মুফতি সাইফুল ইসলাম। ১২ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
সমাজে আমরা কেউই নিখুঁত নই। ভুল আমাদের হতেই পারে, তবু আমরা চাই, কেউ যদি আমাদের ভুল ধরিয়ে দেয় তবে তা হোক স্নেহভরা, মার্জিত আর সম্মানজনক উপায়ে। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা অনেক সময় একে অন্যের দিকে নসিহতের নামে তীর ছুড়ি, যা অনেক সময় হয় অহংকার, হিংসা বা ক্ষোভের মুখোশ পরা সমালোচনা।
ইসলাম এক পরিপূর্ণ জীবনদর্শন। যেখানে এ বিষয়ে কতই না সূক্ষ্মতা, ভারসাম্য ও আদব আমাদের শিখানো হয়েছে। অন্যের ভুল ধরিয়ে দেয়া, উপদেশ দেয়া কিংবা সমালোচনা করা—এসব যেন হয় আলোর মতো, যা গরম করে না, কেবল আলোকিত করে।
আল্লাহর নির্দেশ : কথা যেন হয় উত্তম।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে বলেন, وَ قُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا
‘ তোমরা মানুষের সঙ্গে সুন্দর কথা বলো। ’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ৮৩)
অন্য আয়াতে বলেন, قُلۡ لِّعِبَادِیۡ یَقُوۡلُوا الَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ ؕ
‘ বান্দাদের বলে দাও, যেন তারা সে কথাই বলে, যা সর্বোত্তম। ’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ৫৩)
এ দুটি আয়াত সমালোচনার ভাষা নির্ধারণে মুসলিমদের জন্য সংবিধানস্বরূপ। সমালোচনা যদি হয় হঠকারিতা কিংবা মনোবিদ্বেষের সঙ্গে, তবে তা হবে সেই শয়তানি ফাঁদ, যা সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাই তো মহান আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন,
اِنَّ الشَّیۡطٰنَ یَنۡزَغُ بَیۡنَهُمۡ ؕ
‘ নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে ফাঁস লাগিয়ে দেয়। ’ (সুরা : আল ইসরা, আয়াত : ৫৩)
সমালোচনায় কোমলতা ও সৌজন্য নববী শিক্ষা
মহানবী (সা.) বলেন,
«الدِّينُ النَّصِيحَةُ»
‘দ্বিন তো উপদেশ।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৫)
এখানে উপদেশের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হলেও তা হতে হবে শরিয়তের বাতলে দেওয়া আদব অনুযায়ী। আর তা কিভাবে? সে ব্যাপারে মহানবী (সা.) বলেন,
«خَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ»
‘মানুষের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৭)
অতএব, শরিয়তের আদব অনুযায়ী সমালোচনা মানে, তাতে থাকবে ভালোবাসা, পরামর্শ ও ভ্রাতৃত্ব ; থাকবে না বিদ্রুপ, অপমান বা তাচ্ছিল্য।
সমালোচনা ও গিবতের পার্থক্য
সমালোচনা যেন গিবত না হয় ; এই সতর্কতা ইসলাম বারবার উচ্চারণ করেছে।
রাসুল (সা.) একবার সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তোমরা জানো গিবত কী ? ’ সাহাবারা বললেন, ‘ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ তিনি বললেন, ‘তোমার ভাইয়ের এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে। ’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)
তাহলে প্রশ্ন জাগে, একজনের ভুল বলা মানেই কি গিবত ? না, বরং এ ক্ষেত্রে ইমাম নববী (রহ.) যেসব ক্ষেত্রে সমালোচনা বৈধ তার একটি রূপরেখা দিয়েছেন। সেটি হচ্ছে—(১) বিচারকের কাছে অভিযোগ করা। (২) ফতোয়া নেওয়ার জন্য পরিস্থিতি বর্ণনা করা। (৩) অন্যায় থেকে কাউকে সাবধান করা। (৪) জনসচেতনতায় অপকারীকে চিহ্নিত করা। (৫) কারো স্পষ্ট গুনাহ বা ফাসিকতা প্রকাশিত হলে তা বলা। (৬) নিজের ও অন্যের অধিকার রক্ষায় ন্যায্য সমালোচনা।
উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে অন্যের অনুপস্থিতিতেও তার ভুলের বিবরণ দেয়া যাবে। তবে সব ক্ষেত্রেই চাই হিকমাহ, চাই ভাষার মার্জিত ব্যবহার।
সমালোচনায় আন্তরিক অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের সমালোচনার অন্তর যদি হয় ‘ আমি শ্রেষ্ঠ ’, ‘ আমিই ঠিক’ কিংবা ‘ ওকে ছোট করে আমি বড় হব ’ তাহলে সেটা দম্ভ, যেটা শয়তানি বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু যদি অন্তরে থাকে ‘ আমি তার মঙ্গল চাই ’, ‘ সে যেন ভালো পথে আসে’ তাহলে সেই সমালোচনা হয়ে ওঠে উপদেশ, হয়ে ওঠে ‘ রহমতের ভাষা ’।
তাই আসুন, আমরা মুখ খুলি নসিহতের জন্য, হৃদয় খুলে দিই ভালোবাসার জন্য, আর রূঢ় সমালোচনা থেকে বিরত থাকি মানুষের সম্মান রক্ষার জন্য।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।
Leave a Reply