ঢাকার আচার কক্সবাজারে হয়ে যায় বার্মিজ !

  • আপডেট সময় বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ১৯ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

কক্সবাজার ভ্রমণ শেষে ঢাকায় ফেরার আগে ছোট বোনের জন্য ব্যাগভর্তি ‘বার্মিজ আচার’ কিনেছেন আজিমপুরের বাসিন্দা ফাহিম শাহরিয়ার। বন্ধুদের সঙ্গে গত ১৪ মে বেড়াতে এসে সুগন্ধা সৈকত এলাকার একটি দোকান থেকে নানা স্বাদের আচার সংগ্রহ করেন তিনি। বাড়ি ফিরে বোনের হাতে তুলে দেবেন কক্সবাজারের বহুল পরিচিত সেই ‘বার্মিজ আচার’, এমন পরিকল্পনা তার।

তবে ফাহিম জানেন না, তিনি যে আচার কিনেছেন তার অধিকাংশই আসলে মিয়ানমার বা বার্মিজ নয়। সেগুলোর তৈরি হয়েছে ঢাকার কিংবা কক্সবাজারের কোনো কারখানায়।

কক্সবাজারের সুগন্ধা, লাবণী, কলাতলী সৈকত ও শহরের বার্মিজ মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, দোকানজুড়ে সাজানো রয়েছে অসংখ্য ব্র্যান্ডের আচার। কোথাও আম, জলপাই, বরই কিংবা তেঁতুলের আচার, কোথাও মরিচের আচার, শুকনা মাছের মিশ্রণ, চিংড়ি পেস্ট কিংবা মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘লাপেট’। অধিকাংশ পণ্যের মোড়কে বার্মিজ ভাষা, ইংরেজিতে ‘মেইড ইন মিয়ানমার’ লেখা কিংবা মিয়ানমারের ঠিকানাও ছাপানো রয়েছে। এসব দেখে পর্যটকরা সহজেই পণ্যগুলোকে ‘অরিজিনাল বার্মিজ’ বলে বিশ্বাস করছেন।

কিন্তু বাস্তবচিত্র বলছে অন্য কথা। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রায় অচল। রাখাইনে সংঘাত, সীমান্তে নিরাপত্তা সংকট এবং টেকনাফ স্থলবন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় বৈধভাবে মিয়ানমার থেকে আচার আমদানির সুযোগ কার্যত বন্ধ। বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ ‘বার্মিজ আচার’ স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত।

সুগন্ধা সৈকত এলাকার ব্যবসায়ী শফিউল আলম বলেছেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে বৈধভাবে মিয়ানমার থেকে আচার আসে না। পর্যটকদের চাহিদা আছে বলেই স্থানীয়ভাবে তৈরি আচার বিক্রি করছি। সামান্য কিছু পণ্য চোরাই পথে আসে, কিন্তু সেগুলোর দাম বেশি।

তিনি জানিয়েছেন, সৈকত এলাকার দোকানিরা মূলত শহরের বার্মিজ মার্কেট থেকে পাইকারি দরে আচার সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো পর্যটকদের কাছে ‘বার্মিজ আচার’ হিসেবেই বিক্রি করা হয়।

শহরের চৌধুরী বার্মিজ মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, কক্সবাজারে বিক্রি হওয়া আচারের প্রায় ৫০ শতাংশ আসে ঢাকার মিরপুর ও কেরানীগঞ্জের কারখানা থেকে। ‘হাইকো’, ‘মারমেইড’ ও ‘নাম্বার ওয়ান’ নামে বিভিন্ন ব্র্যান্ডে এসব আচার উৎপাদন করা হয়। এছাড়া প্রায় ৩০ শতাংশ আচার তৈরি হয় কক্সবাজার শহরের লাইট হাউস ও লারপাড়া এলাকায়। বাকি অল্প কিছু পণ্য চোরাই পথে মিয়ানমার থেকে আসে।

—————————————————————————————————————-

দোকানিদের দাবি, কক্সবাজারে এসে বার্মিজ আচার কেনা এখন অনেক পর্যটকের কাছে এক ধরনের ভ্রমণ সংস্কৃতি বা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটকরা সৈকত ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার সময় এসব আচার কিনে নিয়ে যান।

—————————————————————————————————————-

বার্মিজ মার্কেটের দোকানি শাহাবুদ্দিনের মতে, অনেকে মনে করেন- কক্সবাজার এসে বার্মিজ আচার না কিনলে ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা জানিয়েছেন, কক্সবাজারের প্রায় ৪ শতাধিক দোকানে মাসে অন্তত দুই কোটি টাকার আচার বিক্রি হয়। দীর্ঘদিনের পরিচিতির কারণে পর্যটকরা এখনও এখানে এসে বার্মিজ আচার খোঁজেন। বৈধভাবে মিয়ানমার থেকে পণ্য না এলেও বাজারে বার্মিজ পণ্যের নামে ব্যবসা চলছেই। এতে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন।

স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক আচারের প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের সময় কিংবা উপাদানের তালিকাও উল্লেখ থাকে না। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যায়।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিৎসক অসীম সূত্রধরের মতে, অননুমোদিত খাদ্যপণ্য দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ এসব পণ্যের উৎপাদন পরিবেশ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ব্যবহৃত উপাদান যাচাই করা সম্ভব হয় না।

এদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাসান আল মারুফ জানিয়েছেন, বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ আচারই স্থানীয়ভাবে তৈরি। বার্মিজ মোড়ক ব্যবহার করে সেগুলো বাজারজাত করা হচ্ছে।

সম্প্রতি সীমিত পরিসরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য আবার চালু হওয়ার তথ্য দিয়েছেন টেকনাফ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইজাজুল হক। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে বৈধভাবে আচার আমদানি সম্ভব।

সুত্র : অন্য দৈনিক।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!