দিশারী ডেস্ক। ১৭ মে, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা সাজ্জাদুর রহমান। বয়স মাত্র ৩৫। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল তাদের। বেসরকারি একটি এনজিওতে চাকরি করতেন।
তবে এখন অনেকটাই গৃহবন্দি জীবনযাপন করছেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে স্ট্রোক করেন। এক হাত ও এক পা অনেকটা অবশ হয়ে যায়। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। এর মধ্যে চাকরিও চলে যায়। চিকিৎসকরা জানান, অতিরিক্ত উচ্চ রক্তচাপের কারণে স্ট্রোক করেন তিনি।
উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে ও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ আপনার রক্তচাপ সঠিকভাবে পরিমাপ করুন, নিয়ন্ত্রণ করুন, দীর্ঘজীবী হোন ’।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তরুণদের মধ্যেও বিশাল একটি অংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। বংশগত কারণের পাশাপাশি অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, কম কায়িক পরিশ্রম ও স্থূলতাসহ নানা কারণে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হার বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কিত অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে অষ্টম বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে—বিডিএইচএস) সর্বশেষ গবেষণা চালায় ২০১৭-১৮ সালে। ফলাফলে দেখা যায়, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হার প্রায় ৪০ শতাংশ, যা ২০১১ সালে ছিল ২৬ শতাংশ।
পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সের নারীদের মধ্যে কমপক্ষে ৪৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। যেখানে পুরুষদের সংখ্যা ৩৪ শতাংশ। ২০১১ সালে এ সংখ্যা ছিল নারীদের ৩২ শতাংশ ও পুরুষদের ১৯ শতাংশ। জরিপে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০৪০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।
ভিন্ন দৈনিক।
ইউনাইটেড হসপিটালের চিফ কার্ডিওলজি কনসালট্যান্ট ডা. এনএএম মোমেনুজ্জামান বলেন, হাইপারটেনশনের নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায় না। বংশগতভাবে অনেকের হয়ে থাকে। তবে উচ্চ রক্তচাপ নির্দিষ্ট একটি মাত্রা অতিক্রম করলে হার্ট অ্যাটাকসহ দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকলে অন্যান্য রোগেরও ঝুঁকি বাড়ে। যেমন কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে বা স্ট্রোক করতে পারে। এজন্য কারো উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অবশ্যই তা ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এছাড়া সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ প্রাথমিক স্তর থেকেই নিরাময়ের প্রচেষ্টা করতে পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের সহকারী অধ্যাপক এটিএম হাসিবুল হাসান বলেন, উচ্চ রক্তচাপ থেকে ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে, কিডনি রোগ হতে পারে। এসব রোগীর হৃদরোগ ও অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
অল্প বয়সে উচ্চ রক্তচাপের মূল কারণ হলো জেনেটিক। অনেকের ক্ষেত্রে হরমোনাল প্রভাব থাকে। এছাড়া আমাদের যে খাদ্যাভ্যাস, আমরা অনেক রিচ ফুড খাই। এসব খাবারে অনেক পরিমাণে লবণ থাকে। এছাড়া যে মসলা আমরা ব্যবহার করি সেগুলোও প্রেসারের ঝুঁকি বাড়ায়। খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অনেকেই কায়িক পরিশ্রম করি না। এগুলোও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
রিসার্চ ইন হেলথ সার্ভিস অ্যান্ড রিজিওন্সের করা আরেকটি গবেষণায় ওঠে আসে, ২০১১ সালে দেশের শহরাঞ্চলে মোট উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশ (৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ) ছিল তরুণ।
২০১৭-১৮ সালে তা ২২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে যায়। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের তরুণদের মধ্যেও অস্বাভাবিক হারে উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে। ২০১১ সালে গ্রামাঞ্চলে মোট উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ৩৬ শতাংশ ছিল তরুণ, যা ২০১৭-১৮ সালে বেড়ে ৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ডা. মেজর (অব.) দীন মুহাম্মদ আনোয়ারুল কবীর বলেন, নগরায়ণের কারণে আমাদের হাঁটার জায়গা কমে আসছে। সময় বাঁচাতে মানুষ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে। এখন মানুষের মধ্যে কায়িক পরিশ্রম অনেক কমে গেছে। যে কারণে বর্তমান তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। নিয়ন্ত্রিত জীবনাচরণের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।
Leave a Reply