দিশারী ডেস্ক।। ১০ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।
গত ২৮ এপ্রিল নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আলহেরা আইডিয়াল একাডেমিতে এ ঘটনা ঘটে। ছাত্রীর মা শামসুন্নাহার আখতার জোছনা জানান, পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়ায় গণিত শিক্ষক ফাইজ উদ্দিন তার মেয়ের ঘাড়ে ও পিঠে বেত দিয়ে বেশ কয়েকটি আঘাত করেছে। এরপর তার মেয়ে বাড়ি ফিরে অসুস্থ হয়ে যায়। প্রথমে খিঁচুনি শুরু হয়, পরে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। তাৎক্ষণিকভাবে প্রথমে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। ওই ছাত্রী এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিক্ষকের মারধরের জেরে মানসিক আঘাত থেকে এমনটি ঘটেছে।
—————————————————————————————————————
শুধু এ শিক্ষার্থী নয়, দেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ে বা বাড়িতে শাররিক শাস্তির মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এ ধরনের শাস্তি শিশুদের শিখন দক্ষতায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ‘ বিল্ডিং হিউম্যান ক্যাপিটাল হয়ার ইট ম্যাটারস ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব শিশু শাররিক শাস্তির শিকার হয় তারা গাণিতিক দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে।
—————————————————————————————————————
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শাররিক শাস্তির শিকার শিশুদের ১০০ স্কেলে গাণিতিক দক্ষতার স্কোর ২১ দশমিক ৩৭। অন্যদিকে শারীরিক শাস্তির শিকার হয়নি এমন শিশুদের ক্ষেত্রে এ স্কোর ৩৬ দশমিক ৮৪।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাররিক শাস্তি প্রদান করা হলে শিশুর মনস্তত্ত্বের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে, এতে শিশুর দক্ষতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করতে শিক্ষাকে আনন্দময় করা জরুরি। যখন কোনো বিষয়ের জন্য শিশুকে শাররিক শাস্তি দেয়া হয়, তখন তার মনস্তত্ত্বের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। সে হয়তো তাৎক্ষণিক ভয়ে বিষয়টি আত্মস্থ করে কিন্তু যথাযথভাবে অনুধাবন করা বা শেখার আগ্রহটা হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জিত হয় না।
—————————————————————————————————————
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের অভিভাবকদের বড় অংশই শিশুদের সুশৃঙ্খল করতে শাররিক শাস্তির পক্ষে। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ অভিভাবক শিশুদের শৃঙ্খলায় আনতে শাররিক শাস্তিকে সমর্থন করেন আর ৭০ শতাংশ অভিভাবক বিভিন্ন সময়ে শিশুদের শৃঙ্খলায় আনতে শাররিক শাস্তি প্রদান করেছেন। এর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে, ২০২৫ ’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, জরিপ চালানোর আগের এক মাসে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৬ শতাংশ শিশু শারীরিক ও মানসিক শাস্তির শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে মুখ, মাথা, কানে ও ঘাড়ে চড়থাপ্পড়, মারধর ও শরীরে বারবার আঘাতের মতো শাররিক শাস্তির শিকার হয়েছে ২৫ শতাংশ শিশু। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৩ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি শাস্তির শিকার হচ্ছে। এ বয়সী শিশুদের ৭৬ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৩ শতাংশ গুরুতর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়।
—————————————————————————————————————
ফলে অনেক শিশুর মধ্যেই অল্প বয়স থেকেই শেখার প্রতি ভয়, অনীহা ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক জ্ঞানীয় বিকাশ ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন, শাররিক শাস্তি শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক শিখন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। যখন কোনো শিশু শাস্তির ভয় বা মানসিক চাপে থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক ‘ ফাইট অর ফ্লাইট ’ অবস্থায় চলে যায়। এতে শরীরে কর্টিসোল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা স্মৃতি, শেখা ও যুক্তিভিত্তিক সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের অংশগুলোর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে শিশুদের মনোযোগ ও কার্যকর স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা গণিতের মতো বিশ্লেষণধর্মী বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একই সঙ্গে গণিত শেখার সঙ্গে যদি বারবার ভয় বা শাস্তির অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়, তবে শিশুর মধ্যে গণিতভীতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে পরিবারে ইতিবাচক শেখার পরিবেশ ও উৎসাহ পেলে শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়ে, যা তাদের গাণিতিক দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হয়।’
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শিশুদের গাণিতিক দক্ষতার এ ঘাটতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর নীতিনির্ধারণী ও গবেষণাভিত্তিক সংগঠন অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)।
সংগঠনটির ‘ ইউনিভার্সাল বেসিক স্কিলস : হোয়াট কান্ট্রিজ স্ট্যান্ড গেইন ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী যদি ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এক্ষেত্রে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় জিডিপি আগামী ৮০ বছরে বর্তমান প্রবণতার তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি হতে পারে। এমনকি ঘানার মতো দেশগুলোতে এ অর্জনের ফলে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক লাভের পরিমাণ বর্তমান জিডিপির প্রায় ৩৮ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। এখানে মৌলিক দক্ষতা বলতে ওইসিডি পরিচালিত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পরীক্ষা ‘ পিসা ’তে অন্তত ‘ লেভেল ১’ বা ৪২০ স্কোর অর্জনকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা সাধারণ পাঠ্যবই পড়ে বুঝতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে।
——————————————————–
খবর : একটি জাতীয় দৈনিক।
—————————————————–
উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পিসা স্কোরে এগিয়ে থাকা দেশগুলো দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে পিসা পরীক্ষার গণিত অংশে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির স্কোর ৫৭৫। এরপর রয়েছে চীন, যার স্কোর ৫৫২। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের স্কোর ৫৩৬। এছাড়া সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডাসহ বেশির ভাগ উন্নত দেশের স্কোরই ৫০০-এর বেশি বা এর কাছাকাছি।
———————————————————————————————————-
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরিই গণিতের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটি পোশাক খাত হোক বা বিদ্যুৎ খাত। উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে গাণিতিক দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তির বিকল্প নেই। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এ চাহিদা ক্রমশ বাড়বে। তাই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতে তরুণ প্রজন্মকে অবশ্যই গণিত ও বিজ্ঞানে দক্ষতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। দক্ষতার জন্য শুধু গণিত শেখালেই হবে এমন নয়। কার্যকর দক্ষতা নিশ্চিতে ভাষা শিক্ষা, গাণিতিক শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ভাষাগত দক্ষতা যদি অর্জিত না হয় বাকি বিষয়গুলো অনুধাবন কঠিন।
———————————————————————————————————-
দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শাররিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে ২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শাররিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা ’ প্রণয়ন করে। এছাড়া শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার হেফাজত বা দায়িত্বে থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা, ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করলে এবং এতে শিশুর শাররিক বা মানসিক ক্ষতি হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। তবে এর কোনোটিই শিশুদের বিদ্যালয় বা বাড়িতে শাররিক শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারছে না।
————————————————————————————————————–
এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত দুটি পরামর্শ কমিটির আহ্বায়ক ড. মনজুর আহমদ বলেন, শাররিক শাস্তির বিরূপ প্রভাব বিষয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে শুধু গণিতের কথা উঠে এলেও গবেষণা করলে দেখা যাবে বাকি বিষয়েও একই ধরনের প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা তৈরি। শিক্ষক-অভিভাবকদের বোঝাতে হবে শাররিক শাস্তি দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে শিশুর ক্ষতির কারণ হয়। পাশাপাশি সরকারকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ ও মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবকদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
Leave a Reply