দিশারী ডেস্ক।। ২ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
নোয়াখালী পৌরসভার নাগরিকসেবাসহ সার্বিক জনসেবার মানদন্ড অনেকটাই ভেঙে পড়ছে। ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ছাড়া এখানে কোন কাজই হয়না। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সূত্র জানায়, বন্যা পরবর্তী পৌর এলাকার রাস্তা-ঘাটের উন্নয়নে কোটি-কোটি টাকার বরাদ্ধ করেছে সরকার। ইতোমধ্যে সেসব কাজের টেন্ডার আহ্বানও এগিয়ে চলছে। শুরু হয়েছে বেশ কিছু রাস্তা-ঘাটের নামখাওয়াস্ত উন্নয়ন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি কাজের বরাদ্ধ হতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন একটি চুক্তিবদ্ধ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। কখনো মন্ত্রনালয়ের উধ্বতন কোন কর্মকর্তার নামেও ভাওতাবাজি করছেন তিনি। কখনো বিক্রয় করছেন পৌরসভার প্রশাসকসহ বিভিন্নমহলের নাম।
—————————————————–
ভেঙ্গে পড়ছে নাগরিক সেবা
—————————————————
জানা গেছে, শহরের পৌরবাজার ও সোনাপুর বাজারে দোকান ও ভিটি বরাদ্ধের নামেও স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি রয়েছে তার। ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির তথ্য গোপণ রাখার শর্তে সুবিধাজনক অর্থ সুবিধা ভাগিয়ে নিয়ে এসব বাজারের প্রায় দোকান ও ভিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুকুলে বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি।
মাইজদী সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার কক্ষগুলো বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন। কক্ষের মালিকেরা জানান, পৌরসভার দূরদর্শি সিদ্ধান্ত ও ডিজাইনগত বিভিন্ন সমস্যার কারণে এ দশা। তবে বরাদ্দ গ্রহিতারা প্রতিটি দোকানের মাসিক বিল প্রত্যেক মাসে নিয়মিত পরিশোধ করে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, দোকান কেন খুলে না বা কেন ভাড়া দেয় না, এমন অজুহাতে বরাদ্ধ বাতিল করে দেয়ার হুমকি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একইভাবে, সোনাপুর পৌর সুপার মার্কেটেরও তৃতীয় তলার মালিকদের থেকেও হাতিয়েছেন সমপরিমাণ অর্থ।
সোনাপুর বাজারের ইজারার মেয়াদ শেষে হতে ৪ মাস বাকী। অথচ ৪৬ লাখ টাকা এখনো পৌর তহবিলে জমা না দিয়ে চলছে ইজারাদার কার্যক্রম ! তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তাছাড়া খাস আদায়ের বিধান থাকলেও, তা না করে ইজারাদারের সাথে ১৫ লাখ টাকার সমঝোতা চুক্তিতে পৌর তহবিলে মাত্র কিয়দাংশ টাকা জমা দিয়ে সুরাহা করা হয়েছে। যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পৌরসভা। যা ইজারা পৌরবিধিরও পরিপন্হী।
——————————————————————————————————————–
পৌরবিধি অনুযায়ী রাজস্বের টাকা জমা না হওয়া স্বাপক্ষে বাজার হস্তান্তর করা যাবে না। বিষয়টি জানার পরেও তারা তা না করে অসাধু পথ অবলম্বন করেছেন বলে অভিযোগে বলা রয়েছে।
——————————————————————————————————————–
হাসপাতাল রোডের কতেক কাজ ঠিকাদারদের মাধ্যমে সম্পন্ন না করে নির্বাহী প্রকৌশলী ও নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেরাই করাচ্ছেন। এভাবে পৌরসভার অনেক ঠিকাদারী কাজের সাথে তারা যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। একইসাথে, পৌরসভার প্রায় কোটেশনের কাজে নিজেরাই সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
পৌর প্রশাসনের গোপণ সূত্র জানায়, এমন অনেক কোটেশনের কাজ শুধুমাত্র নথিতে আছে। কার্যত বাস্তবে নেই। যেমন পৌর পার্কের পাড়ে মাটি ভরাট নামের কোটেশন থাকলেও, কাজটি আদৌ হয়নি বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন পৌরসভায় যোগদানের শুরুতে নিজেকে নিরপেক্ষ লোক দাবি করলেও হালে বিএনপির অমুক-তমুক নেতা তার স্বজন, প্রিয়জনসহ নানা কথায়, নানাভাবে নিজেকে জাহির করছেন।
এছাড়া নিজেকে লক্ষীপুরের স্থানীয় লোক দাবি করে নিজের মাটির শক্তি অনেকে গভীরে বলেও জাহির করছেন। একইসাথে কথায় কথায় নোয়াখালীতেও বিএনপির সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যান তার আত্মীয় বলে দাবি করেন তিনি।
————————————————————————————————————————
অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভার কোন সেবাপ্রত্যাশী নাগরিক তার কাছে গেলে অত্যন্ত ওদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন তিনি। কথায় কথায় নিজেকে দাপট দেখিয়ে বলেন, তার হাত নাকি অনেক ওপরে। বিএনপির নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি নাকি তার কাছের লোক।
—————————————————————————-
এছাড়া তিনি কার্যালয়ের ভেতরে একটি গোপন কক্ষে ইয়াবায় আসক্ত হন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান একাধিক কর্মচারী। তারা নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিনের ডোপটেষ্ট করারও দাবি জানান।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা ভোগের কারণে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের চলমান উন্নয়ন কাজের মানও সুখকর নয়। এসব চলছে ঢিলেঢালায়। যা অত্যন্ত নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে সম্পন্ন করা।
অভিযোগ ওঠেছে, বর্তমানে নোয়াখালী পৌরসভায় নির্বাচিত মেয়র না থাকায় তিনি নিজেকে মেয়র বলে ভাব দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে নানাকাজে জিম্মি করে নিজের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার জানান, তাদের কোন ফাইলেই নগদ সুবিধা গ্রহণ ছাড়াই সই-স্বাক্ষর করেননা তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এর আগে কর্মরত পৌরসভায় বিভিন্ন সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের সুবিধা দেয়ার কথা বলেও হাওলাত টাকা নিতেন এই নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন।
একপর্যায়ে, তার বদলিজনিত কারণে ওই কর্মস্থল হতে নোয়াখালী পৌরসভায় যোগদানের খবর পেয়ে, তারা এই নির্বাহীকে আটকে রেখে নিজেদের দেয়া টাকা উদ্ধার করেছেন।
————————————————————————————————————-
জানা যায়, ১৪৩২ বাংলা সনের দত্তের হাট গরু বাজারের ৪০ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তিতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করে দেন। সূত্র জানায়, ওই টাকার মধ্যে মাত্র কিছু অংশ পৌর তহবিলে জমা দিয়ে বাকীটা আত্মসাত করেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন।
এছাড়া , নোয়াখালী পৌরসভাস্থ বাৎসরিক ১০২ টি হাটের মধ্যে মাত্র ১৪টি ব্যতিরেকে বাদবাকী হাটগুলো সবই ইজারা দেয়া হয়েছে। অথচ ইজারাকৃত হাটের অর্থসমূহ যথাযথভাবে পৌর তহবিলে জমা হয়নি বলে দাবি করছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌর প্রশাসনের এক কর্মচারী।
—————————————————————————————————————
পৌর সূত্র জানায়, সাধারন শাখা থেকে মুরগির ড্রেসিং ইজারা পৌরসভার গাড়িচালক হারুনের স্ত্রীর নামে গোপণে ৩ বছরের জন্য বরাদ্ধ দেয়। অথচ তা বরাদ্ধ নয়, ইজারা হওয়ার কথা। এ বিষয়ে ইজারা প্রত্যাশী লোকজন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা কার্যক্রম করা হয়েছে কিনা , এসব নিয়ে বারবার তাগিদ দেয়ার পর এ নিয়ে বাধে নানা বিপত্তি ।
মুরগির সিং এর জন্য সাধারণ শাখা থেকে নথি তৈরি করে ইতোমধ্যে গাড়িচালক হারুনের স্ত্রীর নামে বরাদ্ধপত্র তৈরি করে দেয়া হয়। এ কাজের জন্য সচিব দেড় লাখ টাকার ঘুষ নিয়েছেন বলে সূত্র জানায়।
একপর্যায়ে, ইজারা প্রত্যাশীদের চাপের মুখে এ নথি গোপন করে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে পুনরায় প্রক্রিয়া করে সেই একই ব্যক্তি অর্থ্যাৎ হারুনের স্ত্রীর নামে ১ বছর মেয়াদে ইজারার বদলে ৩ বছরের জন্য দেয়া হয়। জনশ্রুতি আছে , হারুন তা ১৭ লাখ টাকায় হস্তান্তর করেন অন্যত্র।
অভিযোগ ওঠেছে, এই টাকা থেকেও একটা অংশ নির্বাহী কর্মকর্তা পেয়েছেন। তাছাড়া, ইজারার নীতিমালা অনুযায়ী ইজারা বা ডাক ১ বছরের কথা থাকলেও, বর্তমানে ৩ বছরের জন্য দেয়া হয়েছে নামমাত্র মূল্যে।
পৌরসভার বিভিন্ন স্টেশনারী সামগ্রী প্রশাসকের ব্যক্তিগত সহকারী তারিফের নামে মূলত নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেই সরবরাহ করছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান পৌরসভার কতেক কর্মচারী।
তাছাড়া ভুয়া ও বানোয়াট পরিচ্ছন্নতাকর্মীর তালিকা সাজিয়েও পৌর তহবিলের মোটা অংক হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সোনাপুর পৌর বাজারে সাবান ফ্যাক্টরি নামে একটি ভিটি রয়েছে। এটি জনৈক মো.তাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি থেকে মাসুদুর রহমান খরিদ করেন। জীবদ্দশায় মাসুদ ফ্রান্স বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দেশে করোনাকালে তার মৃত্যর পর মাসুদুর রহমানের স্ত্রী ভিটিটি ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। এ বিষয়ে তিনি প্রশাসক ও নির্বাহী কর্মকর্তার সাথেও একাধিকবার দেখা করেন। তবুও তার আবেদনটি আশার আলো দেখেনি। তবে ভিটিটি খালি পড়ে থাকার সুযোগে একটাপর্যায়ে পৌরকর্তৃপক্ষ জনৈক ব্যক্তির কাছে ৭ লাখ টাকায় বিক্রয় করে দিয়েছেন বলে সূত্র জানায়।
এছাড়া পৌরসভার অনেক সম্পত্তি দখল উদ্ধারের বিপরীতে বিভিন্ন তালবাহনার ফাঁকে নগদ সুবিধার বিনিময়ে একটি গোষ্ঠীর দখলে সপে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।।
অবশ্য, তিনি সবই অস্বীকার করে বলেছেন যে বা যা যারা এমন তথ্য দিয়েছে তা আদৌ সত্য নয়। নিজেকে সৎ বলে দাবি করছেন নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন।
Leave a Reply