মুফতি সাইফুল ইসলাম।। ২ নভেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
মানুষের জীবনে অভাব-অনটন, বিপদ-আপদ ও নানা প্রতিকূলতা আসে। কখনো আর্থিক সংকট, কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা, আবার কখনো দীর্ঘ প্রতীক্ষা মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। এমন পরিস্থিতিতে কেউ হতাশ হয়ে পড়ে, কেউ অন্যের কাছে বারবার হাত পাতে, আবার কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।
ইসলাম মানুষকে অসহায়ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখায় না ; বরং আত্মমর্যাদা বজায় রেখে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে, যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে উৎসাহিত করে। ধৈর্য শুধু কষ্ট সহ্য করার নাম নয় ; বরং অভাবের সময় সংযম, প্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও সঠিক পথে অবিচল থাকার নাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে এমন একটি মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও ধৈর্যের মর্যাদা একসঙ্গে ফুটে ওঠেছে। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ إِنَّ نَاسًا مِنْ الأَنْصَارِ سَأَلُوا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَأَعْطَاهُمْ ثُمَّ سَأَلُوهُ فَأَعْطَاهُمْ ثُمَّ سَأَلُوهُ فَأَعْطَاهُمْ حَتَّى نَفِدَ مَا عِنْدَهُ فَقَالَ مَا يَكُونُ عِنْدِي مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ أَدَّخِرَهُ عَنْكُمْ وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللهُ وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللهُ وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنْ الصَّبْرِ
আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, কিছুসংখ্যক আনসারি সাহাবি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু চাইলে তিনি তাঁদের দিলেন। তাঁরা আবার চাইলে তিনি আবারও দিলেন। এভাবে তাঁর কাছে যা ছিল, সবই শেষ হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, “ আমার কাছে যা কিছু থাকে, তা তোমাদের না দিয়ে আমি জমা করে রাখি না। তবে যে চাওয়া থেকে বিরত থাকে, আল্লাহ তাকে সংযমী করেন ; যে অমুখাপেক্ষী হতে চায়, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করেন ; আর যে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নিয়ামত কাউকে দেয়া হয়নি। ” (বুখারি, হাদিস ১৪৬৯ ; মুসলিম, হাদিস ১০৫৩)।
হাদিসটিতে ধৈর্যের যে মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে, তা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে অভাবী সাহাবিদের সাহায্য করেছেন এবং তাঁর কাছে যা ছিল, তা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁদের আত্মমর্যাদা ও আত্মসংযমের শিক্ষা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম মানুষের প্রয়োজন পূরণকে যেমন গুরুত্ব দেয়, তেমনি অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সংযমী জীবনযাপনকেও উৎসাহিত করে। তবে প্রকৃত অভাব বা অসহায়ত্বের কারণে কারও কাছে সাহায্য চাওয়া দোষের নয়। প্রয়োজনের সময় সাহায্য গ্রহণ করা এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অযথা অন্যের ওপর নির্ভর করা এক বিষয় নয়।
—————————————————————————————————————————————–
ধৈর্যের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি মানুষকে প্রতিকূলতার মুখে ভেঙে পড়তে দেয় না। ধৈর্যশীল ব্যক্তি বিপদে হতাশ হয়ে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হন না ; বরং তাঁর ওপর ভরসা রেখে করণীয় কাজগুলো করে যান। অভাবের সময় তিনি অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের চেষ্টা করেন না, রাগের সময় সীমা লঙ্ঘন করেন না এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার সময়ও ন্যায় ও সত্যের পথ ছেড়ে দেন না। এভাবে ধৈর্য মানুষের চরিত্রকে দৃঢ় করে, বিবেককে সজাগ রাখে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থিরতা এনে দেয়।
—————————————————————————————————————————————–
পবিত্র কোরআনেও ধৈর্যের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘ নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)। এ সঙ্গ দ্বারা আল্লাহর বিশেষ সাহায্য, অনুগ্রহ ও সমর্থন বোঝানো হয়েছে।
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, “ নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান দেয়া হবে অপরিমিতভাবে।” (সুরা যুমার, ৩৯ :১০)। অর্থাৎ, ধৈর্য কেবল দুনিয়ার সংকট মোকাবিলার শক্তি নয় ; আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের প্রতিদান লাভেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তবে ধৈর্য মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া, অভাবের সময় হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা, অন্যায়ের শিকার হলে ন্যায়সংগত প্রতিকার চাওয়া এবং সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়াও ইসলামের শিক্ষা। ধৈর্য হলো এসব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর ফয়সালার ওপর আস্থা রাখা এবং ফলাফল নিয়ে অধৈর্য না হওয়া। তাই জীবনের কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি চেষ্টা, দোয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসা বজায় রাখতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস আমাদের শেখায়, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ সব সময় অর্থ-সম্পদ নয় ; বরং আত্মসংযম, আত্মমর্যাদা ও ধৈর্যের মতো চারিত্রিক গুণও অমূল্য নিয়ামত। সম্পদ হারিয়ে গেলে তা আবার অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু ধৈর্য হারিয়ে ফেললে মানুষ অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। তাই জীবনের সংকটে হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা, সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই মুমিনের কর্তব্য। কারণ, ধৈর্য মানুষকে শুধু বিপদ সহ্য করতে শেখায় না ; বরং বিপদের মধ্যেও বিশ্বাস, নৈতিকতা ও আত্মমর্যাদা অটুট রাখতে সাহায্য করে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক।।
Leave a Reply