ঈদের উৎসবে হাসির চেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে অশান্তির আর্তনাদ

  • আপডেট সময় বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ১ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

ঈদুল আজহা মানেই চারদিকে উৎসবের আমেজ, কোরবানির প্রস্তুতি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পুনর্মিলন। কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এর পরিসংখ্যানে। যেখানে উৎসবের হাসির চেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হয়েছে সংঘর্ষ, নির্যাতন, দুর্ঘটনা এবং পারিবারিক অশান্তির আর্তনাদ।

———————————————————————————–

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ পরিসংখ্যান : ৫ দিনে ১০ হাজার ৭৮টি জরুরি কল

————————————————————————————

জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে অর্থাৎ গত ২৬ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ৫ দিনে ৯৯৯ নম্বরে এসেছে মোট ১০ হাজার ৭৮টি জরুরি কল। সংখ্যাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি কল এসেছে মারামারি ও সংঘর্ষ-সংক্রান্ত ১ হাজার ৯৭৪টি। এরপর রয়েছে আটক-সংক্রান্ত ৮৭১টি, অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য ৮০২টি, নারীর প্রতি সহিংসতা-সংক্রান্ত ৬৬৩টি, দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত ৫৮৩টি এবং পারিবারিক সমস্যার ৫৩০টি কল।

পরিসংখ্যান বলছে, উৎসবের বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে সমাজের গভীরে জমে থাকা বহু অসুখ ঈদের সময় আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সহিংসতা এবং জননিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, মোট ঘটনার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই ছিল মারামারি ও সংঘর্ষ-সংক্রান্ত। সংখ্যা প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি।

——————————————————————————————————————

সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা এ প্রসঙ্গে বলেন, ঈদের সময় দীর্ঘদিনের জমিজমা বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা কিংবা সামাজিক বিরোধ নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। কর্মস্থলের কারণে সারা বছর দূরে থাকা মানুষ যখন ঈদে বাড়ি ফেরেন। তখন অনেক পুরোনো বিরোধ আবার সামনে চলে আসে। কোথাও কোরবানির স্থান নিয়ে বিরোধ, কোথাও বাজার বা হাটের আধিপত্য, আবার কোথাও সামাজিক নেতৃত্বের প্রশ্নে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফলে আনন্দের ঈদ অনেক ক্ষেত্রেই রূপ নেয় উত্তেজনা আর সহিংসতায়।

——————————————————————————————————————

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে থানাগুলোতে মারামারি ও সংঘর্ষ-সংক্রান্ত অভিযোগের চাপ অনেকটা বেড়ে যায়। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, সামাজিক সহনশীলতারও সংকট’।

৯৯৯-এর পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলোÑ নারীর প্রতি সহিংসতা-সংক্রান্ত ৬৬৩টি কল। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদে পরিবার একত্র হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক নারী এই সময়েই নির্যাতনের শিকার হন। দাম্পত্য কলহ, যৌতুকের চাপ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, আর্থিক টানাপোড়েন এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে উৎসবের সময়ও নারীরা নিরাপদ নন।

ঈদের ছুটিতে পারিবারিক সমস্যা-সংক্রান্ত ৫৩০টি কল এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় ঈদকে বলা হতো সম্পর্ক জোড়া লাগানোর উৎসব। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে উঠছে সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময়।

অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, উৎসবকেন্দ্রিক সহিংসতা সাধারণত নি¤œ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পর্যায়ের পরিবারগুলোতে বেশি ঘটে থাকে। এসব পরিবারে একজনের আয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন অনেকে। পরিবারগুলোতে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থাকে। চাহিদার সঙ্গে অর্থনৈতিক জোগানের মিল না থাকায় উৎসবের দিনগুলো অনেক সময় বিষাদে পরিণত হয়। এ ছাড়া ঈদের ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ৯৯৯-এ আসা এই বিপুলসংখ্যক কল প্রমাণ করে, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ পাড়ি দেয়া বাকি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক চাপ, উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, দাম্পত্য কলহ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে। দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ একসঙ্গে থাকার পরিবেশে বিস্ফোরিত হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতারও একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, উৎসবের সময় অর্থনৈতিকসহ পারিপাশির্^ক নানা বিষয় মানুষের মানসিক চাপ বাড়ায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে উৎসবের সময় সবাই একত্র হন। কাছাকাছি থাকেন। এই সময়ে ইতিবাচক বিভিন্ন প্রেক্ষিতও নেতিবাচকতার দিকে ঠেলে দেয় মানুষকে। তখন পারিবারিক কলহসহ নানা অনাকাক্সিক্ষত অপরাধ সৃষ্টি হয়।

——————————————————————————————————————

ঈদের ছুটিতে ৮০২টি কল এসেছে অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য। জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা এ সংখ্যা থেকেই বোঝা যায়। সড়ক দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, খাদ্যে বিষক্রিয়া, গর্ভবতী নারীর জরুরি অবস্থা কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতায় মানুষ ৯৯৯-এর শরণাপন্ন হন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনো জরুরি চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ৯৯৯-এর সমন্বয় ছাড়া রোগীরা সময়মতো চিকিৎসাসেবা পান না।

——————————————————————————————————————

ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত ৫৮৩টি কল এসেছে ৯৯৯-এ। মূলত, ঈদকে কেন্দ্র করে সড়ক, রেল ও নৌপথে মানুষের চলাচল কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গতি, ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং মহাসড়কে বেপরোয়া চলাচল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। প্রতি বছর ঈদে বহু মানুষ প্রাণ হারান কিংবা আহত হন। ৯৯৯-এর এই পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

ঈদের ছুটিতে ফায়ার সার্ভিস-সংক্রান্ত ৫১২টি কল এসেছে ৯৯৯-এ। অনেক পরিবার ঈদের সময় বাড়িঘর ফাঁকা রেখে আত্মীয়স্বজনের কাছে চলে যান। এ সময় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, গ্যাস লিকেজ কিংবা অসতর্কতার কারণে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে অগ্নিকা-ের ঝুঁকি কমানো কঠিন।

ঈদের ছুটিতে শব্দদূষণ-সংক্রান্ত ৩৬৬ এবং সাধারণ অভিযোগের ৩০৫টি কল এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সামাজিক অসচেতনতারই বহিঃপ্রকাশ। উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো, মোটরসাইকেলের বিকট শব্দ, ডিজে পার্টি কিংবা বেপরোয়া আচরণ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। একটি সভ্য সমাজে যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকার কথা, সেখানে মানুষকে শব্দদূষণ বন্ধে জরুরি নম্বরে ফোন করতে হচ্ছে।

৯৯৯-এর পরিসংখ্যানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আটক-সংক্রান্ত ৮৭১টি কল। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক, গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত তথ্য জানা, পারিবারিক বিরোধে পুলিশি সহায়তা চাওয়া কিংবা আইনগত পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়। এই সংখ্যাটিও সামাজিক অস্থিরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এর পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে ১০ হাজার ৭৮টি কল এসেছে। এসব কলকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছি। তিনি বলেন, এ ছাড়া ৯৯৯-এ এখনো ৫৫ শতাংশ ভুয়া কল আসে। ভুয়া কল রুখতে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এখন দেশের কোটি মানুষের আস্থার জায়গা। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে একই নম্বরে এনে জরুরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে এই সেবা। ঈদের ছুটিতে ১০ হাজারের বেশি কল গ্রহণের ঘটনা প্রমাণ করে, সংকটের মুহূর্তে মানুষ এখনো ৯৯৯-কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহায়তা হিসেবে বিবেচনা করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের ছুটির ১০ হাজার ৭৮টি কল কেবল কয়েকটি সংখ্যা নয় ; এগুলো দেশের সমাজবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে উৎসব, অন্যদিকে সংঘর্ষ। একদিকে পরিবার, অন্যদিকে পারিবারিক ভাঙন। একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে নারী নির্যাতন, দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতা।

বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপদ সমাজ গড়তে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা, সামাজিক সহনশীলতা, নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মান, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বিকাশ। নইলে প্রতি ঈদেই আনন্দের পাশাপাশি ৯৯৯-এর পরিসংখ্যানে ফিরে আসবে সংঘর্ষ, নির্যাতন, দুর্ঘটনা আর সামাজিক অস্থিরতার গল্প।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!