মুফতি সাইফুল ইসলাম।। ৩০ অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।
মানুষের অন্তরেই গড়ে ওঠে তার কর্মের প্রথম বীজ। চিন্তা ও ইচ্ছাই মানুষের নৈতিক জগতের ভিত্তি। কিন্তু মানুষের অন্তরের ইচ্ছা সব সময় বাস্তবে পরিণত হয় না। কখনো সুযোগের অভাবে, কখনো আল্লাহভীতির কারণে সে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকে।
আল্লাহ তাআলা মানুষের এই অন্তর্নিহিত নেক ইচ্ছা ও গুনাহর চিন্তা—উভয়কেই তাঁর অসীম জ্ঞানের আলোকে মূল্যায়ন করেন। এই হাদিসটি সেই সুবিশাল ন্যায়ের ও দয়ার নীতি ব্যাখ্যা করে, যেখানে আল্লাহ বান্দার মন ও কর্ম উভয়কেই বিচার করেন করুণার দৃষ্টিতে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ يَقُولُ اللهُ إِذَا أَرَادَ عَبْدِي أَنْ يَعْمَلَ سَيِّئَةً فَلاَ تَكْتُبُوهَا عَلَيْهِ حَتَّى يَعْمَلَهَا فَإِنْ عَمِلَهَا فَاكْتُبُوهَا بِمِثْلِهَا وَإِنْ تَرَكَهَا مِنْ أَجْلِي فَاكْتُبُوهَا لَهُ حَسَنَةً وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَعْمَلَ حَسَنَةً فَلَمْ يَعْمَلْهَا فَاكْتُبُوهَا لَهُ حَسَنَةً فَإِنْ عَمِلَهَا فَاكْتُبُوهَا لَهُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ
আবু হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— আল্লাহ্ বলেন, আমার বান্দা কোনো গুনাহর কাজ করতে চাইলে তা না করা পর্যন্ত তার গুনাহ্ লেখো না। আর যদি তা করেই ফেলে, তাহলে তা সমপরিমাণ লেখো। আর যদি আমার (মাহাত্ম্যের) কারণে তা ত্যাগ করে, তাহলে তার পক্ষে একটি নেকি লেখো এবং যদি বান্দা কোনো ভালো কাজের ইচ্ছা করল ; কিন্তু তা না করে, তবুও তোমরা তার জন্য একটি নেকি লেখো।
তারপর যদি তা করে, তবে তোমরা তার জন্য কাজটির দশ গুণ থেকে সাত শ গুণ পর্যন্ত লেখো। (বুখারি, হাদিস : ৭৫০১)
হাদিসের ব্যাখ্যা
১. গুনাহর ইচ্ছা করলে কিন্তু তা না করলে :
যদি কোনো বান্দা গুনাহর ইচ্ছা করে, কিন্তু বাস্তবে তা করে না—তবে ফেরেশতাদের বলা হয়, ‘ তার গুনাহ লেখো না। ’ অর্থাৎ শুধু চিন্তা বা মনস্থির করাও গুনাহ নয়, যতক্ষণ না তা কাজে পরিণত হয়।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—যদি কেউ পাপ করতে চায়, কিন্তু সুযোগ না পাওয়ার কারণে করতে না পারে, অথচ মনে সে আগ্রহ অটুট রাখে, তবে তা গুনাহ হতে পারে (দেখুন ইমাম নববীর ব্যাখ্যা সহিহ মুসলিম )।
কিন্তু যদি সে আল্লাহভীতির কারণে পাপ ত্যাগ করে, তখন সেটি নেকিতে রূপান্তরিত হয়।
২. যদি গুনাহ করে ফেলে :
যদি ইচ্ছার পর কেউ পাপের কাজ বাস্তবে করে ফেলে, তবে আল্লাহ বলেন—‘ তাহলে তার সমপরিমাণ গুনাহ লেখো। ’ এখানে দ্রষ্টব্য যে আল্লাহ গুনাহকে দ্বিগুণ বা বহুগুণ করেন না। বরং যতটা করেছে, ততটাই লেখা হয়। এতে আল্লাহর ন্যায়ের প্রতিফলন দেখা যায়।
৩. যদি আল্লাহভীতির কারণে গুনাহ ত্যাগ করে :
এটি হাদিসের সবচেয়ে সুন্দর অংশ। কেউ যদি একান্তভাবে পাপ করতে চায় কিন্তু আল্লাহর ভয়, লজ্জা, বা সম্মানের কারণে নিজেকে সংযত রাখে, তাহলে ফেরেশতারা তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লেখেন। এটা প্রমাণ করে, পাপ না করাটাও ইবাদত হয়ে যায়—যদি এর পেছনে আল্লাহভীতি থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘ যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে বিরত থাকে আল্লাহকে ভয় করার কারণে, আল্লাহ তাকে মুক্তি দান করবেন। ’ (সুরা : আন্-নূর, আয়াত : ৫২ ব্যাখ্যা অনুসারে)
৪. যদি নেক কাজের ইচ্ছা করে কিন্তু তা করতে না পারে :
মানুষের ইচ্ছাশক্তি কখনো কর্মে রূপ নিতে পারে না—অসুস্থতা, অক্ষমতা বা পরিস্থিতির কারণে। কিন্তু আল্লাহর কৃপা হলো—তিনি সেই নেক ইচ্ছাকেও পুরস্কৃত করেন। যেমন কেউ নামাজে যাওয়ার ইচ্ছা করল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে যেতে পারল না—তার জন্য একটি নেকি লেখা হবে।
৫. যদি নেক কাজ বাস্তবে সম্পন্ন করে :
যখন কেউ কোনো ভালো কাজ বাস্তবে করে, তখন আল্লাহ বলেন, ‘ তোমরা তার জন্য দশ গুণ থেকে সাত শ গুণ পর্যন্ত লেখো। ’ এটি কোরআনের আয়াতের সাথে সংগতিপূর্ণ— ‘ যে ব্যক্তি একটি সৎকাজ করবে, তার জন্য থাকবে দশ গুণ প্রতিদান। ’ (সুরা : আল-আন‘আম, আয়াত : ১৬০)
আর অন্য আয়াতে এসেছে— ‘ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তার জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। ’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ২৬১)
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘ এই হাদিসটি বান্দার আমল সম্পর্কিত আল্লাহর সর্বোচ্চ দয়া ও সুবিচারের পরিচায়ক। আল্লাহ পাপকে সীমিত রাখেন, কিন্তু নেকিকে করেন বহুগুণে বৃদ্ধি। ’ (মাদারিজুস সালিকীন : ২/২৪৪)
হাদিস থেকে শিক্ষা
১. আল্লাহর বিচারনীতি করুণানির্ভর, নৃশংস নয়। তিনি গুনাহকে একবার লেখেন, কিন্তু নেকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। ২. ইচ্ছার মূল্য আছে—যদি তা আল্লাহভীতিতে নিয়ন্ত্রিত হয়। পাপের চিন্তা পরিত্যাগ করা নিজেই নেকি।
৩. মানুষের নিয়তই তার কাজের ভিত্তি। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ কর্মসমূহ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। ’ (বুখারি, হাদিস : ১)
৪. নেক কাজে সামান্য প্রচেষ্টা আল্লাহর কাছে বিপুল প্রতিদানে রূপান্তরিত হয়। একবারের দান বা একবারের সিজদাও হতে পারে সাত শ গুণ নেকির সমান। ৫. গুনাহর প্রতি বিরাগ ও আল্লাহভীতি আত্মাকে পবিত্র করে। এটি তাজকিয়াহ বা আত্মশুদ্ধির পথ।
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর দরবারে আমাদের হৃদয়, নিয়ত ও আচরণ— সবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সমাজে বিচার হয় দৃশ্যমান কাজের ভিত্তিতে ; কিন্তু আল্লাহর বিচারে স্থান পায় অন্তরের গোপন অনুভূতিও।
তাঁর দয়া এত ব্যাপক যে তিনি শুধু গুনাহ সীমিত করেননি; বরং নেক কাজকে করেছেন অসীম প্রতিদানে পরিপূর্ণ।
—————————————————————————————————-
সুতরাং মুসলমানের উচিত নিজের নিয়তকে সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত করা এবং পাপের চিন্তা এলেও তা আল্লাহভীতির কারণে পরিত্যাগ করা। এই পরিহারই হয়ে উঠতে পারে তার জন্য জান্নাতের সিঁড়ি।
—————————————————————————————————-
লেখক : প্রবন্ধিক ও অনুবাদক।
Leave a Reply