দিশারী ডেস্ক। ১৪ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
নোয়াখালী সোনাইমুড়ীর আলোচিত মানিক খোনারের অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে ফুঁসিয়ে ওঠছেন সাধারণ মানুষ। একসময়ের সৌদি প্রবাসী মো. আব্দুল মালেক প্রকাশ মানিক প্রবাস জীবন ছেড়ে ২০১৬ সাল হতে মানিক খোনার পরিচয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলার নদনা ইউনিয়নের হাঁটগাঁও গ্রামে চিকিৎসক না হয়েও শুরু করেন হাতুড়ে চিকিৎসা ও খোনারী ব্যবসা।
২ নম্বর ওয়ার্ডের হাঁটগাঁও গ্রামের আব্দুল গফুর পাটোয়ারী বাড়ির প্রবেশ মুখে মৃত মোজাফফর মিয়ার পুত্র মানিক খোনার। বিগত ৯ বছর হতে ক্যান্সার, ডায়াবেটিক, পলিপাস, সংসারে অমিল, বিয়ে না হওয়া, আপোষসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল ও কঠিন রোগে সারিয়ে দেয়ার আশ্বাসে প্রতারণার মাধ্যমে সোনাইমুড়ী উপজেলাসহ দুরদুরান্তের বিভিন্ন জেলার সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অঙ্কের অর্থ।
সরেজমিনে জানা গেছে, প্রতিদিন ভোর হতে মাগরিবের নামাজের আগমুহূর্ত পর্যন্ত ৪০০ হতে ৫০০ রোগীর কথিত চিকিৎসা দিচ্ছেন তিনি। পলিপাস রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন নাকের ভেতরে আম পাতা গোল করে। এ সময় চিকিৎসার নামে পলিপাসের মাংস পিণ্ডকে আঘাতের মাধ্যমে ক্ষত-বিক্ষত করে রক্তক্ষরণ করতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা জানান, অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের কারণে প্রায়ই মাথা চক্কর দিয়ে বেহুশ হয়েছেন অনেকেই। এদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে অন্যত্র নিয়েছেন তার অপচিকিৎসার চিকিৎসা সেবা।
মানিক খোনারের এ কার্যক্রমটি চলমান একটি ছোটখাটো স্কুল ভবনের মত ঘরে। রোগীরা বসার জন্য রয়েছে শতাধিক বেঞ্চ। রোগীদেরকে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস এর মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন কার কি লাগবে। রয়েছে তার পরিচালিত বিভিন্ন উপকরণ বিক্রির একটি দোকান। যেখান থেকে হোয়াটসঅ্যাপে উল্লেখিত সামগ্রী রোগীরা কিনে নিচ্ছেন নগদ টাকায়। এ দোকানটি পরিচালিত হচ্ছে তারই লোকের মাধ্যমে। আগত রোগীরা বিভিন্ন মূল্যে কিনে নিচ্ছেন এ উপকরণগুলো। রোগী দেখার সময় নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। যে সমস্ত রোগীর বড় ধরনের সমস্যা, তাদেরকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তার জেলা শহর মাইজদীর বাসায়।
স্থানীয়রা আরো জানান, এই অপচিকিৎসা পদ্ধতিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গড়ে তুলেছেন এলাকায় একটি মাদ্রাসা। বিভিন্ন মহলে প্রচার করেন, তিনি এই রোজগার দিয়ে ইসলামের খেদমত করেন। অথচ ওই মাদ্রাসা সংলগ্ন রয়েছে আগে থেকেই আরেকটি মাদ্রাসা। তিনি ওই মাদ্রাসাটিকে নিজের অর্থায়নে পরিচালনার কথা বললে এলাকাবাসী তাতে রাজি হননি। তারা মনে করেন, এটি তার নিজের ধান্দাবাজি ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে করা হয়েছে। যার সব খরচ তিনি নিজেই বহন করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, মানিক খোনারের বাড়ির আশ-পাশের লোকজনের মাধ্যমে জানা যায়, নুন আনতে পান্তা পুরানো মানিক আগে বসবাস করতেন নিজের গ্রামের বাড়িতে। খোনারী ব্যবসা শুরু করার পর হতে তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। পরিবার নিয়ে বসবাস করেন জেলা শহর মাইজদীতে। এলাকায় নামে বেনামে রয়েছে তার ৬ একরের অধিক সম্পত্তি। নোয়াখালী জেলা শহরে নিয়েছেন ফ্ল্যাট।
তার এই ধাণ্ধাবাজী ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এলাকায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব একটি বাহিনী। কখনো কেউ তার এই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কথা বললে এদের দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যবসাটি। এলাকাবাসী অতীতে বিভিন্ন সময় তার এহেন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হন।
এর আগে মানিক খোনারের সংঘটিত অন্যায়, অনয়িমের বিষয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর, সোনাইমুড়ী উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা টিনা পাল মানিক খোনারের আস্তানায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে নগদ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও মুসলেকা আদায় করেন।
সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা রহিমা বেগমও তার আখড়ায় গিয়ে তার এই অপচিকিৎসা ও কবিরাজী খোনকারী বন্ধ করার বিষয়ে সাবধান করেন এবং বলেন ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম চালু রাখলে তাকে আইনের আশ্রয়ে নেয়া হবে। এরপর কিছুদিন বন্ধ রাখার পর, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগিতায় আবার কার্যক্রম শুরু করেন। এক পর্যায়ে, সোনাইমুড়ীর নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ফয়সাল আবারো তাকে সতর্ক করে আসেন। তাতেও তিনি কর্ণপাত না করে তার অবৈধ কার্যক্রম চালিয়েছিলেন।
গত ৩ জানুয়ারি ২০১৭ সালে সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল তাকে গ্রেফতার করেন। গাড়িতে ওঠানোর পর তার অনুগত বাহিনী নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি ভাঙচুর করে এবং মানিক খোনারকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় তারা বোমা ফাটিয়ে তাণ্ডব সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে না পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে তার এহেন কাজের সহযোগী মেয়ে মিম ও মিলন নামক (২) দু’জনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। মিলনকে তিন মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন। একইসঙ্গে তাদের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দেন।
এ বিষয়ে প্রতিবাদের জের হিসেবে তার পালিত বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজ বাড়ির এক লোক নোয়াখালী কোর্টে ৫ জানুয়ারি ২০১৭ সালে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।তার সন্ত্রাসী বাহিনীর হুমকিতে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ মো. গোলাম ফারুক বাদী হয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন।
গত ২০ এপ্রিল ২০১৭ সালে মো. আবু সাঈদ বাদী হয়ে মানিক খোনার এবং তার সন্ত্রাসী বাহিনীর হাত হতে প্রতিকারের জন্য সোনাইমুড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন। মাননীয় হাইকোর্ট সর্বশেষ এক আদেশে মো. আব্দুল মালেক ওরফে মানিক খোনারের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা প্রদান করেন।
তৎকালীন সোনাইমুড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল মাননীয় হাইকোর্টের নির্দেশনায় মানিক খোনারের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন। যাতে সে সময়ের সোনাইমুড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহামান্য হাইকোর্টের আদেশের জবাবও প্রেরণ করেছেন।
মানিক খোনারের চিকিৎসা পদ্ধতি ও খোনারী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি কুমিল্লা থেকে চিকিৎসা বিষয়ে ট্রেনিং এবং লাইসেন্স নিয়েছি। নাকের পলিপাসের চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটা আমার কুমিল্লার ইনস্টিটিউট থেকে শেখা চিকিৎসা পদ্ধতি। তার কাছে হাইকোর্টের ইতোপূর্বের সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তখন আমার লাইসেন্স ছিল না, এজন্য হাইকোর্ট আমাকে আমার কার্যক্রম নিষিদ্ধের নির্দেশনা দেয়। বর্তমানে আমার লাইসেন্স রয়েছে, যা বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত।
মানিক খোনারের বিষয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মানিক খোনারের দ্বারা কার কি ক্ষতি হচ্ছে আমার জানা নেই। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও তিনি অবগত রয়েছেন বলে দাবি করে একপর্যায়ে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
Leave a Reply