ইফতেখারুল হক হাসনাইন। । ২০ জুন, ২০২৬। ।
সন্তানের লালনপালনে নানা ত্যাগ ও কষ্ট-তিতিক্ষা থাকা সত্ত্বেও পিতৃত্ব আল্লাহর এক অনন্য অনুগ্রহ ও উপহার। তাই তো পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নেককার বান্দাদের অন্যতম দোয়া হলো, ‘ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো। ’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭৪)
নিচে পবিত্র কোরআনের আলোকে পিতৃত্বের স্বরূপ, এর বৈশিষ্ট্য এবং একজন আদর্শ পিতার কোরআনি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো :
পিতৃত্বের ধারণা ও ভাষাগত ব্যবহার
১. শাব্দিক অর্থ : ‘পিতা’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘আল-আব’। আরবি ভাষায় শব্দটির মূল উৎস মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়
এক. কোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত হওয়া বা সংকল্প করা,
দুই. স্বদেশের প্রতি টান বা ব্যাকুলতা।
লিসানুল আরব অভিধানে বলা হয়েছে, ‘ উবুয়াহ ’ বা পিতৃত্ব শব্দটি ‘ আবা ’ ধাতু থেকে আসতে পারে ; যার অর্থ হলো কোনো কিছু গ্রহণে অস্বীকৃতি বা আত্মমর্যাদাবোধ।
এই শাব্দিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় ইসলামে বাবার ভূমিকার মধ্যে দুটি দিক রয়েছে ; সন্তানকে সামাজিক ও আদর্শিক যত্নে গড়ে তোলার জন্য সদা প্রস্তুত থাকা ও সংকল্পবদ্ধ হওয়া।
সন্তানকে সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আগলে রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সন্তানের সুরক্ষায় মা-বাবার মধ্যে দায়িত্বের যে বণ্টন, সেখানেও একধরনের কঠোরতা ও ত্যাগের মানসিকতা জড়িয়ে থাকে।
যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টের সঙ্গেই তাকে প্রসব করেছে। ’ (সুরা আহকাফ, আয়াত : ১৫)
২. পারিভাষিক অর্থ : পারিভাষিক অর্থে আল-কাফাওয়ী বলেন, পিতা হলেন এমন একজন মানুষ, যার বীর্য থেকে অন্য একজন মানুষের জন্ম হয়। আর আল-মুনাউয়ীর মতে, পিতা হলেন এমন সত্তা, যিনি কোনো কিছুর অস্তিত্ব, সংশোধন বা প্রকাশের মাধ্যম বা কারণ হন।
আরবি ভাষায় পিতার অর্থ বোঝানোর জন্য আরেকটি শব্দ রয়েছে—‘ আল-ওয়ালিদ ’। ভাষাবিদদের মতে, ‘ আব ’ শব্দটি ‘ ওয়ালিদ ’ শব্দের চেয়ে ব্যাপক।
‘ আল-আব ’ শব্দটি সন্তানের নিজের বাবা, দাদা এবং চাচা সবার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু ‘ ওয়ালিদ ’ বলতে স্রেফ সন্তানের আপন জন্মদাতা পিতাকেই বোঝায় ; আর ‘ওয়ালিদাইন’ বলতে বোঝায় আপন মাতা ও পিতাকে।
কোরআনের পরিভাষায় পিতৃত্বের এই বন্ধন শুধু রক্ত বা বংশের সীমা পেরিয়ে আদর্শিক ও ইমানি বন্ধনকেও ধারণ করে। আর এই কারণেই হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে ‘ আবুল আম্বিয়া ’ বা ‘ নবীদের পিতা ’ বলা হয়।
পবিত্র কোরআনে ‘ পিতা ’ শব্দটির বিভিন্ন রূপ—একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন—প্রায় ১১৭ বার এসেছে। যেমন ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা বলেছিল, ‘ তারা বলল : হে আজিজ ! তার এক অত্যন্ত বৃদ্ধ পিতা রয়েছেন, অতএব আমাদের একজনকে তার স্থলে রেখে দিন। ’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৭৮)
আবার ইসমাইল (আ.)-এর কোরবানির ঘটনায় এসেছে, ‘ অবাশে সে যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরার বয়সে পৌঁছাল, তখন ইব্রাহিম বলল, হে বৎস ! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে জবেহ করছি, এখন বলো তোমার রায় কী ? সে বলল, হে পিতা ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। ’ (সুরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২)
কোরআনে ‘আব’ শব্দের ব্যবহার
কোরআনে ‘আব’ শব্দের ৩ ধরনের ব্যবহার দেখা যায়।
১. জন্মদাতা পিতা : ‘ সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই, তার মা এবং তার পিতার কাছ থেকে। ’ (সুরা আবাসা, আয়াত : ৩৪-৩৫)
২. চাচা : যেমন—‘ তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়েছিল ? যখন সে সন্তানদের বলল, আমার পর তোমরা কার ইবাদত করবে ? তারা বলল, আমরা আপনার উপাস্য এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদত করব। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৩৩)। এখানে ইয়াকুব (আ.)-এর চাচা হওয়া সত্ত্বেও ইসমাইল (আ.)-কে ‘পিতৃপুরুষ’ বা পিতা বলা হয়েছে।
৩. দাদা বা পূর্বপুরুষ : যেমন ‘ তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাত বা আদর্শ। ’ (সুরা হজ্জ, আয়াত : ৭৮)
কোরআনের বর্ণনায় ‘পিতা’ শব্দটির সঙ্গে সব সময় সন্তানদের এক গভীর শ্রদ্ধা ও মানসিক আনুগত্য জড়িয়ে থাকে।
যেমন নবী শোআইব (আ.)-এর দুই কন্যার মুখে আমরা শুনি, যখন মুসা (আ.) তাদের অবস্থা জানতে চাইলেন, তারা বলেছিল, ‘ আমরা আমাদের পশুদের পানি পান করাতে পারি না যতক্ষণ না রাখালেরা তাদের পশু নিয়ে চলে যায়, আর আমাদের পিতা একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ। ’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৩)
দুটি ভিন্ন ব্যবহার
কোরআন পিতা-মাতাকে বোঝাতে দুটি ভিন্ন শব্দ চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক আবহে ব্যবহার করেছে :
আল-আবাওয়াইন : এই শব্দে পিতার প্রাধান্য বেশি থাকে। যেখানে পিতার ভূমিকা বা সামাজিক অবস্থান আগে আসে, সেখানে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ‘ এবং সে তার পিতা-মাতাকে আরশে আরোহণ করাল। ’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ১০০)
যেহেতু রাজকীয় বা সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে পিতার অবদানের দিকটি অবধারিতভাবেই সামনে আসে।
আল-ওয়ালিদাইন : এই শব্দে মায়ের ত্যাগ ও কষ্টকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। গর্ভধারণ ও সন্তান লালনপালনে মায়ের যে সীমাহীন কষ্ট, সেটির প্রতি সম্মান জানিয়েই কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ আর পিতা-মাতার (ওয়ালিদাইন) সঙ্গে সদয় আচরণ করো। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)
কোরআন সম্পর্কের গভীরতা ও শক্তি অনুযায়ী বিষয়গুলোকে বিন্যস্ত করে। হাশরের ময়দানে পলায়নের আয়াতে আল্লাহ–তাআলা মায়ের কথা আগে এবং পিতার কথা পরে উল্লেখ করেছেন, ‘ যেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই, তার মা এবং তার পিতা থেকে। ’
মানুষ যার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা বেশি রাখে, তার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার কষ্ট তত তীব্র হয় ; তাই মায়ের পর বাবার থেকে পলায়নের কথা বলা হয়েছে।
Leave a Reply