সুশাসন সুশাসনের স্বার্থেই

  • আপডেট সময় রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪
  • 18 পাঠক

——————————————

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ।

—————————————–

বন্ধুরা বলেন, বস্তাপচা শব্দ আউড়িয়ে কী লাভ, যিনি বা যারা মানেন না তিনি বা তারা শুনলে মনে মনে গোস্যা হন, স্বাস্থ্য শিক্ষা পরিষেবা পেতে হয়রান আমজনতার যখন বলার কিছুই থাকে না, ডিজিটাল সিগন্যালের সাথে পাল্টাপাল্টি ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কসরত যখন চলতেই থাকে, মেট্রোরেলের চমকে সড়কে গণপরিবহন ইতিবাচক ও নেতিবাচকের বাতচিত বাক্সবন্দি বহুদিন, সুবচনকে নির্বাসনে পাঠিয়ে তোষামোদি তেলেসমাতিতে মত্ত বর্ণচোরারা, অন্তর্ভুক্তি বনাম বিচ্যুতির মহড়া এবং ঐকমত্যের ওজস্বিতা যখন মতানৈক্যের মাসুল দিতে দিতে দ্বিধাবিভক্ত; তখন সুশাসন স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার মতো শব্দাবলির দৈন্যদশা দেখে দিনাতিপাত করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

বস্তুত সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এসব শব্দ প্রায়শ ব্যবহৃত হয় গণতন্ত্রের নান্দীপাঠে, নির্বাচনি ইশতেহারে, কোনো কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বেশি বেশি উচ্চারিত হয় আঁতেল আমলা আর ব্যবহারজীবীদের মুখে। সুশাসনের অভাবহেতু উদ্বেগ-উচ্চারণেই গড়ে ওঠে হরেক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও সংস্থা, চিন্তা-চৌবাচ্চা এবং এমনকি একে কেন্দ্র করে বড় বড় প্রকল্পে ব্যবহারজীবীরা আয়-রোজগারও করছেন।

কিন্তু আসলে সর্বত্র সুশাসন কি হালে পানি পাচ্ছে? এমনকি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা-পরিস্থিতি উন্নতির কোন পর্যায়ে, তা নিয়েও নিয়ত চলে মহাজন বাক্য ছোড়াছুড়ি। সেটা খতিয়ে দেখাও সুশাসনের স্বার্থেই জরুরি। খোদ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিরই স্ব-মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রয়োজন এ জন্য যে, সুশাসন সামষ্টিক উন্নয়নের প্রধান পূর্বশর্ত এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাই পরিচালনার অন্যতম অনুষঙ্গ।

প্রচারধর্মী উন্নয়ন তত্ত্বে দলকানা নীতিনির্ধারক যখন বলেন, ‘গ্রামের মানুষ সুশাসন বোঝে না, তারা বোঝে এবং দেখতে চায় উন্নয়ন’, কিংবা এই সেদিন উন্নয়নের সাফাই গাইতে গিয়ে আরেকজন শক্তিশালী নীতিনির্ধারক বলেই দিলেন- ‘উন্নয়ন হলে দুর্নীতি হবেই’। স্বগতোক্তি প্রকৃতির এই দুটি মহাজন বাক্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক প্রতিযোগিতা দিলে থলের বিড়াল বের হওয়ার একটা উপায় ঘটত।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা চাইলে চিন্তাভাবনায়, নীতি পরিকল্পনায় ও কর্মে সবাইকে স্বচ্ছ এবং সর্বত্র জবাবদিহিতার পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার বিকল্প নেই তো বটেই। গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল সকল গণপ্রজাতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রেরণা। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের জন্য জনগণের দ্বারাই জনগণের সরকার নির্বাচিত হবে- এমনটি নিয়ম। রাষ্ট্রে যেকোনো ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ সাধনার সফলতার ওপর নির্ভর করবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শক্তিশালী অবস্থান ও বিকাশ। প্রচারধর্মী উন্নয়নও হবে টেকসই।

আরেকটি বিষয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সৌভাগ্য তথা স্বাধীনতার সুফল সবার মধ্যে সুষম বণ্টন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুনিশ্চিত সুশাসন এবং জবাবদিহিতার সুযোগ ব্যতীত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য অযুত ত্যাগ স্বীকারের প্রকৃত প্রতিফল অর্জন সম্ভব হয় না সুশাসন সুনিশ্চিত না হলে। সম্পদ অর্জনের নৈতিক ভিত্তি বা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে বণ্টন ব্যবস্থাপনাও সুষ্ঠু হয় না।

বাংলাদেশে ধনীর সংখ্যা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান এ আশঙ্কা ও উদ্বেগের হেতুতে পরিণত হয়েছে । সমাজে বণ্টনবৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে সুশাসন প্রেরণা ও প্রভাবক ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্যও জরুরি। যেমন- আজকাল এক দেশ বা অর্থনীতির প্রচুর অর্থ বিদেশে কিংবা অন্য অর্থনীতিতে দেদার পাচার হয়ে থাকে।

বিনা বিনিয়োগে বা বিনা পরিশ্রমে প্রকৃত পণ্য ও সেবা উৎপাদন ব্যতিরেকে অর্থ অর্জিত হলে অবৈধভাবে অর্জিত সেই অর্থ পাচার হবেই। তার ওপর এটা যদি বলা হয়, এই আয়-উপার্জন নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না, তা হলে তা সোনায় সোহাগা। অর্থ বৈধ পন্থায় উপার্জিত না হলে সেই অর্থের মালিকানার প্রতি দায়দায়িত্ববোধও গড়ে ওঠে না।

জাতীয় ঐক্য ও সংহতি শক্তিশালীকরণেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক পরিবেশের আবশ্যকতা রয়েছে। কেননা, সমাজে একপক্ষ বা কতিপয় কেউ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে থাকলে, আর অধিকাংশ অন্যজন কারও কাছে কোনো জবাবদিহির মধ্যে না থাকলে অর্থাৎ একই যাত্রায় ভিন্ন আচরণে নিষ্ঠ হলে পারস্পরিক অভিযোগের নাট্যশালায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয় না, জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে না। সমতা বিধানের জন্য, সবার প্রতি সমান আচরণের (যা গণতন্ত্রের মর্মবাণী) জন্যও স্বচ্ছতা তথা আস্থার পরিবেশ প্রয়োজন।

সুশাসনের অবর্তমানে জবাবদিহিতাবিহীন পরিবেশে, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অবয়বের অন্যতম প্রতিফল হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ যে দুর্নীতি করে তাকে ন্যায়নীতিহীনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, তার দ্বারা সমাজকে নেতৃত্বদান বা যেকোনো ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। সর্বত্র তাকে দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের জন্য বা কারণে সমাজে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়।

নেতৃত্বের এই অধোগতির প্রেক্ষাপটই প্রত্যক্ষভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবজনিত পরিবেশ নির্মাণ করে। নেতৃত্বের কার্যকলাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে সমাজে-সংসারে সে নেতৃত্বের অধীনে আস্থার সংকট তৈরি হয়। এটি পরস্পর প্রযুক্ত সমস্যা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির অবসরে আত্মঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেমন- যেকোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ। যেমন- স্বেচ্ছাচারিতায়, নানান অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষায়তনে শিক্ষক, সুশীল সেবক, হাসপাতালে চিকিৎসক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মিবাহিনী নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার- সবই প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থ বিনিময় ও নানান অনিয়মের কারণে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ভালো ও যোগ্য সুশীল সেবক, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইন রক্ষক নিয়োজিত হতে পারে না। অসদাচারী সুশীল সেবক, অদক্ষ চিকিৎসক, অমেধাবী ও অযোগ্য শিক্ষক ও সব কূল রক্ষাকারী আইন রক্ষকের কাছ থেকে গুণগতমানসম্পন্ন প্রশাসনিক সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা বা তালিম বা অনুসরণীয় আদর্শ লাভ সম্ভব হয় না।

অবৈধ লেনদেনে নিয়োগপ্রাপ্ত অযোগ্য সেবক, চিকিৎসক কিংবা শিক্ষকের কাছে কার্যকর সেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে সমস্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগবাণিজ্য চলে, সেখানে মেধাবী ও উপযুক্ত প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। তাদের বিপরীতে নিয়োগ পায় অদক্ষ-অযোগ্য লোক। এটা একটি দিক।

আরেকটি দিক, কেউ বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে এবং অবৈধভাবে অর্থ দিয়ে নিয়োগ পেলে সে প্রথমে চাইবে গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে সেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষার পরিবেশকে বিপন্ন করে ওই অর্থ তুলতে। সেক্ষেত্রে সে প্রয়োজন হলে যেকোনোভাবে ( কর্তব্য-দায়িত্বহীন হয়ে, প্রশ্নপত্র ফাঁস করা থেকে শুরু করে নানা ফাঁকিঝুঁকি ও পক্ষপাতিত্ব অবলম্বন করে ) ইচ্ছা করে নীতি-নৈতিকতা ভুলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উঠিয়ে নেবে। তখন সে তার চাকরি বা দায়িত্বশীলতার দিকে নজর দেবে না।

কোনো পদপ্রার্থী কর্তৃক কোনো সংস্থা ও সংগঠনে স্রেফ প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সময় কিংবা কোনো সংস্থায় নিয়োগ পাওয়ার সময় যে অর্থ ব্যয় করে তা নিঃসন্দেহে একটি মারাত্মক মন্দ বিনিয়োগ। এতে সমাজ দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রথমত, একজন ভালো যোগ্য প্রার্থীর স্থলে একজন দুর্নীতিবাজ অদক্ষের অবস্থান সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং দ্বিতীয়ত, সে চিকিৎসা কিংবা লেখাপড়ার পরিবেশ বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে এমনভাবে কলুষিত করতে পারে, তাতে যুগ যুগ ধরে দুষ্ট ক্ষতেরই সৃষ্টি হয়।

আজকাল পাবলিক ও প্রাইভেটসহ সব ক্ষেত্রেই যেকোনো সেবা, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সব ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা ও দেদার চলে অর্থ লেনদেনের ছড়াছড়ি। অবস্থা এমন, অর্থ খরচ ব্যতীত বিনামূল্যে প্রাপ্য কোনো সাধারণ সেবা পর্যন্ত মিলবে না। উপরির বিনিময়ে যেকোনো ন্যায্যসেবাও বিক্রি করা হয়, সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আত্মসাৎ অপচয়, অপব্যয় লাগামহীন করে তুলতে পারে।

স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে গণপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের সময় ভোটারদের বলছেন তাদেরকে  ‘ সমাজসেবার সুযোগ  ’ দিতে। কিন্তু সেখানে যদি দেখা যায় সমাজসেবার সুযোগ পাওয়ার জন্য ভালো পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা হলে কথিত ‘ সমাজসেবা ’ তো বিনিয়োগ ব্যবসায় পরিণত হবে। কেননা, নির্বাচিত হয়ে কোনো পদে গেলে আলোচ্য ব্যক্তি নিজের বিনিয়োজিত অর্থটা আগে উঠিয়ে নিতে চাইবেন।

সুতরাং নির্বাচন পদ্ধতিতে অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে সমাজসেবার সুযোগ কিনতে হলে বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে অন্যদিকে চলে যায়। সেক্ষেত্রে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হয়। তহবিল তছরুপ, আত্মসাৎ, সম্পদের ও ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা অনুপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হলো, যার যা কাজ তাকে সেভাবে করতে দেয়া বা ক্ষমতা দেওয়া। যেমন- স্থানীয় সরকার। স্থানীয় সরকার পরিচালনা আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনার ভার স্থানীয় সরকারের হতে দেয়া হলে সে সরকার হবে প্রকৃত প্রস্তাবে তার নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে জবাবদিহিতামূলক স্থানীয় পর্যায়ের সরকার।

স্থানীয় সরকারই সেখানকার ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করবেন। স্থানীয় সরকার পরিচালনার জন্য সেখান থেকে তারা যে কর নেবেন, তা থেকেই সেখানে সেবামূলক কাজ নিশ্চিত করবেন, যে প্রতিশ্রুতি তারা দেবেন- তা তারাই পূরণ করবেন। তা হলেই সেটা অর্থবহ ও কার্যকর হবে। স্থানীয় সরকারকে পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ থাকতে হবে। তবেই স্থানীয় সরকার শব্দটির যথার্থতা ফুটে ওঠবে।

জাপানে দেখেছি এক এক প্রিফেকচার বা প্রদেশ বা রাজ্য নিজ নিজ আয়-ব্যয় উন্নয়নের জন্য সার্বিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সেখানে এক স্থানীয় সরকার অপর স্থানীয় সরকারের চাইতে সরকার পরিচালনায় কতটা পারদর্শী তার প্রতিযোগিতা চলছে।

লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!