দিশারী ডেস্ক।। ১৩ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে পুষ্প, বৃক্ষ, লতা-গুল্মে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন। উত্তর পাশের দোতলা ভবনের পুবপাশে চা ও কফির বাগান। সামনে এগিয়ে গেলে ছোট্ট একটি নালা। তার ধারেই দেখা মিলল অপরূপ চাঁপার।
——————————————————————————————–
প্রকৃতি
——————————————————————————————–
প্রকৃতির বিচিত্র সম্ভারে এমন কিছু ফুল আছে, যা কেবল তার রূপ দিয়ে নয় ; মানুষকে তার সুগন্ধের মায়ায় ফেলে। এমনই এক অনন্য ফুল এই কানাঙ্গা বা অপরূপ চাঁপা। এর বৈজ্ঞানিক নাম Cananga odorata, এটি Annonaceae পরিবারের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এই পরিবারের অন্য পরিচিত সদস্য হলো আতা বা শরিফা।
অপরূপ চাঁপা মূলত দ্রুত বর্ধনশীল ক্রান্তীয় উদ্ভিদ। পাতা পক্ষল ও যৌগিক। ত্রিফলক মসৃণ, চকচকে, ডিম্বাকার। পাতার আগা সুচালো, কিনারা কিছুটা ঢেউ খেলানো। পাপড়িগুলো লম্বা, সরু এবং নিচের দিকে ঝুলে থাকে। উদ্ভিদজগতে অপরূপ চাঁপার মতো সবুজ রঙের ফুল দুর্লভ। কাঁঠালিচাঁপা ফুলের সঙ্গে এর চেহারার কিছুটা মিল আছে।
ফুলটি যখন ফোটে, তখন এর রং থাকে সবুজাভ। এ সময় ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু পরিপক্ব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ ধারণ করে। তখন এর সুগন্ধ মন কেড়ে নেয়। রাতে তা তীব্র রূপ ধারণ করে। ঘ্রাণ অত্যন্ত মিষ্টি, মাদকতাময় এবং কিছুটা কস্তুরীর মতো। কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটা শেষ হয়ে ফল গঠনের পূর্ব পর্যন্ত দুই সপ্তাহ সময় লাগে।
কানাঙ্গা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আদি উদ্ভিদ, বিশেষ করে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় প্রচুর পরিমাণে জন্মে। মাদাগাস্কার ও কমোরোস দ্বীপপুঞ্জে এর বাণিজ্যিক চাষ হয়। গাছটি উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পছন্দ করে এবং প্রচুর সূর্যালোক পেলে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ ১০ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি ব্র্যান্ডগুলোর কাছে কানাঙ্গা এক অপরিহার্য উপাদান। বিখ্যাত ফরাসি পারফিউম ‘শ্যানেল নং ৫’-এর প্রধান উপাদান এটি।
মানসিক প্রশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করতে কানাঙ্গা তেলের জুড়ি নেই। অ্যারোমাথেরাপিতে এটি রক্তচাপ কমাতে, উত্তেজনা প্রশমিত করতে এবং অনিদ্রা দূর করতে ব্যবহৃত হয়। একে ‘ফ্লাওয়ার অব ফ্লাওয়ার্স’ বা ফুলের ফুল বলা হয়। কারণ, এটি মন ভালো করার এক জাদুকরি ক্ষমতা রাখে।
সাবান, লোশন ও চুলের তেলের সুগন্ধ বৃদ্ধিতে কানাঙ্গা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে নারীরা তাদের চুলে এই ফুল ব্যবহার করেন। তারা নারিকেল তেলের সঙ্গে এর নির্যাস মিশিয়ে রূপচর্চা করেন।
ইন্দোনেশিয়ায় নবদম্পতির বাসরঘর এই ফুল দিয়ে সাজানোর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। এর সুগন্ধকে কামোদ্দীপক ও শুভ বলে মনে করা হয়। আবার ফিলিপাইনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবে কানাঙ্গা ফুলের মালা ব্যবহার করা হয়।
আধুনিক রসায়নের যুগেও প্রাকৃতিক সুগন্ধি হিসেবে কানাঙ্গার আবেদন কমেনি। যারা বাগানে ভিন্নধর্মী সুবাসের গাছ লাগাতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য কানাঙ্গা হতে পারে চমৎকার পছন্দ। এর হলুদ পাপড়ি আর মায়াময় ঘ্রাণ চারপাশকে করে তুলবে এক টুকরো স্বর্গ।
লেখক : উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ।।
Leave a Reply