সাহসী মানুষের রক্তের প্রতি যেন না হয় বিশ্বাসঘাতকতা ?

  • আপডেট সময় বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫
  • ৯৮ পাঠক

১ ) হাসপাতালে বিছানায় দীর্ঘ একটি বছর পড়ে থাকা পা, হাত, চোখ হারানো আহতরা বলছিলেন, এখন আর এমন জীবন না থাকাই ভালো। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন দেখে গেছেন এটাই বড় শান্তনা। তাদের কি বলে দেবেন শান্তনা !

২)  মিরপুরে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বাবা। সন্তানের জন্যে দুধ কিনে বাসায় ফিরবেন। পথেই পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সন্তানের জন্যে দুধ নিয়ে তার আর বাসায় ফেরা হলোনা। এর আগে বাড়িতে মাকে ফোনে বলেছিলেন, আর ক’দিন অপেক্ষা কর। চাকুরিটা হলে দারিদ্রতা আর থাকবেনা। ৪ বছরের আহাদ ঘরের বারান্দায় খেলছিল। হঠাৎ একটা গুলি এসে কি যে হয়ে গেলো ! কে দেবে  এমন বেদনার শান্তনা !

৩ ) সেদিন যারা নীরব ছিলেন, তাদের কেউ-কেউ এখন স্বৈরাচারের পক্ষে সরব। নামে-বেনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ব্যস্ত উপস্থিতি। জুলাই বিপ্লবকে একটি পরিকল্পিত চক্রান্ত প্রমাণে তাদের চেষ্টার অন্ত নেই।

আমেরিকার ‘ডিপ স্টেট’ কীভাবে এই অভ্যুত্থানের আসল চালিকা শক্তি, সে কথা প্রমাণের জন্য বিদেশে বসে এক বাক্‌বুদ্ধিজীবী আস্ত একখানা বই লিখে ফেলেছেন। জুলাইয়ের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যু পুলিশের হাতে নয়, বিক্ষোভকারীদের হাতে হয়েছে, অথবা মুগ্ধ, বিক্ষোভকারীদের পানি দিতে গিয়ে খুন হওয়া যুবক, আসলে মরেনি, সে ফ্রান্সে আছে, এসব গুজব তারাই ছড়িয়েছেন। কেন, তা বোঝাও কঠিন নয়।

৪) জুলাই-আগস্ট বিপ্লব শুধু শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নয়, যারা সে স্বৈরশাসনকে মদদ যুগিয়েছেন এবং যারা ফায়দা নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও। যারা এখন সে বিপ্লবের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তারা প্রায় সবাই এই ফায়দা লোটা ব্যক্তিদের অন্তর্গত।

৫) অন্যদিকে বিপুল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে যারা সেদিন রাস্তায় নেমেছিল, তারা এই সময়ের সেরা নায়ক—এ কথায় কোনো সন্দেহ নেই। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা যুবকদের ভয় দেখিয়ে বশে আনার চেষ্টা কম হয়নি। তারা মাথা নোয়ায়নি। আমরা আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত দেখেছি।

টেলিভিশনের পর্দায় আমরা দেখেছি, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বলছে, ‘ চালাও গুলি, আমরা রাস্তা থেকে হটব না।’ কিংবা ‌‍’ কে এসেছে! কে এসেছে ! ‘ তাদের সে কথা শুনে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর বলা একটা কথা মনে পড়ছে, আমরা যখন মরতে শিখেছি, আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। হাসিনা তার শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে তাকে। সঙ্গে নিয়ে গেছেন নিজের পারিষদবর্গ।

৬ ) প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ—কোনোটাই খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য কখনো কখনো চরম মূল্য দিতে হয়। চলতি সপ্তাহে আল-জাজিরায় পরিবেশিত একটি প্রতিবেদনে আমরা ১৭ বছরের কিশোরী নাফিসার কথা শুনেছি। ৫ আগস্ট, যেদিন হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান, লাখো মানুষের সঙ্গে সে–ও ছিল বিদ্রোহের মিছিলে। মিছিল থেকেই ফোনে সে বাবাকে বলেছিল, লড়াই শেষ না করে সে মাঠ ছাড়বে না। এ কথা বলার সামান্য পরই পুলিশের গুলিতে আহত হয় নাফিসা। রক্তাক্ত অবস্থায় বাবাকে জানায়, ‘ বাবা, আমার আর ফেরা হবে না। আমার লাশটা তুমি নিয়ে যেয়ো।’

৭)  জানা-অজানা এসব ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ জনতার রক্তের আগুন থেকেই জন্ম নিয়েছিল জুলাই বিপ্লব। তাঁদের এই আত্মত্যাগ যাতে ব্যর্থ না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীরা এখনো তৎপর। এই সময় নীরব থাকার অর্থ হবে নাফিসা ও তার মতো সাহসী মানুষের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!