যে ৫ ক্ষেত্রে মানুষের দোষ গোপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

  • আপডেট সময় সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

ইসলাম মানুষকে একে অপরের দোষত্রুটি গোপন রাখতে এবং অন্যের গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখাতে উৎসাহিত করে। তবে এই শিক্ষার পরিধি কেবল ব্যক্তিগত ভুলত্রুটি ও গোপনীয় পাপের মাঝেই সীমাবদ্ধ। কারও অন্যায় বা অপরাধ যখন অন্যের জীবন, সম্পদ, সম্মান কিংবা সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই দোষ গোপন করা আর নেক কাজ থাকে না ; বরং তা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়ার নামান্তর।

শরিয়তের দৃষ্টিতে এমন ৫টি ক্ষেত্র আছে, যেখানে অন্যায় ও দোষ গোপন করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়, নিচে তা তুলে ধরা হলো—

১. ফৌজদারি অপরাধ ও সহিংসতা

খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, বলাৎকার, শিশুকাম কিংবা সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধ কোনো ব্যক্তিগত গোপন পাপের পর্যায়ে পড়ে না। এ ধরনের অপরাধের প্রভাব সরাসরি অন্য মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানে। তাই অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য তার অপরাধ গোপন করা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ‘ নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। ’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ২)

কাজেই কেউ যদি খুন-খারাবি বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করে, তবে তাকে আইনের আওতায় না এনে তার অপরাধ গোপন করা মূলত পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করার শামিল।

২. অপরাধের সাক্ষ্য ও প্রমাণ গোপন করা

কোনো অপরাধের সত্য ঘটনা বা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নিজের জানা থাকার পরও কেবল কোনো অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য তা গোপন করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অন্যায়। এতে শুধু একজন অপরাধী আইনের ফাঁক দিয়ে রক্ষা পায় না, বরং ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয় এবং একজন মজলুম তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলার কঠোর নির্দেশ হলো—

وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ ‘ আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন কর না ; যে ব্যক্তি তা গোপন করে, নিশ্চিতভাবেই তার অন্তর পাপী। ’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২৮৩)

সুতরাং নিজের আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিত কেউ অপরাধ করলেও তার বিরুদ্ধে সত্য সাক্ষ্য গোপন করা কোনোভাবেই নেক কাজ নয়। তবে সাক্ষ্য দেয়ার ক্ষেত্রে অনুমান বা ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং সত্য ও নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতেই কথা বলতে হবে।

৩. আর্থিক প্রতারণা ও আমানত আত্মসাৎ

ব্যবসায় জালিয়াতি, পণ্যের দোষ গোপন করা, ঘুষ গ্রহণ, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ কিংবা আমানতের খেয়ানত—এগুলো কেবল ব্যক্তিগত পাপ নয় ; বরং এগুলো সরাসরি মানুষের হক ও অধিকার নষ্ট করে। তাই এমন অপরাধ জেনেও চুপ থাকা অন্যকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাজারে খাদ্যপণ্যের ভেজাল দেখার পর প্রতারণার বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন—

مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي ‘ যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। ’ (মুসলিম ১০২)

অর্থাৎ প্রতারণার দোষ গোপন রেখে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। বিশেষ করে কেউ যদি কোনো প্রতারকের সঙ্গে লেনদেন করতে চায় এবং আপনার তার অপরাধ জানা থাকে, তবে তাকে সময়মতো সতর্ক করা নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

৪. বিবাহ বা ব্যবসায়িক চুক্তিতে গুরুতর দোষ গোপন করা

কেউ যখন বিয়ে, অংশীদারি ব্যবসা কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির বিষয়ে আপনার কাছে পরামর্শ চায়, তখন তার সিদ্ধান্তকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনো গুরুতর তথ্য গোপন করা স্পষ্ট প্রতারণা। যেমন—কোনো পাত্রের মাদকাসক্তি, চরিত্রগত মারাত্মক সমস্যা, জালিয়াতির ইতিহাস বা অন্য কোনো বড় দোষ, যা জানলে অপর পক্ষ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করত।

এর সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় হজরত ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা.)-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পরামর্শ চাইলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় পাত্রদের চারিত্রিক ও আর্থিক অবস্থা তুলে ধরেছিলেন—

أَمَّا أَبُو جَهْمٍ فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ عَنْ عَاتِقِهِ، وَأَمَّا مُعَاوِيَةُ فَصُعْلُوكٌ لَا مَالَ لَهُ

‘ আবু জাহমের অবস্থা হলো— সে তার কাঁধ থেকে (মারধর করার উদ্দেশ্যে) লাঠি নামায় না। আর মুয়াবিয়া হলো নিঃস্ব, তার কোনো সম্পদ নেই। ’ (মুসলিম ১৪৮০)

এখানে ‘ লাঠি কাঁধ থেকে না নামানো ’ বলতে আবু জাহমের কঠোর স্বভাব ও স্ত্রীকে মারধর করার প্রবণতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ চাওয়ায় কোনো ব্যক্তির এমন দোষ গোপন করেননি, যা একজন নারীর জীবনকে বিপন্ন করতে পারত।

৫. মানুষের নিরাপত্তা ও সমাজের শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র

কোনো ব্যক্তির পরিকল্পনা যদি মানুষের জীবন, সম্পদ কিংবা সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তোলে, তবে তা গোপন রাখা আরও বড় সর্বনাশের কারণ হতে পারে। হামলা, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা বা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানা সত্ত্বেও নীরব থাকা অপরাধীকে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করার সমান। ইসলামে অন্যের ক্ষতি করা বা ক্ষতি হতে দেয়া দুটোই নিষিদ্ধ। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে—

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ ‘ (ইসলামে) অন্যের ক্ষতি করা জায়েজ নেই এবং প্রতিশোধ বা অন্য কোনোভাবে পারস্পরিক ক্ষতিসাধন করাও জায়েজ নয়। ’ (ইবনে মাজাহ ২৩৪০)

সংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামে দোষ গোপন করার ফাজিলত ও শিক্ষা কেবল মানুষের ব্যক্তিগত ভুলত্রুটি ও গোপনীয় ইবাদত-বন্দেগির ঘাটতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু যেখানে অন্যের জীবন, সম্পদ, সম্মান, অধিকার কিংবা বৃহত্তর সমাজের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার জড়িত হয়ে যায়, সেখানে অপরাধ গোপন করা অপরাধীকে সহযোগিতা করার নামান্তর।

তাই একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব হলো, অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়া, মজলুমের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া এবং প্রয়োজনে সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তির গোচরীভূত করা।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!