আকাশ মো. জসিম ।। ২ অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।
নোয়াখালী সদরের ধর্মপুরের একসময়ের পেশাদার কৃষক আবু তাহের (৬৫) জানান, গত দু’যুগ আগে চাষাবাদ করতে বেশ ভাল লাগতো। গত ক’বছর ধরে সামান্য বৃষ্টি হলে পানিতে ডুকে ফসলাদী নষ্ট হয়ে ব্যাপক ক্ষতি গুণতে হয়। বিগত বছরগুলোয় এমন লোকসানের কবলে এখন চাষাবাদ প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন বলে জানান তিনি। বললেন, বর্তমানে তাঁর পরিবারে এক ভাই ও তিন পুত্র মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছেন। তাদের পাঠানো আয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ সুখ, শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যেই দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
একই এলাকার মরহুম হাজী মোশারফ মিয়ার চার পুত্রের তিনজনও প্রবাসে। তারাও প্রবাসের আয়ে দেশে প্রয়োজনীয় সহায় সম্পদের মালিক হয়েছেন। সদরের ধর্মপুর এলাকায় গত ক’বছরের ব্যবধানে প্রায় শতাধিক যুবক মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী হয়েছেন। তাদের পথ ধরে বেকার ও নিম্মআয়ের অনেকেই প্রবাসে কর্মসংস্থানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই সেসব দেশে নিজেই ব্যবসা বাণিজ্যেও প্রসারতা বাড়াচ্ছেন।
ইউরোপে থাকেন এমন পরিবারের এক সদস্য বলেন, নোয়াখালীর প্রায় এলাকায় বসত ঘরের যে স্থাপত্য শৈল্পিকতা আর নান্দনিকতা , সেসব পরিবারের কোন না কোন সদস্য রয়েছেন প্রবাসে। তাদের পাঠানো মূদ্রায় সৌন্দর্য্য আর স্থাপত্য বিদ্যায় চিত্তাকর্ষক হচ্ছে নোয়াখালীর বসত বাড়ির আঙ্গিনা।
নানা সমস্যা ও সংকটের প্রকটে কৃষি ভান্ডার খ্যাত নোয়াখালী ক্রমেই কৃষিখ্যাতি হারিয়ে চলছে। এক সময় প্রায় জমিতে তিন ফসলা ফলনোর ইতিহাস ছিল নোয়াখালীর কৃষকের জীবনে। হালে অনেক জমিতে এক ফসলা ফলনও হয়না বললে চলে।
গত বছর ধরে দেখা গেছে, জেলার সুবর্ণচরের যে জমিতে প্রচুর পরিমাণ রবি শস্য হতো , তাও এখন প্রায় অনাবাদী হয়ে পড়ে থাকে। বর্ষা কিংবা শীত মৌসুমে কোন ফসল ফলানোরই উৎস নেই কোন কৃষকের মনে।
অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও এসব জমিতে উৎপাদিত হতো বিভিন্ন জাতের ফসল। নোয়াখালী কৃষি অধিদপ্তরের ডায়রীতে নোয়াখালীতে হালে আবাদী জমির সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও কয়েক হাজার হেক্টর জমি কৃষির আওতায় বলা যায়। যা হয়তোবা এখন অনাবাদী জমির হিসেবের খাতায়।
নোয়াখালীর কৃষি ক্রমেই ঐতিহ্য হারানোর পেছনের রয়েছে সরকারীভাবে বিভিন্ন জাতীয় প্রণোধনার অভাবও। সমস্যাঘন জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সমাধানের সংকুলান করতে ব্যর্থ হয়ে কৃষকেরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষি থেকে।
জানা যায়, কৃষি নির্ভরতা হারানোর পেছনে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা ও খরা, জলবায়ুু পরিবর্তনের প্রভাব, সেচের অভাব, কৃষিজমি ও উর্বর মাটি নষ্ট করা, দূষণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন। নেই সেচ ব্যবস্থার কোন বাস্তবতা। ফলে সেচ প্রকল্পের অভাবে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। যাতে কৃষক ভাগ্যাহত হয়ে থাকে।
আবার জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় কৃষিজাত পণ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে প্রাকৃতিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এখন আর কৃষি ব্যবস্থায় আস্থা নেই কৃষকের। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার খালগুলোর সংস্কার কার্যক্রম নেই। বরং প্রায় খালই দোকান-পাট, ঘর-বাড়ি ও মাছের ঘেরের কবলে প্রকাশ্য দখল করে নিয়েছে একশ্রেণীর দুবৃর্ত্তরা। যে কারণে এখানকার প্রায় খালই এখন কৃষি জমি বিরানের জন্যে একেকটি জলাবদ্ধতার আঁধারে পরিণত হয়েছে।
কৃষি ছাড়া নোয়াখালীতে নেই কোন সরকারী শিল্প কল-কারাখানার বিস্তৃতি। ব্যক্তি উদ্যোগে যেসব কল-কারাখানা গড়ে ওঠেছে তাও প্রায় ক্ষয়প্রান্তে। ইতোমধ্যে সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার সদর উপজেলার অশ্বদিয়া ও বেগমগঞ্জ বিসিক নামীয় এলাকায় গড়ে ওঠা ব্যক্তি উদ্যোগের শিল্প কারখানাগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে গেছে। হাতেগোনা দু’চারটি যা চলছে তারও বাতি প্রায় নিভু নিভু। এর পেছনে নানা কারণকেই দোষছেন তারা।
তারা বলছেন, অগ্নিকান্ডের মতো ঘটনায় শিল্প কারখানায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং শত-শত কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়, যা এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের জন্য একটি বড় বাধা। এতে সরকারীভাবে কোন শিল্প কারখানার নিরাপত্তা যথেষ্ট নয়।
অন্যদিকে, পর্যাপ্ত গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। যা উৎপাদন ও শিল্পায়নের গতিকে কমিয়ে দেয়। তাছাড়া, এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও বানিজ্য প্রসারের জন্যে সহায়ক নয়। আয়ের সাথে ব্যয়ের মিল নেই। সে কারণে নোয়াখালী শহর এলাকায় গড়ে ওঠা আল আমিন বিস্কুট একসময় দেশ পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানী হওয়ার ইতিহাস থাকলেও গত এক যুগ ধরে তাও বন্ধ হয়ে রয়েছে।
অপরদিকে, নোয়াখালীর বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্প মালিকেরা ঢাকা, চট্রগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের শিল্প কারখানা গড়ে তুললেও নোয়াখালীর প্রতি তাদেরও রয়েছে চরম অনীহা। একমাত্র গ্লোব শিল্প প্রতিষ্ঠান জেলার বেগমগঞ্জ এলাকায় গড়ে তুলছেন এর ব্যবস্থাপনাা পরিচালক মামুনুর রশিদ কিরন। তবে তাও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে অনেক টাকায় ঋণে আবদ্ধ বলে জানা গেছে।
জেলা সদরে নির্বাচনের আগে বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান দুটি ছোটোখাটো গার্মেণ্টস কারখানা কিছুদিন খোলা রাখলেও, তিনি নির্বাচনের পর লোকসানের অজুহাতে তাও বন্ধ করে দেন। যাতে বেকার হয়ে পড়েছিলেন শত-শত মানুষ। তবে জেলার শিল্প কারখানার বিকাশে এখানকার উদ্যোক্তাদের উদাসিনতাকেও দায়ী করছেন সচেতন নাগরিকেরা। তারা জেলার শিল্প কারখানার বিকাশে মানসিকভাবে উদার না হওয়ায় এ জেলায় পর্যাপ্ত শ্রমবল থাকার পরেও এ শিল্প কারখানার উন্মেষ হচ্ছেনা বলে মনে করছেন তারা।
এমতাবস্থায় এখানকার প্রায় মানুষ কর্মসংস্থানের সহায়ক পন্থা হিসেবে প্রবাস জীবনের ওপর ভর করছেন। একটি বেসরকারী সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমানে নোয়াখালীতে প্রায় তিন লাখ মানুষ প্রবাসী জীবনে রয়েছে। নোয়াখালীর বেশির ভাগ প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্য এবং মালেয়শিয়ায় রয়েছেন বলে সূত্র জানায়।
জানা গেছে, গত বছরের জুলাইয়ের পর এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০৭ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন তারা। যা নোয়াখালীকে একটি বেকারমুক্ত ও সমৃদ্ধময় জেলায় পরিণত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
Leave a Reply