ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
২৮ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
পৃথিবীতে সব মানুষই একটি নির্দিষ্ট সময় নিয়ে আগমন করে। সময় শেষ হয়ে গেলেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। তবে কিছু মৃত্যু আছে যেটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় সংঘটিত হয়। এটি কারো কাম্য নয়।
বরং সব মানুষের জন্য স্বাভাবিক মৃত্যু হোক—এটিই কাম্য। তার পরও জীবনের বাঁকে বাঁকে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে যায়। আসলে নিজস্ব শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে এসব থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ রক্ষা করলেই শুধু রক্ষা পাওয়া সম্ভব। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি ও মহান আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তা লাভের জন্য বেশ কিছু আমল রয়েছে।
আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা : মহান আল্লাহই শান্তিদাতা। তিনি কারো শান্তি, নিরাপত্তা, সুস্থতা ও কল্যাণ কামনা করলে কোনো শক্তি তা প্রতিহত করতে পারে না। কাজেই শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ আল্লাহর কাছেই কামনা করতে হবে।
সুখে ও দুঃখে তাঁকেই স্মরণ করতে হবে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ আজান ও ইকামাতের মধ্যে দোয়া কবুল হয়। ’ তিনি (আনাস) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল ! তাহলে আমরা কী কামনা করব ? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ তোমরা আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা কামনা করো। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ৫৩৯৪)
অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে মুক্তির দোয়া : প্রতিদিনের জীবনে অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় অথবা আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। এসব থেকে বাঁচতে যথাসাধ্য সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে বিশেষ প্রার্থনা করা উচিত।
—————————————————————————————————-
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন। যেমন—একটি দোয়া হলো ‘ আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাদমি ওয়া আউজুবিকা মিনাত তারাদ্দি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল গারাকি ওয়াল হারাকি ওয়াল হারামি, ওয়া আউজুবিকা আইয়াতাখব্বাতানিশ শায়তানু ইনদাল মাওতি, ওয়া আউজুবিকা আন আমুতা ফি সাবিলিকা মুদবিরান ওয়া আউজুবিকা আন আমুতা লাদিগান। ’
—————————————————————————————————-
অর্থ : হে আল্লাহ ! আমি আপনার কাছে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ থেকে আশ্রয় চাই, আশ্রয় চাই গহ্বরে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ থেকে, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ থেকে এবং অতি বার্ধক্য থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই মৃত্যুকালে শয়তানের প্রভাব থেকে, আমি আশ্রয় চাই আপনার পথে জিহাদ থেকে পলায়নপর অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা থেকে এবং আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মৃত্যুবরণ থেকে। ’ আবুল ইয়াসার (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরূপ দোয়া করতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৫২, নাসাঈ, হাদিস : ৫৫৪৬)
ফজরের নামাজ আদায় করা : দিনের শুরুর প্রথম নামাজ ফজর। এ নামাজের মাধ্যমে দিন শুরু করতে পারলে দিনব্যাপী মহান আল্লাহর নিরাপত্তা পাওয়া যায়।
আনাস ইবনু সিরিন (রহ.) বলেন, আমি জুনদুব (ইবনু আবদুল্লাহ) আল কাসরিকে বলতে শুনেছি যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করল সে আল্লাহর জিম্মায় চলে গেল। আর আল্লাহ তাআলা যদি তার নিরাপত্তা প্রদানের হক কারো থেকে দাবি করে বসেন, তাহলে সে আর রক্ষা পাবে না। তাই তাকে মুখ থুবড়ে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৫৭)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘ আল্লাহর জিম্মায় চলে যাওয়ার অর্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে থাকা।
দিনের শুরুতে সুরা ইয়াসিন পাঠ করা : সুরা ইয়াসিনের বহু ফজিলত হাদিসে বর্ণিত আছে। এসবের একটি হলো—দিনের শুরুতে এই সুরা পাঠ করলে সারা দিনের স্বস্তি ও নিরাপত্তা লাভ হয়। আতা ইবন আবি রাবাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শুনেছি যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ যে ব্যক্তি দিনের বেলায় সুরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করবে, তার সব হাজত পূর্ণ করা হবে। ’ (সুনানে দারেমি : ৩৪৬১)
ইয়াহইয়া ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি সকালে সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুখে-স্বস্তিতে থাকবে। যে সন্ধ্যায় পাঠ করবে সে সকাল পর্যন্ত শান্তিতে থাকবে (মাজহারি)
ইশরাক নামাজ আদায় করা : ইশরাক হলো—সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর চার রাকাত নামাজ আদায় করা। এই নামাজে হজ ও ওমরার নেকি হওয়ার পাশাপাশি দিনের শুরুতে আল্লাহর রহমত ও বরকত নিয়ে আসে। ফলে দিনজুড়ে স্বস্তি ও নিরাপত্তা লাভ হয়।
—————————————————————————————————-
আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ যে ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করে, এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহকে স্মরণ করে তারপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তার জন্য রয়েছে একটি হজ ও একটি ওমরাহর সওয়াব। আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) তিনবার বলেছেন, পূর্ণ হজ ও ওমরার সওয়াব, পূর্ণ হজ ও ওমরার সওয়াব, পূর্ণ হজ ও ওমরাহর সওয়াব। (তিরমিজি, হাদিস : ৫৮৬)
–—————————————————————————————————-
আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদম সন্তান ! দিনের শুরুতে চার রাকাত নামাজ আদায়ে অক্ষমতা প্রকাশ কোরো না। আমি তোমার সারা দিনের সব কাজ সুসম্পন্ন করে দেব। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৭৫২০)
সালাম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করা : কেউ সালাম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলে সে আল্লাহর জিম্মাদারিতে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করে। আল্লাহর জিম্মাদারির অর্থ হলো আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন।
আবু উমামাহ আলবাহিলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ আল্লাহর জিম্মাদারি তিন ব্যক্তির জন্য। তাঁরা হলেন—(১) যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধে বের হয়েছে, সে আল্লাহর জিম্মাদারিতে রয়েছে যে পর্যন্ত আল্লাহ তাকে উঠিয়ে না নেন এবং জান্নাতে প্রবেশ না করান। অথবা তাকে ফিরিয়ে আনেন, যে সওয়াব বা যে গনিমতের মাল সে যুদ্ধে লাভ করেছে তার সঙ্গে। (২) যে ব্যক্তি মসজিদে গমন করেছে সে আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। (৩) যে ব্যক্তি সালাম দিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করেছে, সে আল্লাহর জিম্মাদারিতে রয়েছে। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৯৪)
ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও বাহন পরিহার করা : ঝুঁকিপূর্ণ বাহন, অরক্ষিত এলাকা এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে হবে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সাগরে ভ্রমণ করতে নিরুৎসাহ করেছেন এবং উত্তাল সাগরে ভ্রমণ করতে বারণ করেছেন।
আবু ইমরান আল-জাওনি (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক সাহাবি বলেন, আমরা পারস্য অভিমুখে যুদ্ধ করেছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ যে ব্যক্তি চারদিক ঘেরা নেই এমন ছাদে রাত যাপন করা অবস্থায় নিচে পড়ে মারা গেলে কারোর ওপর তার কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না। তেমনি যে ব্যক্তি উত্তাল সাগরে ভ্রমণ করে মারা গেল, কারোর ওপর তারও কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২০৭৪৮)
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
Leave a Reply