দিশারী ডেস্ক।। ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।
একজন আইনজীবি মশিউর রহমান রাহাত বলেন, যে কোন মহৌষধই আবিষ্কার হয়েছে , কোন না কোন একটি সুনির্দিষ্ট রোগের নিরাময়ের নিমিত্তে। এটি সাধারণত রোগ হলেই ওষুধ আকারে দেহে সংবরণের কথা। কিন্তু, যে বা যিনি এমন রোগে আক্রান্ত হননি, তাঁকে দেয়ার দরকার কি ? আদৌ এটি হিতে বিপরীত হয় কিনা , এ নিয়ে নিয়মিত গবেষণার দরকার রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
দেশজুড়ে চলছে শিশুদের টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচি। ১২ অক্টোবর শুরু হয়ে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ শিশুকে টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) দেয়া হয়েছে। যা চলবে আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি মোট চার কোটি ৯০ লাখ শিশু এ কর্মসূচির আওতায় আসবে। সরকার বলছে, এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত ও নিরাপদ টিকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী টিকার ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা ডেটা ও লং টার্ম কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশ-বিদেশের একদল গবেষক।
টিকা শুরু, এরপরই বিতর্ক
গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর সিরডাপে আনুষ্ঠানিকভাবে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরীক্ষিত ও অনুমোদিত এ টিকা নিরাপদ এবং কার্যকর। বাংলাদেশে এটি পরীক্ষামূলকভাবে দেয়া হচ্ছে না। এতে শরিয়তনিষিদ্ধ কোনো উপকরণও নেই। টিকাটির সৌদি হালাল সেন্টারের সার্টিফিকেট আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নেয়ার আহ্বান জানান।
টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), যার সহায়তায় রয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), গ্যাভি–দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দেশে এই টিকা দেয়া হলেও বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। দেশে টাইফয়েড কমাতে এটি অপরিহার্য।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া এ আশ্বাসের বিপরীতে একদল গবেষক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন।
গবেষকদের দাবি যথেষ্ট ডেটা ছাড়াই গণটিকায় অন্তর্ভুক্ত
নেদারল্যান্ডসে কর্মরত বিজ্ঞানী ড. রেজাউল করিম (ইমিউনোলজিস্ট হিসেবে বায়োলজিক্স ও টিকা ডেভেলপমেন্ট এবং ইভ্যালুয়েশন বিশেষজ্ঞ), ড. জুবায়ের রহমান (যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ইমিউনোলজিস্ট) ও ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন (সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার, আরএনডি ; বায়োটেক ডিভিশন, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল) এক যৌথ বিশ্লেষণে বলেছেন, বাংলাদেশের শিশুদের দেয়া টিকা, টাইফিবেভ-এর শর্ট টার্ম ও লং টার্ম ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা এবং লং টার্ম নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এটা এক ধরনের টিসিভি টিকা (টাইফয়েড কনজুগেটেড ভ্যাকসিন), যার উৎপাদনকারী কোম্পানি হচ্ছে বায়োলজিক্যাল ই লিমিটেড (ভারতের হায়দরাবাদে অবস্থিত)।
খবর : ভিন্ন দৈনিক।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে ভারত বায়োটেক কোম্পানিতে উৎপাদিত একটি টিকার (টাইপবার টিসিভি) ট্রায়াল হয়েছিল, যার কার্যকারিতা ভালো ছিল । কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এ টিভিসি টিকার পর্যাপ্ত ডেটা সত্ত্বেও বর্তমানে দেশের পাঁচ কোটি শিশুর অন্য একটি টিসিভি টিকা (টাইফিবেভ) দেয়া হচ্ছে, যার ক্লিনিক্যাল এফিকেসি ডেটা নেই এবং লং টার্ম সেফটি ডেটা নেই। মনে রাখতে হবে, সব টিসিভি টিকা কিন্তু একরকম নয়।
টাইপবার টিসিভি ও টাইফিবেভের মধ্যে কেরিয়ার প্রোটিন, ভি পলিস্যাকারাইড সোর্স, লিংকার কেমিস্ট্রি, এক্সিপিয়েন্ট ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার একরকম নয়। এছাড়া টাইপবার টিসিভি ও টাইফিবেভের ম্যানুফেকচারিং প্রসেসের মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এটি টিকার কোয়ালিটির মধ্যে বড় পার্থক্য এনে দেবে। এসব কারণেই জেনেরিকের মতো কপি ভ্যাকসিন তৈরি করা খুবই কঠিন কাজ।
তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টাইফিবেভের কোনো সরাসরি ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতার ডেটা এখনো প্রকাশিত হয়নি। বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত টিকার ক্ষেত্রে (যেমন : ভিভোটিফ বা টাইফিম ভিআই) যথাক্রমে ৪৮ মাস ও ৩৪ মাস পর্যন্ত কার্যকারিতা ফলো-আপ করা হয়।
বায়োলজিক্যাল ই লিমিটেডের ফেজ দুই-তিন ট্রায়ালের সেফটি মাত্র ৪২ দিন ফলো-আপ করা হয়েছে, যা গবেষকদের মতে একটি ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাকসিনের লং টার্ম সেফটি ফলো-আপের জন্য অগ্রহণযোগ্যভাবে কম। আগেই বলা হয়েছে, টাইপবার টিসিভি ও টাইফিবেভের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই টাইফিবেভের ফলো-আপ করা একান্ত জরুরি।
Leave a Reply