রাষ্ট্র পুনর্গঠনে শহীদ জিয়ার মন্ত্রিসভা ছিল ব্যতিক্রম  

  • আপডেট সময় সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ২৯ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ছিল গভীর অনিশ্চয়তার ভেতরে। একের পর এক অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছিল।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ছিল গভীর অনিশ্চয়তার ভেতরে। একের পর এক অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছিল। এ সংকটময় বাস্তবতায় ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য সুপরিকল্পিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল গ্রহণ করেন। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ, মুক্তিযোদ্ধা, টেকনোক্র্যাট ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের একত্র করে তিনি একটি বিস্তৃত কাঠামো দাঁড় করান। যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা জোরদার করা এবং ভাঙাচোরা রাষ্ট্রকাঠামোকে নতুনভাবে সংগঠিত ও কার্যকর করে তোলা।

রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে কৌশলগত পথ তিনি বেছে নেন, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মন্ত্রিসভা গঠন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভা কোনো একক কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো ছিল না। বরং এটি ছিল রাজনৈতিক পুনর্মিলন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়। ১৯৭৭-৮১ সাল পর্যন্ত তার শাসনামলে মন্ত্রিসভায় ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অতীত, মতাদর্শ ও সামাজিক পটভূমির মানুষদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়।

এ কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাজনৈতিক বিভাজন প্রশমনের উদ্যোগ। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনের মধ্যে যে গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে জিয়াউর রহমান সচেতনভাবে বিপরীতমুখী রাজনৈতিক শক্তিকেও রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতরে টেনে আনেন। তার মন্ত্রিসভায় এমন ব্যক্তিরাও স্থান পান, যারা একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর উদাহরণ হিসেবে এম. আর. সিদ্দিকী ও কেএম ওবায়দুর রহমানের নাম উল্লেখ করা যায়।

স্বাধীনতার আগে ও পরে কেএম ওবায়দুর রহমান আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তিনি ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২-৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও তিনি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পরিসরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান ভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমির অভিজ্ঞ নেতাদের রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে আনতে উদ্যোগ নেন। সেই ধারাবাহিকতায় কেএম ওবায়দুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা রাজনীতিবিদকে নিজের শাসন ব্যবস্থায় যুক্ত করা ছিল জিয়ার রাজনৈতিক পুনর্মিলন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এছাড়া জিয়াউর রহমান এমন ব্যক্তিদের সামনে আনেন, যারা আগে ভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় সক্রিয় ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে মওদুদ আহমদের নাম উল্লেখ করা যায়। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ-ভাসানী) রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ষাটের দশকে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে তিনি প্রথমে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে গঠিত জাগদলের (জাতীয় গণতান্ত্রিক দল) সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৮ সালে জাগদল বিলুপ্ত হয়ে যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হয়, তখন মওদুদ আহমদ সেই নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর শীর্ষপর্যায়ে যুক্ত হন। তিনি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য ও পরবর্তী সময়ে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় এমন ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত হন, যাদের ১৯৭১ সালের ভূমিকাকে ঘিরে বিতর্ক-সমালোচনা ছিল। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ শাহ আজিজুর রহমান, যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক ফোরামে অবস্থান নিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের আমলে তিনি প্রথমে মন্ত্রী এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হন। এছাড়া তার মন্ত্রিসভায় আবদুর রহমান বিশ্বাস ও আবদুল আলীমের মতো ব্যক্তিরাও স্থান পান। যাদের প্রাক-১৯৭১ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ ধরনের অন্তর্ভুক্তি ছিল অতীতের বিভাজন পেরিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এবং বিভিন্ন ধারাকে একত্রে এনে কার্যকর রাজনৈতিক সমন্বয় গড়ে তোলার একটি প্রয়াস।

————————————————————————————————————

মন্ত্রিসভা গঠনে জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদেরও সামনে আনেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন (বীরপ্রতীক) ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জাফর ইমামের (বীরবিক্রম) মতো মুক্তিযোদ্ধারা তার মন্ত্রিসভায় স্থান পান। পাশাপাশি সামরিক অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব হিসেবে সাবেক নৌবাহিনী প্রধান নুরুল হকের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতার প্রতীকী উপস্থিতি বজায় থাকে, অন্যদিকে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য গড়ে ওঠে।

————————————————————————————————————

পাশাপাশি জিয়াউর রহমানের আরেকটি স্পষ্ট কৌশল ছিল টেকনোক্র্যাট ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি। অর্থনীতি তখন দুর্বল, খাদ্য সংকট ও বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা ছিল প্রবল। এ বাস্তবতায় তিনি দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে অর্থনীতিবিদ, প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের দায়িত্ব দেন। অর্থ মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে টেকনোক্র্যাটদের নিয়োগ ছিল মূলত ফলাফলমুখী শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এর অন্যতম উদাহরণ মির্জা নুরুল হুদা। একজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে তিনি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এছাড়া জিয়াউর রহমান এম. সাইফুর রহমানকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন। তিনি ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৬ থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৮০ পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন, যখন দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, রফতানি ব্যবস্থাপনা ও বাজার সম্প্রসারণ ছিল রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। পরে ২৫ এপ্রিল ১৯৮০ থেকে ১১ জানুয়ারি ১৯৮২ পর্যন্ত তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে তার ভূমিকা জিয়াউর রহমানের সরকারের দক্ষতানির্ভর শাসনধারার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মন্ত্রিসভা গঠনের আরেকটি দিক ছিল সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধিদের উপদেষ্টা পরিষদ ও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তিনি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় ভিন্ন পরিচয় ও ভিন্ন অঞ্চলের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ ধারাবাহিকতায় তার মন্ত্রিসভায় রাজমাতা বেনিতা রায় ও অং শৈ প্রু চৌধুরীর মতো প্রতিনিধিরা স্থান পান। তাদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার পরিসরে প্রান্তিক ও কম প্রতিনিধিত্ব থাকা গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি দৃশ্যমান করার একটি প্রয়াস দেখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমানের এ কৌশল ছিল গভীরভাবে বাস্তববাদী। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ধারণার ভেতরে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বিভাজনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছিলেন। এ ধারণার আওতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নকে একমাত্র রাজনৈতিক বৈধতার মানদণ্ড না বানিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতাকে সামনে আনা হয়। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর মার্শাল ল প্রত্যাহার করে সংসদীয় সদস্যদের নিয়ে তার মন্ত্রিসভা গঠন ছিল ওই কৌশলের চূড়ান্ত ধাপ। এর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান নির্বাচিত রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার সংকেত দেন। নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত মন্ত্রিসভা আরো বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়, দেশের শাসন ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে আরো দৃঢ় করে তোলে।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!