নবীজির ভাষায় প্রকৃত মিসকিন যারা

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৮ পাঠক

মুফতি সাইফুল ইসলাম।। ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ । ।

‘ মিসকীন ’ শব্দটি আমাদের সমাজে উচ্চারিত হয় করুণার সুরে, কখনো আবার অবজ্ঞার তির্যক ছোঁয়ায়। কিন্তু ইসলাম এই শব্দের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে এক গভীর মর্যাদা, এক আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য। যে মানুষ পৃথিবীর চোখে অগোচরে থাকে, যে নিজের সম্মানের ভারে মানুষের কাছে হাত পাততে লজ্জা পায় ; সেই মানুষকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) “ প্রকৃত মিসকীন” বলে অভিহিত করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَيْسَ الْمِسْكِينُ الَّذِي يَطُوفُ عَلَى النَّاسِ تَرُدُّهُ اللُّقْمَةُ وَاللُّقْمَتَانِ وَالتَّمْرَةُ وَالتَّمْرَتَانِ وَلَكِنْ الْمِسْكِينُ الَّذِي لاَ يَجِدُ غِنًى يُغْنِيهِ وَلاَ يُفْطَنُ بِهِ فَيُتَصَدَّقُ عَلَيْهِ وَلاَ يَقُومُ فَيَسْأَلُ النَّاسَ

‘আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রকৃত মিসকীন সে নয় যে মানুষের কাছে ভিক্ষার জন্য ঘুরে বেড়ায় এবং এক-দু’ লুকমা অথবা এক-দু’টি খেজুর পেলে ফিরে যায় বরং প্রকৃত মিসকীন সেই ব্যক্তি, যার এতটুকু সম্পদ নেই যাতে তার প্রয়োজন মিটতে পারে এবং তার অবস্থা সেরূপ বোঝা যায় না যে, তাকে দান খয়রাত করা যাবে আর সে মানুষের কাছে যাচ্ঞা করে বেড়ায় না।
’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৩৯)

—————————————————————

হাদিসের কথা

—————————————————————

এই হাদিস যেন এক আয়না ; যার সামনে দাঁড়ালে আমরা সমাজের অদৃশ্য দারিদ্র্যকে দেখতে পাই। যে বৃদ্ধ প্রতিদিন নতুন জামা পরে অফিসে যান কিন্তু ঘরে ফুরিয়ে যায় ওষুধের দাম ; যে শিক্ষিত তরুণ বন্ধুরা হেসে-খেলে নিজের বেকারত্ব ঢেকে রাখে ; যে বিধবা মা সন্তানদের মুখে হাসি রাখার জন্য নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে রাখে—তারা-ই আজকের প্রকৃত মিসকীন। তারা হাত পাতে না, তারা মুখ খোলে না, কিন্তু তাদের চোখের নীরবতা আকাশভরা আর্তনাদে রূপ নেয়।

আত্মসম্মানের আড়ালে লুকানো অভাব

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

یَحۡسَبُهُمُ الۡجَاهِلُ اَغۡنِیَآءَ مِنَ التَّعَفُّفِ ۚ تَعۡرِفُهُمۡ بِسِیۡمٰهُمۡ ۚ لَا یَسۡـَٔلُوۡنَ النَّاسَ اِلۡحَافًا ؕ

“ আত্মসম্মানবোধ না চাওয়ার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে ; আপনি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবেন। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না ” (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৩)

এই আয়াত নবীজির হাদিসেরই প্রতিধ্বনি। আত্মসম্মান মানুষের অন্তর্গত এক মহৎ গুণ। কিন্তু যখন দারিদ্র্য তাকে ঘিরে ধরে, তখন এই আত্মসম্মানই হয়ে যায় তার দুঃখ লুকানোর পর্দা। ইসলাম এই আত্মমর্যাদাকে সম্মান দেয়।
যে নিজের মান রক্ষায় মুখ খুলতে পারে না, তার হক আদায় করা দানকারীর দায়িত্ব। সমাজের কাছে তাদের চাহিদা অদৃশ্য, কিন্তু আল্লাহর কাছে তারা অতি দৃশ্যমান।

দানের প্রকৃত দিকনির্দেশ

ইসলামে দান (সদকা ও যাকাত) কেবল হাত-পেতেকে দেয়ার জন্য নয়। নবী (সা.) বলেছেন— ‘ উপরের হাত (দানকারীর হাত) নিচের হাতের (গ্রহণকারীর) চেয়ে উত্তম। ” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪২৯)

কিন্তু দানের শ্রেষ্ঠতা তখনই সত্যিকার হয়, যখন তা পৌঁছে যায় এমন মানুষের কাছে, যে তার প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারে না।

ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেন—‘ যে আত্মসম্মানবোধে কিছু চায় না, অথচ প্রকৃত অভাবগ্রস্ত, তাকেই যাকাত ও সদকার জন্য অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। ” (শারহু সহিহ মুসলিম/ شرح صحيح مسلم) অর্থাৎ, ইসলামী সমাজে দানের মূলনীতি হলো—যে চায় না কিন্তু তার প্রয়োজন, তাকেই খুঁজে বের করো।

সমাজের নৈতিক দায়বোধ

একটি সমাজের মানবিক শক্তি বোঝা যায় তার মিসকীনদের প্রতি আচরণে। যেখানে ধনী-গরিবের ফারাক কেবল টাকার নয়, বরং হৃদয়ের ব্যবধানের; যেখানে অভাবী মুখ লুকিয়ে রাখে কারণ কেউ বোঝার চেষ্টা করে না—সেই সমাজে ইসলামী দায়িত্ববোধ মৃতপ্রায়।

রাসুল (সা.) সমাজকে আহ্বান করেছেন এই নীরব কাতরতার দিকে দৃষ্টি দিতে। ইসলাম দানকে কেবল অর্থ দান নয়, বরং মানবিক অনুসন্ধানের এক রূপ বলে গণ্য করে। তিনি বলেন— ‘ যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন মেটায়, আল্লাহ তার প্রয়োজন মেটাবেন। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪২)

আজকের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা

আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ভিক্ষাবৃত্তি পেশায় পরিণত হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত মিসকীনরা রয়ে গেছে আড়ালে। কেউ কেউ চাকরির আড়ালে দেনা সামলায়, কেউ অসুস্থ সন্তান লুকিয়ে রাখে, কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে না পেরে বন্ধুর কাছেও মুখ খুলতে পারে না। তাদের দিকে তাকানোই ইসলামের শিক্ষা। দান যদি হয় আত্মতুষ্টির প্রদর্শন নয় বরং নীরব অনুসন্ধানের প্রয়াস—তবে তা আল্লাহর নিকট গৃহীত সদকা হয়ে যাবে।

প্রকৃত মিসকীন সে নয়, যে পথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করে ; বরং সে, যে নিজের প্রয়োজনের ভারে নত হলেও মানুষের সামনে মাথা নোয়ায় না। ইসলাম এই নীরব মিসকীনদের মর্যাদা দিয়েছে, যেন আমরা দানের দৃষ্টি শুধু হাত-পেতে তাকাদেরই না, বরং লজ্জায় মুখ ঢেকে থাকা মানবতাকেও দেখি।

দুনিয়া হয়তো তাদের ভুলে যায়, কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন—‘ নিশ্চয়ই আল্লাহ জানেন তোমরা যা ব্যয় করো এবং যা লুকিয়ে রাখো। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত :২৭১)

প্রকৃত দান তাই কেবল টাকার বিতরণন নয়, বরং অনুধাবনের ; যে দানে লুকিয়ে থাকে বোঝাপড়া, সহানুভূতি ও ঈমানের আলোকরশ্মি।

লেখক : প্রবন্ধিক ও অনুবাদক।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!