মাইমুনা আক্তার।। ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।
মানুষের জীবনে যেসব জিনিস নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বদনজর। এটি কোনো কুসংস্কার নয়। বাস্তবেই মানুষের কুদৃষ্টি বা বদনজরের কারণে অনেক ধরনের ক্ষতি হয়, তাই নবী-রাসুলরাও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ সে (ইয়াকুব (আ.)) বলল, ‘ হে আমার পুত্ররা ! (মিসরে প্রবেশের সময়) সবাই একই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ কোরো না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর কোনো বিধান থেকে আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারি না। বিধান শুধু আল্লাহরই। তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি এবং তাঁরই ওপর ভরসা করা উচিত ভরসাকারীদের। ’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৬৭)
উল্লিখিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয়বার মিসরে যাত্রার প্রাক্কালে ইয়াকুব (আ.) তাঁর ছেলেদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘ তোমরা ১১ ভাই শহরের একই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে না। নগর প্রাচীরের কাছে পৌঁছে কয়েকজনে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। ’
এর কারণ হিসেবে তাফসিরবিদরা বলেন, তিনি মূলত তাঁর সন্তানদের মানুষের বদনজর থেকে দূরে রাখতে এই পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ তাঁর সন্তানরা ছিল অত্যন্ত সুদর্শন। তিনি আশঙ্কা করেছেন যে তাদের ওপর কারো কুদৃষ্টি পড়তে পারে। তাই তিনি সন্তানদের পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বলেছেন।
মহানবী (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারাও বোঝা যায়, বদনজর সত্য এবং এর দ্বারা মানুষের ক্ষতিসাধন হয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা বদনজর সত্য বা বাস্তব ব্যাপার। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৫০৮)
তাই বদনজর থেকে বাঁচতে নিজেদের যেমন সচেতন থাকা উচিত, তেমনি নিজেদের সন্তানদেরও বদনজর থেকে রক্ষা করার জন্য সাবধানতা অবলম্বন করা।
নিজেদের সম্পদ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি গোপন রাখা। অহেতুক প্রদর্শনপ্রিয়তা বর্জন করা। আজকাল দেখা যায়, মানুষ তার সব কিছুই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে ভালোবাসে। যতটুকু আছে, তার চেয়ে বেশি প্রদর্শন করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে।
অথচ এসব কারণে তার ওপর কারো বদনজর পড়লে তার বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনভাবে কারো কোনো সম্পদ দেখলে ‘ মাশা আল্লাহ ’, ‘ বারাকাল্লাহ ’ ইত্যাদি বলা আবশ্যক।
———————————————————————————————————-
আবু উমামা ইবনে সাহল (রা.) থেকে বর্ণিত, আমির ইবনে রবিআ সাহল ইবনে হানিফকে গোসল করতে দেখে বলেন, আজ আমি যেই সুন্দর মানুষ দেখলাম, এ রকম কাউকেও দেখিনি, এমনকি সুন্দরী যুবতিও এত সুন্দর দেহবিশিষ্ট দেখিনি। (আমিরের) এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সাহল সেখানে লুটিয়ে পড়ল।
এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ ! আপনি সাহল ইবনে হুনাইপ (বা হানিফ)-এর কিছু খবর রাখেন কি ? আল্লাহর কসম ! সে মাথা উঠাতে পারছে না। তখন রাসুল (সা.) বলেন, তুমি কি মনে করছ যে তাকে কেউ বদনজর দিয়েছে ? লোকটি বলল, হ্যাঁ, আমর ইবনে রবিআ (বদনজর দিয়েছে)। অতঃপর রাসুল (সা.) আমির ইবনে রবিআকে ডেকে ক্রোধান্বিত হয়ে তাঁকে বলেন, তোমাদের কেউ নিজের মুসলমান ভাইকে কেন হত্যা করছ ? তুমি ‘বারাকাল্লাহ’ কেন বললে না ? এবার তুমি তার জন্য গোসল করো।
———————————————————————————————————-
অতএব আমির হাত, মুখ, হাতের কনুই, হাঁটু, পায়ের আশপাশের স্থান এবং লুঙ্গির নিচের আবৃত দেহাংশ ধৌত করে ওই পানি একটি পাত্রে জমা করল। সেই পানি সাহলের দেহে ঢেলে দেয়া হলো। অতঃপর সাহল সুস্থ হয়ে গেল এবং সবার সঙ্গে রওনা হলো।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস : ১৬৮৯)
তাই প্রত্যেকের উচিত, নিজের ওপর যাতে কারো বদনজর না পড়ে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আবার নিজের বদনজর যাতে অন্য কারো ওপর না পড়ে, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকা। সন্তান-সন্ততির ওপর বদনজর পড়ার আশঙ্কা হলে প্রয়োজনে তাদের ঝাড়ফুঁক করানো।
উবাইদ ইবনে রিফাআ আজ-জুরাকি (রহ.) থেকে বর্ণিত, আসমা বিনতু উমাইস (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), জাফরের সন্তানদের তাড়াতাড়ি বদনজর লেগে যায়। আমি কি তাদের ঝাড়ফুঁক করতে পারি ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। কেননা কোনো জিনিস যদি ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারত, তাহলে বদনজরই তা অতিক্রম করতে পারত। (তিরমিজি, হাদিস : ২০৫৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে, আমাদের সন্তান-সন্ততি ও সম্পদকে সব ধরনের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
Leave a Reply