সন্তানের ফলাফল খারাপ ? অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব কি ?

  • আপডেট সময় সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১২ পাঠক

মুফতি সাইফুল ইসলাম।। ২ নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনটি অভিভাবকদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি কখনো কখনো উদ্বেগ ও হতাশারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যেক মা-বাবাই চান, তাঁদের সন্তান ভালো ফল করুক, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক। কিন্তু সব শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা ও শেখার সক্ষমতা এক রকম নয়। তাই প্রত্যাশিত ফল না পেলে অনেক অভিভাবক সন্তানকে বকাঝকা করেন, অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাজনক মন্তব্য করেন। অথচ এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মা-বাবার সহমর্মিতা, সাহস ও সহযোগিতা।

ইসলাম সন্তানদের সঙ্গে কোমল ও দয়াপূর্ণ আচরণের শিক্ষা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন এবং তাদের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) দীর্ঘ দশ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘ আমি দশ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি। এ সময়ে তিনি কখনো আমাকে উফ শব্দটিও বলেননি। কোনো কাজ করলে বলেননি, কেন করেছ ? আর কোনো কাজ না করলে বলেননি, কেন করোনি ?’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৩৮; মুসলিম, হাদিস : ২৩০৯)। নবীজির এই আচরণ থেকে বোঝা যায়, ভুল কিংবা প্রত্যাশার ব্যত্যয় ঘটলে রাগারাগি ও অপমান নয়, বরং ধৈর্য ও কোমলতার মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।

—————————————————————————————————————————————–

সন্তান পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে প্রথমেই তাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত নয়। বরং কেন এমন ফল হলো, তা জানার চেষ্টা করতে হবে। পড়াশোনায় অমনোযোগ, শাররিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা কিংবা পড়াশোনার সঠিক পরিবেশের অভাব এর কারণ হতে পারে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নিজেদের দুর্বলতা বুঝতে পারে না কিংবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায় না। তাই সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে কথা বলা, তার সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করা অভিভাবকের দায়িত্ব।

—————————————————————————————————————————————–

অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করা সন্তানের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার অন্যতম কারণ। ‘ অমুকের ছেলে এত ভালো ফল করল, তুমি পারলে না কেন ? ’ কিংবা ‘ তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না ’—এ ধরনের মন্তব্য শিশুমনে হীনম্মন্যতা ও হতাশা তৈরি করতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক শিশুর যোগ্যতা ও বিকাশের ধরন আলাদা। তাই তুলনা নয়, বরং তার নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। ’ (সুরা রাদ, আয়াত : ১১)। এ আয়াতের শিক্ষা হলো, পরিবর্তনের জন্য সচেতন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

অভিভাবকদের উচিত সন্তানের সামনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল মানেই জীবনের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। সন্তানকে তার ভুলগুলো বুঝতে সাহায্য করতে হবে, পরবর্তী পরীক্ষার জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে শিক্ষকদের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি তার ঘুম, খাবার, খেলাধুলা ও মানসিক প্রশান্তির দিকেও নজর দিতে হবে। ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে তাকে বুঝাতে হবে, জীবনে সফল হতে হলে ভালো ফলের পাশাপাশি সততা, অধ্যবসায়, দায়িত্ববোধ ও উত্তম চরিত্রও প্রয়োজন।

সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে মা-বাবার জন্য আমানত। তাকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করানোই নয়, একজন সৎ, যোগ্য ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও অভিভাবকের দায়িত্ব। তাই সন্তানের ফলাফল খারাপ হলে তাকে ভেঙে না দিয়ে সাহস দিন, অপমান না করে পাশে দাঁড়ান। মনে রাখবেন, আপনার একটি স্নেহপূর্ণ কথা সন্তানের মনে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাতে পারে। আর একটি কঠোর মন্তব্য তাকে দীর্ঘদিনের জন্য আত্মবিশ্বাসহীন করে তুলতে পারে। সন্তানের ব্যর্থতার মুহূর্তে তার পাশে থাকাই প্রকৃত অভিভাবকত্বের পরিচয়।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক।।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!