শিরোনাম:
সড়ক দুর্ঘটনার শিকার মানুষ ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না নোয়াখালীর পৌরতে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিতে বারণ করায় গৃহিণীকে ছুরিকাঘাত হত্যা আড়াল করতেও লাশ ফেলা হয় রেললাইনে বছরে ৩০ হাজার মানুষ ডায়রিয়ায় মারা যায় খাল খনন : খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও জলবায়ু-সহনশীলতার পথে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা পেটকাটার পুনঃখনন উদ্বোধনে উপদেষ্টা জবিউল্লাহ ও সংসদ সদস্য শাহজাহান আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে ” তত্ত্বাবধায়ক সরকার ” বহাল সোনাইমুড়ীতে হেযবুত তওহীদের দুই সদস্যকে হত্যার আজো বিচার পায়নি পরিবার পরিচ্ছন্নতায় সমৃদ্ধ থাকলে নিজেকেও সুরক্ষিত রাখা যায় কাশিরামপুরে পুকুর থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

সড়ক দুর্ঘটনার শিকার মানুষ ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬
  • ২ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ৩১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে লাকড়িবোঝাই গাড়ির সংঘর্ষে সাংবাদিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন মারা যান ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দুর্ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণ পায়নি ইমরানের পরিবার। ক্ষতিপূরণ পাবে কি না, সেই বিষয়েও কোনো তথ্য দেয়া হয়নি পরিবারকে।

ইমরানের মা আয়শা বেগম বলেন, ছেলে হারিয়ে তাঁরা এতটাই ভেঙে পড়েন যে স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে। স্বজনদের সহায়তায় তাঁরা চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেন। তিনি কোথায় খোঁজ নেবেন, সেই তথ্য জানা নেই। তাঁর সঙ্গেও কেউ যোগাযোগ করেননি। ফলে ক্ষতিপূরণের আবেদন কোন অবস্থায় আছে, তা তাঁর জানা নেই।

অথচ সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ আইন অনুসারে, আবেদন করার পর ক্ষতিপূরণের অর্থ দুই মাসের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ব্যাংক হিসেবে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সময়মতো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা।

————————————————————————————————————

বিআরটিএর হতাহতের হিসেব বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে যত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এ সময় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে সড়কে হতাহত আরও বেশি।

————————————————————————————————————

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকার ও আহত ব্যক্তিদের অনুকূলে আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। এই তহবিল পরিচালনা করে একটি ট্রাস্টি বোর্ড। এ আইনের বিধিমালা ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। বিধিমালায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, তহবিল সংগ্রহ, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এবং তা বিতরণের পদ্ধতি সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। নিহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে ভুক্তভোগী ব্যক্তির পরিবার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা পাবে। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি পাবেন তিন লাখ টাকা। আহত কারও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকলে আর্থিক সহায়তা তিন লাখ টাকা। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকলে পাবেন এক লাখ টাকা।

সড়ক আইনের বিধিমালা কার্যকরের দিন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আবেদন জমা নেয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর ১৬২ জনকে আর্থিক সহায়তার চেক হস্তান্তরের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেয়া শুরু হয়।

ক্ষতিপূরণ দেয়া শুরুর ছয় মাসের মাথায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে আবেদন করেন বাগেরহাটের বনি আমিন। তাঁর ভাই মো. গোলাম রসুল ওই বছরের ১৯ এপ্রিল দুর্ঘটনায় মারা যান। গোলাম রসুল ছিলেন পেশায় একটি মাদ্রাসার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মারা যাওয়ার দুই দিন পর গোলাম রসুলের স্ত্রী একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন।

বনি আমিন বলেন, তিনি পেশায় গ্রাম পুলিশ। ভাই মারা যাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেন। এরপর নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে হয়ে যাবে, হচ্ছে বলে ঘোরাচ্ছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা। অথচ তাঁর পরে আবেদন করে কেউ কেউ টাকা পেয়েছেন বলে জেনেছেন।

—————————————————————————————————————–

বিআরটিএর হিসেবে ২০২৩ সাল থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার জন। এ সময় আহত হয়েছেন ২০ হাজার ৪৮৩ জন। 

ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন কম

ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত হয় বিআরটিএ কার্যালয় থেকে। ট্রাস্টি বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শুরু থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৬৪১টি চেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ১৯৫ জন নিহতের পরিবার। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন ৩১৬ জন। গুরুতর আহত ব্যক্তি হিসেবে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ১৩০ জন। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে ১১৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

বিআরটিএর হিসেবে ২০২৩ সাল থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার জন। এ সময় আহত হয়েছেন ২০ হাজার ৪৮৩ জন।

বিআরটিএর হতাহতের হিসেব বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে যত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এ সময় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ। অবশ্য বেসরকারি হিসেবে সড়কে হতাহত আরও বেশি।

প্রচারের অভাবে মানুষ ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সাইফুল আলম। তিনি বলেন, তহবিলে টাকা আছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এর প্রচার করা দরকার, এমনকি আবেদনটি যাতে সরকারি উদ্যোগে নেয়া হয়, সেটিও করা যায়।

হয়রানি, প্রক্রিয়াগত জটিলতা

ক্ষতিপূরণের আবেদন করার পর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও টাকা পায়নি টাঙ্গাইলের সিরাজ মিয়ার পরিবার। মুদিদোকানি সিরাজ মিয়া ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর অটোরিকশা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

সিরাজ মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করার পর তাঁর ফোন নম্বর রেখে দেয়া হয়। বিআরটিএর লোক বলে পরিচয় দিয়ে একজন কয়েক মাস আগে ফোন দিয়ে জানান, এক লাখ টাকা ঘুষ দিলে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। আনোয়ার বলেন, তাঁদের টাকা দেয়ার ক্ষমতা নেই। তাই আর যোগাযোগ করেননি।

গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, সিরাজ মিয়ার পক্ষে নির্ধারিত সময়ের ১২ দিন পর আবেদন করা হয়। এরপরও তাঁদের কার্যালয় ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুপারিশ করে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন বাকি দায়িত্ব ট্রাস্টি বোর্ডের। গাজীপুর কার্যালয়ের কোনো কাজ আর নেই।

——————————————————————————————————-

ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে গড়িমসি কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়
অধ্যাপক সামছুল হক, পরিচালক, সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বুয়েট

——————————————————————————————————-

শুরুতে বিধিমালায় আর্থিক সহায়তা পেতে নির্ধারিত ফরমে দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করার কথা বলা হয়। এত স্বল্প সময়ের কারণে অধিকাংশ ব্যক্তিই আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে। তবে গত বছর জানুয়ারির পরে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে। আগেরগুলো এর আওতায় পড়বে না।

আবেদনের পর অনুসন্ধান কমিটি ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনকারীর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নিয়ম। প্রতিবেদন দাখিলের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ড আবেদনকারীর ব্যাংক হিসেবে ‘প্রাপকের হিসাবে প্রদেয়’ চেকের মাধ্যমে টাকা দেবে, অর্থাৎ দুর্ঘটনার দুই মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের কাজ করা হয়। এই দুই দপ্তরে আরও নানা কাজ থাকে। দপ্তরপ্রধানেরাও ব্যস্ত থাকেন। বিআরটিএ কর্মকর্তারাও গড়িমসি করেন। ফলে সময়মতো ক্ষতিপূরণের প্রতিবেদন জমা দেয়া হয় না।

ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তদন্ত করে সুপারিশের জন্য ১৪ সদস্যের স্থায়ী কমিটি রয়েছে। ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমিটির প্রধান। বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালক সদস্যসচিব। পুলিশ, পরিবহনমালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে আছেন।

————————————————————————————————————

ক্ষতিপূরণটা পেলে দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের কিছুটা হলেও উপকার হয়। এ টাকা দিতে গড়িমসি কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা ঠিকভাবে না করতে পারলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
বুয়েট সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক

————————————————————————————————————

তহবিলে টাকা আছে, খরচ কম

ট্রাস্টি বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট পর্যন্ত তহবিলে জমা আছে ২৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সড়ক পরিবহন আইনে ক্ষতিপূরণের জন্য গঠিত তহবিলের টাকা কোন কোন খাত থেকে আসবে, তার বিস্তারিত বলা আছে বিধিমালায়। খাতগুলো হলো সরকারের দেয়া অনুদান, মোটরযানের মালিকের কাছ থেকে তোলা চাঁদা, সড়ক পরিবহন আইনের মাধ্যমে আদায় করা জরিমানার একটি অংশ, মালিক সমিতির অনুদান, শ্রমিক সংগঠন বা শ্রমিক ফেডারেশনের অনুদান, অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে পাওয়া অর্থ। তবে এখন পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহনের মালিকের কাছ থেকেই চাঁদা নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, ক্ষতিপূরণটা পেলে দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের কিছুটা হলেও উপকার হয়। এ টাকা দিতে গড়িমসি কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা ঠিকভাবে না করতে পারলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

সূত্র : অন্য দৈনিক

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!