ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব।। ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
আত্মপ্রশংসা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। সুযোগ পেলেই আমরা আত্মপ্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যাই। নিজের অর্জন, গুণাগুণ, কর্মতৎপরতা নিয়ে আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলি। সাধারণ মানুষ তো বটেই; অনেক দ্বিনদার-পরহেজগার ব্যক্তির মধ্যেও ইখলাস বিনষ্টকারী ও আমলবিধ্বংসী এই রোগ ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান।
আমাদের সবারই জানা, মানুষের কাছে নিজের বড়ত্ব জাহির করা বা আত্মপ্রচারে লিপ্ত হওয়া নিঃসন্দেহে কোনো গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়। কোনো সচেতন মানুষ তা ভালো চোখে দেখে না। এমনকি স্বয়ং আত্মপ্রশংসাকারী ব্যক্তিও অন্যের আত্মপ্রশংসাকে নিন্দনীয় দৃষ্টিতেই দেখেন। অতএব একজন আল্লাহভীরু ও ব্যক্তিত্ববান মানুষকে অবশ্যই এই অপছন্দনীয় আচরণের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে, যা একাধারে নিজের ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে অন্যদিকে সৎ আমলকেও ধ্বংস করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ আত্মপ্রশংসায় লিপ্ত হয়ো না। কারণ তিনি সর্বাধিক অবগত কে আল্লাহকে ভয় করে। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩২)। একজন নেককার ব্যক্তির জন্য বড় পাপ হলো আত্মপ্রশংসা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ তোমরা পাপ না করো, তাহলে আমি তোমাদের জন্য এর চেয়ে বড় পাপের আশঙ্কা করি। আর তা হলো আত্ম-অহমিকা। ’ (সহিহুত তারগিব, হাদিস : ২৯২১)
——————————————————————————————————————-
মুহাম্মাদ ইবনে আমর (রহ.) থেকে বর্ণিত, জয়নব বিনতে আবী সালামা (রা.) তাঁকে প্রশ্ন করেন, তোমার মেয়ের কী নাম রেখেছ ? তিনি বললেন, বাররাহ (পুণ্যবতী)। তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের নাম রাখতে নিষেধ করেছেন। আমার নামও বাররাহ রাখা হয়েছিল। নবী করিম (সা.) বললেন, তোমরা নিজেদের পরিশুদ্ধ দাবি করো না। কেননা আল্লাহই ভালো জানেন, তোমাদের মধ্যে কে পুণ্যবান। অতঃপর তিনি বললেন, আমি এর কী নাম রাখব ? নবী করিম (সা.) বললেন, এর নাম রাখো জয়নাব। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫৩)
——————————————————————————————————————-
প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের নেক আমলগুলোকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। যেমন—রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন যে দুনিয়াতে শহীদ হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলবে, আমি তোমার পথেই যুদ্ধ করেছি এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি বরং এ জন্যই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকেরা তোমাকে ‘বীর’ বলে আখ্যায়িত করে। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। অতঃপর তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ১৯০৫)
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে এসে বলল, ওই ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনি কী বলেন, যে জিহাদ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সুনাম-সুখ্যাতি উভয়টিই কামনা করে। তার জন্য কী প্রতিদান রয়েছে ? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তার জন্য কিছুই নেই। এই প্রশ্ন তাঁকে তিনবার করা হলেও তিনি একই জবাব দিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা এমন আমলই গ্রহণ করে থাকেন, যা নিষ্কলুষভাবে শুধু তাঁর জন্যই করা হয় এবং যার মাধ্যমে শুধু তাঁরই সন্তুষ্টি কামনা করা হয়।’ (নাসাঈ, হাদিস : ৩১৪০)
প্রিয় পাঠক ! আত্মপ্রশংসার প্রবণতা মানুষের মধ্যে আসে আত্ম-অহংকার থেকে, যা অত্যন্ত ঘৃণিত আচরণ। আল্লাহ বলেন, ‘ তুমি অহংকারবশে মানুষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং জমিনে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৮)
অতএব আসুন ! সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আত্মপ্রশংসা ও আত্মপ্রসাদ থেকে বাঁচার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করি। বরং নিজেদের নেক আমলগুলো পারতপক্ষে গোপন রাখার চেষ্টা করি, যাতে তা শেষবিচারের দিনে আল্লাহর খাতায় লেখা থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ তোমাদের মধ্যে কেউ কিছু গোপন নেক আমল সঞ্চয় করে রাখতে পারলে সে যেন তা করে।’ (সিলসিলা সহিহাহ, হাদিস : ২৩১৩)
Leave a Reply