মুফতি ওমর বিন নাছির|| ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ||
মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো আত্মসম্মানবোধ এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জনের মানসিকতা। একজন মানুষ যখন নিজের শ্রম, মেধা ও ঘামের বিনিময়ে উপার্জন করে, তখন সে শুধু নিজের প্রয়োজনই পূরণ করে না—বরং তার আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা এবং আল্লাহর প্রতি তার আস্থাও দৃঢ় হয়।
অন্যদিকে, অযথা ভিক্ষাবৃত্তি মানুষের ব্যক্তিত্বকে ক্ষুণ্ন করে এবং তাকে পরনির্ভরশীল করে তোলে। তাই ইসলাম সব সময় মানুষকে নিজ হাতে উপার্জনের জন্য উৎসাহিত করে। তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ সালাত আদায়ের পর তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। ’ (সুরা : জুমআ, আয়াত : ১০)
ইবাদতের পাশাপাশি জীবিকার সন্ধান করাও মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, দ্বীনের সঙ্গে দুনিয়ার কাজের সমন্বয় করেই একজন মুসলিমের পূর্ণাঙ্গ জীবন গঠিত হয়। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন হাদিসে মহানবী (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিজ হাতে উপার্জনের মর্যাদা তুলে ধরেছেন।
—————————————————————————————————————
আবু আবদুল্লাহ জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘ মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি নিজের রশি নিয়ে পাহাড়ে গিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে এনে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে, তবে তা ভিক্ষা করার চেয়ে অনেক উত্তম। এতে আল্লাহ তাআলা তাকে অপমান থেকে রক্ষা করেন ; সে কিছু পাক বা না পাক (ভিক্ষা করা কখনোই উত্তম নয়)। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৪৭১)
—————————————————————————————————————
অনুরূপভাবে, আবু হুরায়রা (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘ তোমাদের কেউ কাঠ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা ভিক্ষার চেয়ে উত্তম-যদিও ভিক্ষা চাইলে তাকে কিছু দেয়া হোক বা না হোক। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৪০০)
সাধারণ মানুষ নয়, আল্লাহর নবীরাও নিজের হাতে উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে তা থেকে আহার করতেন। অন্য কারো উপার্জন তিনি খেতেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২০৭৩)
এমনকি আবু হুরায়রা (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ জাকারিয়া (আ.) ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১০২৯৪)
এ উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, নিজ হাতে উপার্জন করা শুধু বৈধই নয়, বরং অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ। মিকদাম ইবনু মাদিকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম কোনো খাদ্য নেই। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২০৭২)
নিজ হাতে উপার্জনই মানুষের জন্য সর্বোত্তম ও বরকতময় জীবিকা। তবে ইসলাম সম্পূর্ণরূপে ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ করেনি। কেউ যদি প্রকৃতপক্ষে অসহায় ও অক্ষম হয়, তাহলে তার জন্য ভিক্ষা করার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা বা অভ্যাসে পরিণত করা সম্পূর্ণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মহানবী (সা.) সবসময় মানুষকে কর্মমুখী হতে এবং নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব নিজেই বহন করতে উৎসাহিত করেছেন।
—————————————————————————————————————
এছাড়া সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, ‘ মহানবী (সা.) আমাকে কিছু দান করলে আমি বলতাম, আমার চেয়ে বেশি অভাবীকে আপনি দান করুন। তো, একবার মহানবী (সা.) আমাকে বললেন, তুমি এটা গ্রহণ করো। তোমার কাছে যখন কোনো সম্পদ আসে, আর তাতে যদি তোমার কোনো কাকুতি-মিনতি ও লোভ না থাকে, তাহলে সেসব মাল গ্রহণ করে তা তোমার অন্য মালের সাথে মিলিয়ে চাইলে আহার করতে পারো, আর চাইলে তুমি সেখান থেকে সাদাকাহ করতে পারো, বা অন্য কিছু করতে পারো। আর ধন-সম্পদের মধ্যে তোমার অন্তরকে ডুবিয়ে রেখো না।
—————————————————————————————————————
সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, এ কারণেই (আমার বাবা) আবদুল্লাহ কারও কাছে কিছু চাইতেন না এবং তাঁকে কেউ কিছু দিতে চাইলে তিনি নিষেধও করতেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৪৭৩)
অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে নিজ হাতে উপার্জন করা শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ইবাদত। এটি মানুষের আত্মসম্মান রক্ষা করে, তাকে স্বাবলম্বী করে তোলে এবং সমাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, অপ্রয়োজনীয় ভিক্ষাবৃত্তি মানুষকে দুর্বল ও পরনির্ভরশীল করে তোলে।
তাই প্রত্যেকের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করা এবং আত্মসম্মান বজায় রেখে জীবন পরিচালনা করা। তবেই ব্যক্তি ও সমাজ-উভয়ের উন্নতি সম্ভব হবে।
Leave a Reply