জান্নাতে বিশেষ আপ্যায়নে আমিষ জাতীয় খাদ্য

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬
  • ২১ পাঠক

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ।। ১২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

জান্নাতিদের খাবার দাবারে থাকবে বিভিন্ন পদ। তাদের পান করতে দেয়া হবে সুপেয় পানীয় ও শরবত। কোরআনে জান্নাতিদের খাবারদাবারের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ আমি তাদের দেব ফলমূল এবং মাংস, যা তারা চাইবে।’ (সুরা : তুর, আয়াত : ২১)।

তিনি আরো বলেন, ‘ সেখানে আছে ফলফলাদি, খেজুর ও আনার।’ (সুরা : আর রহমান, আয়াত : ৬৮)

জান্নাত হলো আল্লাহ তাআলার সেই চিরন্তন সুখের আবাস, যা তিনি তাঁর নেককার বান্দাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। সেখানে মানুষের জন্য থাকবে অসংখ্য নিয়ামত, যা পৃথিবীর কোনো সুখের সঙ্গে তুলনীয় নয়। কোরআন-হাদিসে জান্নাতের নানা সৌন্দর্যের বর্ণনার পাশাপাশি বিশেষ কিছু খাদ্যের বর্ণনাও পাওয়া যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জান্নাতের আমিষ জাতীয় খাদ্যের বিশেষ আপ্যায়ন।

১. পাখি : জান্নাতে আমিষজাতীয় বিশেষ খাবার হিসেবে থাকবে পাখি। মানুষ পৃথিবীতেই পাখিকে তাদের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য ও সুরেলা কণ্ঠের জন্য ভালোবাসে, কিন্তু এই সৌন্দর্যের কারণে মানুষ সাধারণত অনেক পাখিকে দেখেই আনন্দ পায় ; তাদের ধরা বা খাওয়া সবার পক্ষে সম্ভবও হয় না, আবার কখনো পাখির প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় মানুষ জবেহ করতে চায় না। কিন্তু জান্নাতে পরিস্থিতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য এমন অফুরন্ত নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা সৌন্দর্য ও স্বাদের দিক থেকে হবে অতুলনীয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ আর থাকবে পাখির মাংস, যা তারা ইচ্ছা করবে। ’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ২১)

—————————————————————————————————————–

একবার রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ কাওসার কী ? ’ তিনি বললেন, ‘ এটি এমন একটি নদী, যা আল্লাহ আমাকে জান্নাতে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও বেশি সাদা এবং মধুর চেয়েও বেশি মিষ্টি। এতে এমন পাখি রয়েছে, যাদের ঘাড় উটের ঘাড়ের মতো লম্বা। ’

—————————————————————————————————————–

তখন উমর (রা.) বললেন, ‘ নিশ্চয়ই এই পাখিগুলো খুবই কোমল হবে। ’ রাসুল (সা.) জবাবে বললেন, ‘ যারা এগুলো খাবে, তারা আরো অধিক কোমল ও সুখী হবে। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫৪২)

২. উট : আরবদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ও সম্মানিত একটি প্রাণী হলো উট। যাকে মরুভূমির জাহাজ বলা হয়। এটি ছিল ধন-সম্পদ ও মর্যাদার প্রতীক, যা সবার পক্ষে কেনা বা মালিকানা লাভ করা সহজ ছিল না। তাই জান্নাতে এমন নিয়ামত থাকবে, যাতে প্রত্যেক মুমিন ইচ্ছা করলে এসব মূল্যবান প্রাণীও লাভ করতে পারবে।

—————————————————————————————————————–

হাদিসে এসেছে যে এক ব্যক্তি (সদকার উদ্দেশ্যে) একটি উট নিয়ে এসে বলল, ‘ এটি আল্লাহর পথে। ’ তখন রাসুল (সা.) বলেন, ‘ এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তোমার জন্য ৭০০ উট থাকবে, যাদের প্রতিটির লাগাম থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৯২)

—————————————————————————————————————–

৩. ষাঁড় : জান্নাতবাসীদের বিশেষ খাবার হিসেবে থাকবে ষাঁড়ের মাংস। সাওবান (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন তিনি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন। তখন এক ইহুদি এসে নবী করিম (সা.)-কে কয়েকটি প্রশ্ন করতে শুরু করল। সে জিজ্ঞেস করল, ‘ জান্নাতে প্রবেশের প্রথম অনুমতি কারা পাবে ? ’ রাসুল (সা.) জবাবে বললেন, ‘ মুহাজিরদের মধ্যে দরিদ্র লোকেরা। ’ তারপর সে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘তারা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাদের প্রথম আপ্যায়ন কী হবে ? ’

নবী করিম (সা.) বললেন, ‘ তিমি মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। ’ লোকটি আবার প্রশ্ন করল, ‘এরপর তারা কী খাবে ? ’ তিনি বললেন, ‘ তখন জান্নাতের সেই ষাঁড়টি তাদের জন্য জবাই করা হবে, যা জান্নাতের প্রান্তে চরে বেড়াত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩১৫)

৪. ভেড়া : ভেড়া বা ছাগলের মাংস, যা মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। তাই ভেড়া জান্নাতের আমিষ জাতীয় খাদ্যের অন্যতম । নবী (সা.) বলেছেন, ‘ ভেড়ার খোঁয়াড়ে নামাজ আদায় করো এবং তাদের ধুলা-ময়লা ঝেড়ে ফেলো, কারণ তারা জান্নাতের প্রাণী। ’ (সুনানে বাইহাকি, হাদিস : ৫৪৩৪)

এ ছাড়া ইবরাহিম (আ.), যখন তিনি আল্লাহর আদেশে তাঁর প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর পরিবর্তে জান্নাত থেকে একটি ভেড়া প্রেরণ করেছিলেন। এভাবে জান্নাতে ভেড়ার কথারও উল্লেখ পাওয়া যায়।

৫. তিমি মাছ : তিমি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সামুদ্রিক প্রাণী। পবিত্র কোরআনে ইউনুস (আ.)-এর ঘটনার মধ্যেও এই প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যখন আল্লাহর হুকুমে একটি তিমি তাঁকে গিলে ফেলেছিল এবং পরে আল্লাহর রহমতে তিনি আবার মুক্তি লাভ করেছিলেন।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘ কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ হবে এমন এক আগুন, যা পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে মানুষকে সমবেত করবে। আর জান্নাতবাসীরা যে প্রথম খাদ্য গ্রহণ করবে, তা হবে তিমি মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩২৯)

এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, জান্নাতে থাকবে আমিষ জাতীয় খাদ্যের বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা, যা পৃথিবীর মানুষের কল্পনারও অতীত—স্বাদ, সৌন্দর্য ও সম্মানের দিক থেকে যা হবে অনন্য ও অতুলনীয়। সেখানে প্রতিটি নিয়ামত হবে মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর, সুস্বাদু ও আনন্দদায়ক।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!