রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশের চাষযোগ্য জমি কমলেও তা এখনো চরম সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেনি। কিছু ক্ষেত্রে জমি সামান্য বাড়ছেও, তবে সেই বৃদ্ধির হার খুবই কম।

তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক দশকে দেশের ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাধীনতার সময় প্রায় ৭ কোটি মানুষের দেশে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন ধানের ঘাটতি ছিল। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটিতে পৌঁছালেও উৎপাদন বেড়েছে এবং ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, খাদ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে দেশে কৃষি গবেষণার যে ফলাফল রয়েছে, তা এখনো কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এসব প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া গেলে ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কৃষকের মুনাফা বাড়লে কৃষিজমির প্রতি আগ্রহও বাড়বে। ড. পরিমল কান্তি সতর্ক করে বলেন, ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে মাটি ছাড়া বিকল্প প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদন সম্ভব সেদিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

————————————————————————————————————

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোও দ্রুত শিল্পায়নের পথে হাঁটছে, কিন্তু তারা ‘ল্যান্ড জোনিং’ বা ভূমি বিন্যাস আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের উর্বর ভূমি রক্ষা করছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম সীমিত জমিতেও উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহারের মাধ্যমে ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

————————————————————————————————————

অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ ভারত তাদের কৃষিজমি রক্ষায় আধুনিক সেচব্যবস্থা ও সরকারি ভর্তুকির পাশাপাশি বড় আকারের যান্ত্রিকীকরণে জোর দিচ্ছে। চীনের মতো জনবহুল দেশগুলো তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নিজস্ব প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটিয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও চাষাবাদ অব্যাহত রাখছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রযুক্তির দ্রুত প্রয়োগ ছাড়া ভবিষ্যৎ ‘খাদ্যযুদ্ধে’ টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের লাগাম টেনে ধরার ওপর জোর দেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিমত, কৃষিজমি রক্ষা করে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। যে জমি দেশের মানুষের খাদ্য জোগায়, সেই জমি যে কোনো মূল্যে সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে আপাতদৃষ্টিতে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে হলেও যেভাবে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!