মূর্তিপূজা সূচনার ইতিহাস

  • আপডেট সময় শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৫ পাঠক

উম্মে আহমাদ ফারজানা।। ০৮ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।

ইতিহাস সাক্ষী, মানবজাতি সব সময় স্রষ্টার সন্ধান ও ইবাদতের জন্য চেষ্টা করেছে । আদম (আ.)-এর সময় থেকে মানুষ একত্ববাদের পথে চলছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কুসংস্কার ও ভুল ধারণা জন্ম নেয়। মূর্তিপূজা সেই বিভ্রান্তির এক প্রধান উদাহরণ, যা মানুষকে একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্যুত করেছিল।

নুহ (আ.)-এর জাতি সর্বপ্রথম মূর্তিপূজার প্রবর্তন করেছিল। তারাই প্রথম মানুষকে সেই একত্ববাদী বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করেছিল, যা আদম (আ.)-এর যুগ থেকে মানবজাতি অনুসরণ করে আসছিল। নুহ (আ.)-এর জাতির মধ্যে কিছু নেক ও ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের মৃত্যু হলে লোকেরা তাঁদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে তাঁদের মূর্তি নির্মাণ করে।

কিন্তু শয়তান সেই সুযোগে মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং ধীরে ধীরে তারা সেই মূর্তিগুলোকেই উপাসনা করতে শুরু করে। এই মূর্তিগুলোর নাম ছিল—ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর; এগুলো সেই ধার্মিক ব্যক্তিদের নামেই রাখা হয়েছিল। আরব উপদ্বীপে মূর্তিপূজা প্রথম চালু করেন আমর ইবনে লুহাই আল খুজাই। এর আগে আরবরা ইবরাহিম (আ.)-এর প্রচারিত তাওহিদের ধর্ম অনুসরণ করত।

আমর ইবনে লুহাই ছিলেন ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তিনি দান-খয়রাত ও সৎকর্মে আগ্রহী ছিলেন এবং ইবরাহিম (আ.)-এর যুগ থেকে চলে আসা ধর্মীয় রীতিনীতিগুলোর প্রতিও গভীর অনুরাগী ছিলেন। তবে সেই সময় ধর্মের সঙ্গে কিছু শিরক ও কুসংস্কারও মিশে গিয়েছিল। তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, উদারতা ও ধর্মপ্রেমের কারণে মানুষ তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসত, শ্রদ্ধা করত এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাজত্ব ও কাবার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করে। কিন্তু তিনিই প্রথম আরবদের মধ্যে মূর্তিপূজার প্রবর্তন করেন এবং ইবরাহিম (আ.)-এর ধর্মকে বিকৃত করে দেন।

আমর ইবনে লুহাই একবার সিরিয়া ভ্রমণে যান এবং দেখেন সেখানে মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে মূর্তিপূজা করছে। তিনি তাদের আচরণ দেখে মুগ্ধ হন এবং মনে করেন, এই মূর্তিগুলো মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। সিরিয়া ছিল নবী ও বাণীর আবাসস্থল। ভ্রমণ থেকে ফিরে আসার পর আমর ইবনে লুহাই মক্কায় প্রথম মূর্তিটি নিয়ে আসেন, যার নাম ছিল হুবাল। তিনি এটি কাবার ভেতরে স্থাপন করেন এবং লোকদের এটি পূজার নির্দেশ দেন। লোকজন তাঁর কথামতোই আচরণ করতে শুরু করে। হুবালের পর আরব উপদ্বীপে প্রসিদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে ছিল আল-লাত, আল-উজ্জা ও মানাত।

————————————————————————————————–

আল্লাহ তাআলা এই মূর্তিগুলোর কথা বর্ণনা করেছেন : ‘ তোমরা কি আল-লাত, আল-উজ্জা এবং তৃতীয় মানাতকে ভেবে দেখেছ ? তোমাদের জন্য কি পুরুষ এবং তার জন্য নারী ? এটি এক অন্যায় বিভাজন। এগুলো শুধু নাম, যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখেছে ; আল্লাহর পক্ষ থেকে এদের কোনো প্রমাণ প্রাপ্ত হয়নি। তারা শুধু অনুমান ও আত্মার ইচ্ছা অনুসরণ করে। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ১৯-২৩)

————————————————————————————————

আরবরা আমর ইবনে লুহাইয়ের প্রবর্তিত এই মূর্তিপূজা বহু সময় ধরে পালন করত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আল্লাহ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রেরণ করেন, যিনি ইবরাহিম (আ.)-এর একত্ববাদের ধর্মকে পুনঃস্থাপন করেন।

নবী (সা.) মানুষকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহকে উপাসনার জন্য বেছে নিতে আহবান জানান। আমর ইবনে লুহাইয়ের কাজ ছিল বিভ্রান্তিকর ; তিনি মানুষকে আল্লাহর সঠিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত করেছিলেন। তাই পরকালে তাঁর কঠোর শাস্তি প্রাপ্য।

রাসুল (সা.) বলেছিলেন, আমর ইবনে লুহাইকে তার নাড়িভুঁড়ি থেকে আগুনে টেনে নেয়া হবে অর্থাৎ তার দেহের অংশটি তার থেকে বের হয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫২১)

কেননা মূর্তিপূজা হলো মানুষের একত্ববাদ থেকে বিচ্যুতি ও শিরকের প্রতীক।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!