মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা।। ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
বর্তমানে অনলাইন-অফলাইনে প্রচলিত একটি আলোচিত শব্দ ‘বডি শেমিং’। বেশির ভাগ মানুষের কাছে এই পরিভাষাটি নতুন মনে হলেও এর প্রচলন আমাদের সমাজে বহু পুরনো। এর চর্চা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে—অন্যের শারীরিক গঠন, রং, উচ্চতা, ওজন কিংবা চেহারা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা ইত্যাদিকে বডি শেমিংয়ের অন্তর্ভুক্ত।
কাউকে ‘মোটা’, ‘চিকন’, ‘খাটো/ব্যাটারি’, ‘লম্বু/তালগাছ’, ‘টাকলা’, ‘চুল্লা’ বলা আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে গেছে। বিশেষ করে বন্ধুবান্ধবের মধ্যে এসব শব্দের প্রচলন খুব বেশি হয়। অনেকে আবার এত বাজে ভাষায় না বললেও ভদ্র ভাষায় পুরনো অভ্যাসটি বাঁচিয়ে রাখতে চায়। যেমন—কারো সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলেই বলে বসে, ‘আপনি তো অনেক মোটা হয়ে গেছেন।’, এমনকি মসজিদের সম্মানিত ইমাম-খতিবরাও এই বডি শেমিং থেকে রেহাই পান না। কিছু মানুষ রসিকতার সুরে তাদেরও শারীরিক অবয়ব নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা বলে বসে।
বেশির ভাগ মানুষ এটিকে নিছক হাসিঠাট্টা মনে করলেও বাস্তবে এটি একটি গভীর মানসিক আঘাতের কারণ।
আমাদের সমাজে বডি শেমিং এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে অনেকেই বুঝতেই পারেন না, তাদের একটি ‘মজার’ মন্তব্য অন্য একজনের আত্মসম্মানে কতটা আঘাত হানতে পারে।
একজন ব্যক্তি হয়তো বাইরে থেকে হেসে উড়িয়ে দেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি হীনম্মন্যতা, লজ্জা ও মানসিক কষ্টে ভুগতে থাকেন। এই ধরনের আচরণ ধীরে ধীরে একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়, সামাজিক মেলামেশায় সংকোচ তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিষণ্নতা পর্যন্ত ডেকে আনে।
—————————————————————————————————————-
ইসলাম মানুষের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। তাইতো মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন হয় এ ধরনের আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, হে ঈমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম।
আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা কোরো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম। (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
—————————————————————————————————————-
এই আয়াতে মানুষকে বিদ্রুপ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে মানুষের বাহ্যিক অবয়ব নিয়ে বিদ্রুপ করাও অন্তর্ভুক্ত। কারণ বাহ্যিক সৌন্দর্য বা গঠন আল্লাহরই সৃষ্টি—এ নিয়ে উপহাস করা মূলত সৃষ্টিকর্তার ফায়সালাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে রাসুল (সা.) আরো কঠোর ভাষায় এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, একজন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের সম্পদ, সম্মান ও জীবনে হস্তক্ষেপ করা হারাম। কোনো ব্যক্তির নিকৃষ্ট প্রমাণিত হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৮২)
বডি শেমিংও মানুষকে সরাসরি তুচ্ছতাচ্ছিল্যেরই একটি রূপ, যা কখনো তাচ্ছিল্যের ভাষায় হয়, আবার কখনো ভদ্র ভাষায় হয়। কখনো আবার কোনো শব্দ প্রয়োগ ছাড়াই নিছক ইশারায়ও হয়।
খুব সূক্ষ্মভাবে কারো শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ইঙ্গিত করাও ইসলামে গুরুতর অপরাধ। আয়েশা (রা.) একবার একজন নারীর খাটো হওয়া নিয়ে ইঙ্গিত করলে মহানবী (সা.) তাঁকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মহানবী (সা.)-কে বললাম, সাফিয়্যাহ (রা.)-এর ব্যাপারে আপনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে এরূপ অর্থাৎ তিনি খাটো। তিনি বললেন, তুমি এমন একটি কথা বলেছ, যা সমুদ্রে মিশিয়ে দিলে তাতে সমুদ্রের রং পাল্টে যাবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৭৫)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি মন্তব্যের গুনাহ এত ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে তা পুরো সমুদ্রকেও দূষিত করে দিতে পারে।
মহানবী (সা.)-এর যুগে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি এক নারীর শরীরের গঠন নিয়ে অশোভন মন্তব্য করলে রাসুল (সা.) ভীষণ অসন্তুষ্ট হন। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) একদা তাঁর ঘরে ছিলেন। তখন ওই ঘরে এক তৃৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি ছিল। সে উম্মে সালামাহর ভাই আবদুল্লাহকে বলল, হে আবদুল্লাহ! আগামীকাল তায়েফের ওপর যদি তোমরা জয়ী হও, তবে আমি তোমাকে বিনতে গাইলানকে দেখাব। সে সামনের দিকে আসলে, (তার পেটে) চার ভাঁজ দেখা যায়। আর যখন সে পেছনের দিকে যায় তখন (তার পিঠে) আট ভাঁজ দেখা যায়। নবী (সা.) বলেন, ওরা যেন তোমাদের (নারীদের) ঘরে কক্ষনো না আসে। (বুখারি, হাদিস : ৫৮৮৭)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, কারো শরীর নিয়ে অশ্লীল বা কামনামিশ্রিত বর্ণনা করা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং সামাজিকভাবে বিপজ্জনকও। এমন ব্যক্তিদের ওপর কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সুতরাং আমাদের প্রত্যেকের উচিত, এমন কথা ও আচরণ থেকে বিরত থাকা, যা মানুষের হৃদয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a Reply