দিশারী ডেস্ক।। ৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
সারা দেশে নদী থেকে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়ছে। উদ্ধারকৃত বেশির ভাগ লাশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে খুন হয়েছে অন্যখানে, লাশ এনে ফেলা হয়েছে নদীতে। পুলিশ বলছে, হত্যার পর প্রমাণ লোপাট ও আইনের চোখ ফাঁকি দিতেই লাশ ফেলে দেওয়ার জন্য অপরাধীরা নদীকে বেছে নিচ্ছে।
——————————————————————————-
৬০০ লাশের কী পরিচয়।। খুন করে ফেলা হয় নদীতে
——————————————————————————
গত বছর দেশজুড়ে নদী থেকে লাশ উদ্ধার হয় অন্তত ৩০১ নারী-পুরুষ ও শিশুর। ২০২৪ সালে নদী থেকে উদ্ধার হয় অন্তত ৪৪০টি লাশ। গত পাঁচ বছরে দুই হাজারের বেশি লাশ উদ্ধার হয়েছে নদী থেকে। এর মধ্যে ৬০০-এর বেশি লাশের পরিচয় মেলেনি। এসব লাশের বিপরীতে দেড় শর বেশি হত্যা মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছর ২৮ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় একটি মস্তকহীন লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় আঙুলের ছাপ মিলিয়ে লাশের পরিচয় পাওয়া যায়। তার নাম হাবিব (২৭)। তিনি সোনারগাঁ উপজেলার মধ্য কাঁচপুর এলাকার বাসিন্দা। তবে এখনো মাথা পাওয়া যায়নি। পরিচয় জানার পরই মামলাটির তদন্তভার পিবিআই নিয়ে যায়। এ মামলায় অন্তত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তবে গত বছরের ২৩ আগস্ট বুড়িগঙ্গা নদী থেকে অজ্ঞাত নারী ও শিশুর লাশ উদ্ধার হয়।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে জানা যায়, শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ দুটি নদীতে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সদরঘাট নৌ থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। ঘটনার ৬ মাস পার হলেও লাশের পরিচয় মেলেনি। আঙুলের ছাপ মুছে যাওয়ায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে তারা নিহত দুজনের ডিএনএ সংরক্ষণ করে রেখেছে। কেউ লাশ শনাক্ত করতে এলে মিলিয়ে দেখবে। পাশাপাশি বিভিন্ন থানায় নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সঙ্গে ওই নারী ও শিশুর তথ্য মিলিয়ে দেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহাগ রানা বলেন, আমরা এখনো পরিচয় জানতে পারিনি। পরিচয় জানা সম্ভব না হলে তদন্তে অগ্রগতি হয় না। নদী থেকে উদ্ধার লাশ শনাক্ত করতে প্রায়ই পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। সাধারণ গ্রেপ্তার এড়াতে অপরাধীরা লাশ নদীতে ফেলে দেয়।
———————————————————————————————————–
নৌ পুলিশের হেডকোয়ার্টার্সের পুলিশ সুপার (ইন্টেলিজেন্স) মারুফা ইয়াসমিন জানান, ২০২১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত সারা দেশের নদী এলাকা থেকে ২ হাজার ৬৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৪২৫টির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। ৬৩৯টির পরিচয় এখনো জানা যায়নি। শনাক্ত না হওয়া লাশগুলোর বিপরীতে ১৫৪টি হত্যা মামলা হয়েছে।
নৌপুলিশের তথ্যানুসারে, শুধু গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ৩০১ নারী-পুরুষ ও শিশুর লাশ উদ্ধার হয়। ২০২৪ সালে নদী থেকে অন্তত ৪৪০টি লাশ উদ্ধার হয়। এসব লাশ উদ্ধারের পর বিভিন্ন থানায় অন্তত ৪১টি হত্যা মামলা হয়।
———————————————————————————————————–
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পানিতে লাশ ফেলে দিলে তা পচে যায়, প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। কখনো কখনো মাছের কামড় বা জাহাজের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফরেনসিক চিকিৎসকরা বিভ্রান্ত হন। প্রাথমিক তদন্তে হত্যা মনে না হলে লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ সাধারণত অস্বাভাবিক মৃত্যুর (ইউডি) মামলা করে। তদন্তে বা ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে পরে সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট করতে ও আইনের চোখ ফাঁকি দিতে হত্যার পর লাশ ফেলার জন্য নদী ও রেলপথ বেছে নেয়। মূলত সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে এ রকম ঘটে। অপরাধীরা হত্যার আগেই নির্ধারণ করে নদী এলাকার কোথায় লাশ ফেলা হবে।
ঢাকা জেলা নৌপুলিশ সুপার (এসপি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, যখন আমরা পরিচয় শনাক্ত করতে পারি না, তখন আদালতে ঘটনা সত্য কিন্তু পরিচয় এবং ঘটনা জড়িত কাউকে পাওয়া যায়নি জানিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আমরা ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে রাখি। পরবর্তীতে কোনো ক্লু পেলে মামলা পুনর্জীবিত করি।
খবর : অন্য দৈনিক
Leave a Reply