সন্তানকে সময় দেয়াও ইবাদত ?

  • আপডেট সময় বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ পাঠক

মুফতি সাইফুল ইসলাম ।। ১১ জুলাই ২০২৬।।

আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক বাবা-মা সন্তানের জন্য উন্নত শিক্ষা, ভালো পোশাক কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বময় চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো, তার কথা শোনা, মানসিকভাবে পাশে থাকা এবং নৈতিক শিক্ষা দেয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, সেটা তারা উপলব্ধি করেন না। ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার হলো সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আর সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হলো সন্তান। কাজেই কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে সন্তান-সন্ততির জন্য এ দায়িত্ব পালন করলেও তা ইবাদতের মর্যাদা লাভ করবে।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘ হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। ’ (সুরা তাহরীম, আয়াত : ৬)। ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার অন্যতম উপায় হলো তাদের দ্বীনের শিক্ষা দেয়া, সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা। এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে সন্তানের জন্য সময় বের করতে হবে।

——————————————————————————————————

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)। এই দায়িত্ব শুধু ভরণ-পোষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় ; সন্তানের চরিত্র, ইমান, আচরণ ও মানসিক বিকাশের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

রাসুল (সা.) নিজেই ছিলেন এর সর্বোত্তম উদাহরণ। তিনি তাঁর নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে কোলে নিতেন, চুম্বন করতেন এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন। এক ব্যক্তি এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনি বলেন, ‘ যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হবে না। ’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭)। এতে বোঝা যায়, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ও সময় দেয়া সুন্নাহরই অংশ।

——————————————————————————————————

আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)। পরিবারের কাছে উত্তম হওয়ার অর্থ শুধু প্রয়োজন মেটানো নয় ; তাদের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো, শিক্ষা দেয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করাও এর অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। ’ (বুখারি, হাদিস: ১)। তাই কোনো বাবা-মা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সন্তানকে সময় দেন, তাকে কোরআন শিক্ষা দেন, নামাজে উৎসাহিত করেন, উত্তম চরিত্র গঠনে সহায়তা করেন কিংবা তার সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তাহলে এসব কাজও ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

আধুনিক গবেষণাও এ সত্যের সমর্থন দেয়। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত মানসম্মত সময় কাটানো শিশুর আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্থিতি ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশু মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির (John Bowlby) থিওরিতেও দেখানো হয়েছে, বাবা-মায়ের সান্নিধ্য শিশুর সুস্থ ব্যক্তিত্ব বিকাশের অন্যতম ভিত্তি।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারে একই ঘরে থেকেও বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। অথচ প্রতিদিন কিছু সময় একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, কোরআন তিলাওয়াত শোনা, নামাজ আদায় করা কিংবা সন্তানের দিনের অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শোনা তার চরিত্র ও আত্মবিশ্বাস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।

সন্তান আল্লাহর দেয়া আমানত। তাই তাদের জন্য সময় বের করা কোনো অতিরিক্ত কাজ নয় ; এটি একজন মুসলিম অভিভাবকের দায়িত্ব। আর এ দায়িত্ব যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পালন করা হয়, তখন তা শুধু পারিবারিক কর্তব্যই নয়, বরং ইবাদতেও পরিণত হয়। কারণ একজন সৎ, নৈতিক ও আদর্শবান সন্তান গড়ে তোলাই ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক।।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!