দিশারী ডেস্ক। ৮ মে, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। এ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল সেখানকার থ্যালাসেমিয়া সেন্টারে সন্তান রোদেলাকে নিয়ে বসে আছেন মা শিখা আক্তার। ফৌজিয়া আক্তার রোদেলা মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাদের বাসা মিরপুরের কালশীতে। স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী রোদেলা। তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ বছর বয়সে রোদেলার থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। এর পর থেকে রোদেলাকে প্রতি মাসে একবার রক্ত নিতে এ হাসপাতালে আসতে হয়। শিখা আক্তার জানান, মেয়ের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য খুব কঠিন।
দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে থ্যালাসেমিয়া রোগী। দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া বাহকের হার বেশি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা অনুসারে, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩-৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫-৭, নেপালে ৪-৫, শ্রীলংকায় ২-৩ ও আফগানিস্তানে ৮-৯ শতাংশ থ্যালাসেমিয়া বাহক। অন্যদিকে বাংলাদেশে এ হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে শুধু স্বল্প জনসংখ্যার মালদ্বীপ, ১৬-১৮ শতাংশ।
বাংলাদেশের থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর ছয়-আট হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানাচ্ছে, বাংলাদেশের ১ কোটি ৮২ লাখের বেশি মানুষ থ্যালাসেমিয়া বাহক, যা মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশে বাহকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে জনসচেতনতা বাড়াতে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে এ রোগের চিকিৎসা শুরু হয় শিশু হাসপাতালে (বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট)।
এ বিষয়ে সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। কেউ বাহক হলেও একদম স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে দুজন বাহক আবদ্ধ হলে সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।’
হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হক। এতে বক্তারা অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, রোগীদের সার্বিক সুরক্ষা ও বাহক শনাক্তকরণের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধে কী কী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি তা তুলে ধরেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রোগ প্রতিরোধে দরকার জনসচেতনতা। এটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, কিন্তু সচেতনতার অভাবে প্রতিদিনই নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন, ‘ থ্যালাসেমিয়া রোগের ভয়াবহতা চিন্তা করে এটি প্রতিরোধ করা একান্ত আবশ্যক। সেজন্য জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। আমাদের দেশে এ রোগ বাহকের হার অনেক বেশি। এ রোগের চিকিৎসা খরচও অনেক বেশি। রোগীদের অন্যান্য রোগের আশঙ্কাও থাকে।’
নিয়মিত ‘ব্লাড ট্রান্সফিউশন’ বা রক্ত স্থানান্তর থ্যালাসেমিয়ার প্রধান চিকিৎসা। এ পদ্ধতিতে সাধারণত দুই-চার সপ্তাহ পরপর রোগীর দেহের রক্ত পরিবর্তন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সারা জীবন রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। চিকিৎসায় ন্যূনতম মাসিক খরচ হয় ১৩ হাজার টাকা। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে যে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করতে হয়, তাতে খরচ ১৫-১৮ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু রক্তরোগ ও ক্যান্সার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমাদের সব থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তবে এ চিকিৎসা করাতে যে টাকা খরচ হয় তা দরিদ্র জনসাধারণের জন্য কিছুটা ব্যয়বহুল। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসা শেষ করতে পারেন না। যে কারণে তারা স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারেন না। অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসা পদ্ধতি কিছুটা কঠিন। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিয়মিত রক্ত নিতে হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীর বেশির ভাগ ডায়াবেটিসে ভোগে।
অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হক বলেন, ‘ পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় মায়ের গর্ভের শিশু থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কিনা। তবে এটি পরীক্ষার যন্ত্র একমাত্র এ হাসপাতালে আছে। আর কোথাও নেই। এটি অন্যান্য জেলায়ও প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞরা বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্তকরণের ওপর জোর দেন। চিকিৎসকদের মতে, বাহককে জানতে হবে তিনি বাহক। তার এমন একজনকে বিয়ে করতে হবে, যিনি থ্যালাসেমিয়া বাহক নন। তাহলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হক বলেন, ‘বিয়েপূর্ব থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্তকরণ আমাদের দেশে অতীব জরুরি। তাহলেই দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ ও বিস্তার রোধ করা সম্ভব।’
Leave a Reply