ইতিহাসের সর্বোচ্চ খাদ্যশস্য মজুদ : পেছনে তিনটি কারণ

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩০ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ২১ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

খাদ্য নিরাপত্তায় মাইলফলক ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। সরকারি খাদ্যগুদাম এবং সাইলোতে ধান, চাল ও গম মিলিয়ে মোট খাদ্যশস্যের মজুদ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৩ লাখ টনে। যার মধ্যে সাড়ে ২০ লাখ টনই চাল। বাকিটা গম। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড মজুদ।

এই রেকর্ডের পেছনে ওঠে এলো তিনটি কারণ। সেগুলো হলো, আমন ও বোরো ধানের বাম্পার ফলন। সেই সঙ্গে ধান ভালো দামে কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ অভিযান সফল হওয়া এবং গুদামের মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধি।

নিজেদের গুদামে সাড়ে ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য থাকলে সেটিকে ‘নিরাপদ মজুদ’ সূচক হিসেবে ধরে নেয় খাদ্য বিভাগ। এই নিরাপদ মজুদের মধ্যে সাধারণত ১০ লাখ টন চাল এবং সাড়ে তিন লাখ টন গম। দেশে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে খাদ্যের যাতে সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী (ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা) গড়ে তোলা হয়। এর আওতায় কমপক্ষে তিন মাসের খাদ্য মজুদ রাখতে হয়। সেই নিরাপদ সূচকের চেয়ে এখনকার মজুদ ১০ লাখ টন বেশি।

এই বিপুল মজুদ বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে শক্তিশালী অবস্থানে নিচ্ছে। অন্যদিকে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায়ও আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।

——————————————————————————————————————

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বললেন, এখনকার মজুদ খাদ্য বিভাগের সর্বকালের রেকর্ড। গত মৌসুমে আমন সংগ্রহ হয়েছিল ১২ লাখ টন। বিদেশ থেকে আমদানি হয়েছে ৫ লাখ টন। এখন চলছে বোরো সংগ্রহ। বোরোর ১৮ লাখ টন সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাড়ে ১৩ লাখ টন জমা পড়েছে গুদামে। ধান কেনার সংগ্রহ মূল্য যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, অনুকূল আবহাওয়ায় দেশে খাদ্যশস্যের বাম্পার ফলন এবং আমদানি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খাদ্যশস্য গুদামে পৌঁছানোর কারণেই এই রেকর্ড।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, গত আমন সংগ্রহ অভিযান সফলতার জন্য যৌক্তিক দামে কৃষকদের কাছ থেকে কেনাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ধান ও চালকল মালিকদের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক চাল সংগ্রহও এই মজুদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

——————————————————————————————————————

ধানের বাম্পার ফলন, গুদামগুলো চাল-গমে ঠাসা থাকলেও খোলাবাজারে কিন্তু চালের দামে স্থিতিশীলতা নেই। মোটা থেকে চিকন— সব ধরনের চালের দামই চড়া। কিন্তু সাড়ে ২৩ লাখ টন রেকর্ড মজুদের সিংহভাগ আপৎকালীন বা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির জন্য সংরক্ষিত। ফলে সরকারি গুদাম উপচে পড়লেও খোলাবাজারে চালের জোগান বা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি মিলার ও বড় করপোরেট গ্রুপগুলো।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত জুন মাস জুড়ে দেশের বাজারে চালের দাম কেজিতে গড়ে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটা চালের কেজি ৪৮ থেকে ৫২ টাকার মধ্যে ছিল। জুন মাসের শেষে বেড়ে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মাঝারি মানের চাল জুনে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৫২ থেকে ৬৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই মাসে সরু চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে মানভেদে ৬৫ থেকে ৭৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খবর : অন্য দৈনিক।

——————————————————————————————————————

পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বললেন, উৎপাদন ভালো। আমদানিও হচ্ছে না। তাহলে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। কোনো কারণ ছাড়াই বাড়ছে চালের দাম। নিয়ন্ত্রণ তদারকি কিছু আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

——————————————————————————————————————

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গত ১০ বছরে দেশের খাদ্যগুদাম ও সাইলোর ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে আধুনিক স্টিল সাইলো এবং নতুন এলএসডি (লোকাল সাপ্লাই ডিপো) নির্মাণের পর দেশে সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা সাড়ে ২২ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। সাড়ে ২৩ লাখ টনের বর্তমান মজুদের কারণে দেশের সরকারি গুদামগুলো এখন প্রায় খাদ্যশস্যে ভর্তি।

সরকারের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে এই ধারণক্ষমতা ৩৭ লাখ টনে নিয়ে যাওয়া। ধারণক্ষমতার বেশি মজুদ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, সাড়ে ২২ লাখ টন হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড। চাল রাখার খামাল (খোপ) বাড়িয়ে সেখানে সর্বোচ্চ সাড়ে ২৩ লাখ টন পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখার রেকর্ড ছিল। মজুদ রেকর্ড ছোঁয়ায় সরকারকে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে না। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে।

বন্যার পানিতে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের দু-একটি নিচু এলাকায় অবস্থিত লোকাল সাপ্লাই ডিপো বা সরকারি গুদাম চত্বরে পানি উঠলেও মূল গুদামের ভেতরে পানি প্রবেশ করেনি। খাদ্য অধিদপ্তরের আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কারণে কোনো সরকারি গুদামে মজুদকৃত খাদ্যশস্যের বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটোয়ারী। সেদিক থেকে সরকার নির্ভার বলে মনে করেন খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

সরকার খাদ্যগুদামে যে খাদ্যশস্য মজুদ রাখে, তা থেকে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। আবার দেশ জুড়ে বিভিন্ন ছোট উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু রাখে মাঝে মাঝে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাবিখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল মোট ১ লাখ ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য। নির্বাচিত সরকার এবার সেই খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিলে বিপুল মজুদ থেকেই অনায়াসে সামাল দেওয়া যাবে— বলছে খাদ্য বিভাগ।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!