দিশারী ডেস্ক।। ১০ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
————————————————————————————————————————————-
বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ধর্মীয় বৈচিত্র্যে এগিয়ে থাকা শীর্ষ জেলাগুলোতে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ইউনিটের ঘনত্ব অত্যন্ত কম এবং বিদ্যমান ইউনিটগুলোর প্রায় সবই অনানুষ্ঠানিক প্রকৃতির।
———————————————————————————————————————————-
ধর্মীয় বৈচিত্র্যে দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি, সীমান্তবর্তী ও পুরনো জনপদের জেলা—খাগড়াছড়ি থেকে খুলনা, বান্দরবান থেকে গোপালগঞ্জ। জনসংখ্যার ধর্মীয় বিন্যাসে এসব জেলা দেশের অন্যান্য অনেক জেলার তুলনায় বেশ বৈচিত্র্যময়। তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে তাদের সামগ্রিক চিত্র ততটা উজ্জ্বল নয়।
কোথাও দারিদ্র্যের হার বেশি, কোথাও সাক্ষরতায় ঘাটতি, আবার কোথাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বিস্তার অন্যান্য জেলার তুলনায় সীমিত। বিশেষ করে পার্বত্য তিন জেলা একাধিক সূচকে নিচের সারিতে রয়েছে। সব মিলিয়ে ধর্মীয় বৈচিত্র্যে এগিয়ে থাকা জেলাগুলোর একটি বড় অংশে অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার স্পষ্ট ছাপ দৃশ্যমান।
খবর : অন্য দৈনিক
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর জেলাভিত্তিক ধর্মীয় জনসংখ্যার তথ্য বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ধর্মীয় বৈচিত্র্য দেখা যায় খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও হবিগঞ্জে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্য ধর্মাবলম্বীর অনুপাত বিবেচনায় এ জেলাগুলো অন্য অনেক জেলার তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট বৈচিত্র্য পার্বত্য তিন জেলায়। খাগড়াছড়িতে মুসলিম ৪৬ দশমিক ৫৬ ও বৌদ্ধ ৩৫ দশমিক ৯২ শতাংশ, বান্দরবানে মুসলিম ৫২ দশমিক ৬৮ ও বৌদ্ধ ২৯ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং রাঙ্গামাটিতে মুসলিম ৩৬ দশমিক ২২ ও বৌদ্ধ ৫৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও হবিগঞ্জে মূলত মুসলিম ও সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিই ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রধান ভিত্তি।
বিবিএসের ‘ বাংলাদেশ দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ ’ পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ধর্মীয় বৈচিত্র্যে এগিয়ে থাকা শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে পাঁচটিতে এ হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। দিনাজপুর ও গোপালগঞ্জে দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ, বান্দরবানে ২৫, ঠাকুরগাঁওয়ে ২৩ দশমিক ৩ ও মৌলভীবাজারে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিবিএসের পাঁচ স্তরের বা কুইন্টাইলভিত্তিক মূল্যায়নে দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, বান্দরবান ও ঠাকুরগাঁও ‘উচ্চ দারিদ্র্য’ শ্রেণীতে রয়েছে। মৌলভীবাজার ও খাগড়াছড়ি ‘মধ্যম’ এবং রাঙ্গামাটি, বাগেরহাট, হবিগঞ্জ ও খুলনা ‘নিম্ন’ দারিদ্র্য শ্রেণীতে। অর্থাৎ ধর্মীয় বৈচিত্র্যে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে চারটি উচ্চ, দুটি মধ্যম ও চারটি নিম্ন দারিদ্র্যের স্তরে রয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক দারিদ্র্যের হার আরো বেশি। বান্দরবানের থানচিতে দারিদ্র্যের হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০ দশমিক ৮ ও রুমায় ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে এ হার ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ, বিরামপুরে ৩৬ দশমিক ৫ ও কাহারোলে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ, পীরগঞ্জে ২৪ এবং হরিপুরে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ ও কুলাউড়ায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এ হার ২৯ দশমিক ২ শতাংশ। এসব উপজেলার কয়েকটি অতি উচ্চ বা পঞ্চম কুইন্টাইলের দারিদ্র্য শ্রেণীতে পড়েছে।
চরম বা অতি দারিদ্র্যের সূচকেও বৈচিত্র্যপূর্ণ জেলাগুলোর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিবিএসের শ্রেণীবিন্যাসে বান্দরবান, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও ‘উচ্চ’ চরম দারিদ্র্য শ্রেণীতে রয়েছে। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বাগেরহাট ‘মধ্যম’ এবং গোপালগঞ্জ, খুলনা ও হবিগঞ্জ ‘নিম্ন’ শ্রেণীতে। উপজেলাভিত্তিক চরম দারিদ্র্যের ক্ষেত্রেও বান্দরবানের কয়েকটি উপজেলা, মৌলভীবাজারের জুড়ী, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল; দিনাজপুরের বীরগঞ্জ, বিরামপুর, কাহারোল ও বোচাগঞ্জ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর উচ্চ শ্রেণীতে রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক বলেন, দেশের ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অনগ্রসর জেলাগুলোর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকার পেছনে সামাজিক বা রাজনৈতিক বিভাজনের চেয়েও বড় ভূমিকা রাখছে ভৌগোলিক বাস্তবতা, ভূমির মালিকানা কাঠামো ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির অপ্রতুলতা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনা একটি বড় কারণ। অন্যদিকে গোপালগঞ্জের চরাঞ্চল কিংবা উপকূলীয় জেলাগুলোতে নদীভাঙনের কারণে মানুষ বসতি ও জীবিকা হারিয়ে নতুন করে দারিদ্র্যের চক্রে পড়ছে। হাওর অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসলহানি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দ্রুত দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেয়।
তিনি আরো বলেন, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে বৃহৎ ভূমি মালিকানার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজেদের জমির মালিকানা তুলনামূলক সীমিত, যা আয়বৈষম্য বাড়ায়। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রমুখী অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও তুলনামূলক কম। অনেক দরিদ্র পরিবারের কর্মক্ষম সদস্য ঢাকাসহ কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি এমন শহরে গিয়ে কাজ করে পরিবারের আয় বাড়াতে সক্ষম হন। কিন্তু আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের অভিবাসন কম দেখা যায়। সব মিলিয়ে এসব ভৌগোলিক, ভূমি ও শ্রমবাজারসংক্রান্ত কারণ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে দারিদ্র্যের হার বেশি থাকার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ধর্মীয় বৈচিত্র্যে এগিয়ে থাকা শীর্ষ জেলাগুলোতে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ইউনিটের ঘনত্ব অত্যন্ত কম এবং বিদ্যমান ইউনিটগুলোর প্রায় সবই অনানুষ্ঠানিক প্রকৃতির। ভারী শিল্প, বড় আকারের উৎপাদনমুখী কারখানা বা প্রাতিষ্ঠানিক সেবা খাতের বিস্তার না ঘটায় এসব জনপদে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ গড়ে ওঠেনি। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সনাতন কৃষি, ক্ষুদ্র দিনমজুরি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল।
পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির অর্থনীতি মূলত জুম চাষ, ফলদ বাগান, বনজ সম্পদ আহরণ ও প্রথাগত কৃষিকেন্দ্রিক। অন্যদিকে চা বাগান অধ্যুষিত মৌলভীবাজারে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা শ্রমিকদের বড় অংশ পুরুষানুক্রমে নামমাত্র মজুরি কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। উত্তরের দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও প্রধানত মৌসুমি কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে আয়ের অভাব পরিবারগুলোকে আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
——————————————————————————————————————————
বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিটের তিনটিই পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। বান্দরবানে অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ৩২ হাজার ১০১টি, রাঙ্গামাটিতে ৪৯ হাজার ৯৩৭ ও খাগড়াছড়িতে ৫৩ হাজার ৪৪৫টি। ৬৪ জেলার মধ্যে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যায় এ তিন জেলার অবস্থান যথাক্রমে ৬৪তম, ৬৩তম ও ৬২তম। অর্থাৎ ধর্মীয় বৈচিত্র্যে দেশের প্রথম তিন জেলা অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যায় রয়েছে একেবারে নিচের সারিতে।
——————————————————————————————————————————
অন্যদিকে গোপালগঞ্জে অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩, মৌলভীবাজারে ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৪, হবিগঞ্জে ১ লাখ ২৬ হাজার ৩১০ এবং বাগেরহাটে ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩৬টি। তবে ব্যতিক্রম দিনাজপুর ও খুলনা। দিনাজপুরে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৬৩ এবং খুলনায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৩০২টি; ৬৪ জেলার মধ্যে তাদের অবস্থান যথাক্রমে নবম ও ১৩তম।
অর্থনৈতিক ইউনিটে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যায়ও একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোয় মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন নিয়োজিত। এর মধ্যে বান্দরবানে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৮১ হাজার ৬৪৪, যা দেশের জেলাগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। খাগড়াছড়িতে এ সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার ৯৫৩ এবং রাঙ্গামাটিতে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪১৫; সর্বনিম্ন নিয়োজিত মানুষের জেলার তালিকায় এ দুটির অবস্থান যথাক্রমে পঞ্চম ও ষষ্ঠ।
ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিভিন্ন অঞ্চলে দারিদ্র্যের পেছনে ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে বৈষম্যসহ নানা কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গমতার কারণে কৃষিপণ্য বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে কৃষকেরা অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও তাদের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এসব অঞ্চলে দারিদ্র্য কমাতে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়বর্ধনমূলক কর্মসূচি, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরি শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এসব অঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি সাক্ষরতার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় বৈচিত্র্যে এগিয়ে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈপরীত্য লক্ষণীয়। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীর গড় সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অথচ এ তালিকায় থাকা বান্দরবান জেলা সাক্ষরতার দিক থেকে দেশের অন্যতম পিছিয়ে পড়া জনপদ। জেলাটিতে সাক্ষরতার হার মাত্র ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা ৬৪ জেলার মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন।
পার্বত্য অঞ্চলের বাকি দুই জেলা খাগড়াছড়িতে ৭১ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং রাঙ্গামাটিতে ৭১ দশমিক ৩৩ শতাংশ সাক্ষরতা রেকর্ড করা হয়েছে—উভয়ই জাতীয় গড়ের তুলনায় কম। অন্যদিকে চায়ের বাগান ও হাওরাঞ্চলঘেরা হবিগঞ্জে শিক্ষার হার নেমে এসেছে ৬৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। ঠাকুরগাঁওয়ে সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা প্রায় জাতীয় গড়ের সমান। এছাড়া দিনাজপুর (৭৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ) ও মৌলভীবাজারে (৭৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ) সাক্ষরতার হার জাতীয় গড়কে কিছুটা ছাড়িয়ে গেছে।
এর বিপরীতে সমতলের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে শিক্ষার চিত্র অনেকটাই ইতিবাচক। বাগেরহাটে সাক্ষরতার হার ৮১ দশমিক ৩২ শতাংশ, খুলনায় ৮০ দশমিক ৫৬ শতাংশ ও গোপালগঞ্জে ৭৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সাক্ষরতার সামগ্রিক জেলা তালিকায় বাগেরহাট চতুর্থ, খুলনা অষ্টম ও গোপালগঞ্জ দশম স্থানে অবস্থান করছে।
—————————————————————————————————————————————
বিবিএসের হিসেবে জাতীয়ভাবে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছে ৫৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ মানুষ। ধর্মীয় বৈচিত্র্যে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে ছয়টির হার জাতীয় গড়ের নিচে। বান্দরবানে এ সুবিধার আওতায় রয়েছে মাত্র ৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ মানুষ, রাঙ্গামাটিতে ৪৩ দশমিক ৯৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪৮ দশমিক ৬১, হবিগঞ্জে ৫০ দশমিক ৩৫, খাগড়াছড়িতে ৫৪ দশমিক ৩৭ ও দিনাজপুরে ৫৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিপরীতে মৌলভীবাজারে এ হার ৫৯ দশমিক শূন্য ১, খুলনায় ৬২ দশমিক ৯৭, বাগেরহাটে ৭২ দশমিক ৮৫ এবং গোপালগঞ্জে ৭৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। ফলে স্যানিটেশন সুবিধার ক্ষেত্রেও শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে ; সবচেয়ে পিছিয়ে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি।
—————————————————————————————————————————————
আবাসনের ধরন ও বসতবাড়ির মানের ক্ষেত্রেও এ জেলাগুলোর পশ্চাৎপদতা স্পষ্ট। জাতীয় পর্যায়ে অধিকাংশ পাকা বা সেমিপাকা বসতঘরের ছাদ টিন বা কংক্রিটের হলেও পাহাড়ি তিন জেলার প্রান্তিক এলাকাগুলোতে কাঁচা ঘর, বাঁশ, কাঠ, ছন বা মাটির তৈরি আবাসের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। পার্বত্য এলাকায় জুম চাষ ও ঐতিহ্যবাহী কাঠের মাচাং ঘর এবং চা বাগানগুলোর শ্রমিক বস্তিতে অপরিসর কাঁচা ঘরই মানুষের প্রধান আশ্রয়। উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামীণ জনপদে এখনো মাটির দেয়াল ও খড়ের ছাউনির ঘর দেখা যায়। অন্যদিকে উপকূলীয় খুলনা ও বাগেরহাটের নিচু এলাকায় দুর্যোগপ্রবণতা এবং নিয়মিত জলোচ্ছ্বাসের কারণে টেকসই ও পাকা বসতবাড়ির স্থায়িত্ব বজায় রাখা স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বরাদ্দেও এসব জেলার কয়েকটির পিছিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া যায়। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) ২০২৩ সালে প্রকাশিত ২০২১-২২ অর্থবছরের এডিপি বিশ্লেষণেও উন্নয়ন বরাদ্দে বড় আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্র উঠে আসে। গবেষণায় দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও পেয়েছিল মোট উন্নয়ন বরাদ্দের মাত্র দশমিক ৪৩ শতাংশ। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি নিয়ে গঠিত পার্বত্য অঞ্চলের অংশ ছিল ১ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। হবিগঞ্জকেও তুলনামূলক কম বরাদ্দ পাওয়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়। তবে খুলনা ছিল ব্যতিক্রম; জেলাটি তুলনামূলক বেশি বরাদ্দ পাওয়া জেলাগুলোর একটি।
দেশের কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা বা দারিদ্র্য মূল্যায়নে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি বরাদ্দের সুষম বণ্টন প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ সব জেলায় সমানভাবে না পৌঁছানো এবং শিল্পায়ন ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে অনেক এলাকা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে পড়ে। পাশাপাশি মূল অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী উন্নত অবকাঠামো, টেকসই যাতায়াত ব্যবস্থা, শিক্ষার হার এবং কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতার মতো বিষয়গুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। কোনো জেলা এসব সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকলে সেখানে দারিদ্র্যের হারও বাড়ে।
সারা দেশে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোয় সরকারি নজরদারি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন সিপিডির এ সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বলেন, দারিদ্র্যপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে এসব অঞ্চলে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বড় পরিসরে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
Leave a Reply