বিএসটিআই মানে গুণে নড়বড়ে

  • আপডেট সময় বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের রকমারি পসরা, সুপারশপের চকচকে ডিসপ্লে কিংবা বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ভোক্তার চাহিদা— সবখানেই এখন বৈশ্বিক কমপ্লায়েন্স ও আন্তর্জাতিক মান সনদের গুরুত্ব অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে। প্রতি বছর ১৪ অক্টোবর ‘বিশ্ব মান দিবস’ উদযাপনের মাধ্যমে পণ্যের সঠিক মান ও বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণের গুরুত্ব স্মরণ করা হলেও বাংলাদেশে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। জাতীয় মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন’ (বিএসটিআই)-এর মান সনদের অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকা এবং আধুনিক অবকাঠামোর অভাবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

শুধু রপ্তানি পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ নয়। দেশের বাজারেও সঠিক মান নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিএসটিআইকে। মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআইয়ের প্রধান সংকট হলো উপজেলা পর্যায়ে ল্যাব ও জনবলের ঘাটতি, যার ফলে নকল পণ্যের বিস্তার রোধ করা কঠিন হচ্ছে। পাশাপাশি, দীর্ঘসূত্রী পরীক্ষা প্রক্রিয়া, সিএম লাইসেন্স পরবর্তী গোপন তদারকির অভাব, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং শুধু ঝটিকা মোবাইল কোর্ট-নির্ভর বাজার ব্যবস্থাপনা টেকসই নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করতে পারছে না।

—————————————————————————————————————————–

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের এই যুগে স্থানীয়ভাবে পণ্য অনুমোদন করাই যথেষ্ট নয় ; সেই অনুমোদন বৈশ্বিক বাজারে গ্রহণযোগ্য হওয়া আবশ্যক। অনেক ক্ষেত্রে সেটি সম্ভব না হওয়ায় তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য থেকে শুরু করে দ্রুত বর্ধনশীল ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক হালাল পণ্য— কোনো খাতেই বাংলাদেশ তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না।

—————————————————————————————————————————–

বিশেষ করে উদীয়মান হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে মালয়েশিয়ার জাকিম, ইসলামিক দেশগুলোর স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড মেট্রোলজি ইনস্টিটিউট (এসএমআইআইসি) কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি অ্যাক্রেডিটেশন সেন্টারের সঙ্গে দেশে কোনো স্বীকৃত একক কর্তৃপক্ষের চুক্তি নেই। ফলে বিএসটিআই বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দেয়া সনদ অনেক দেশেই সরাসরি গৃহীত হয় না। বাধ্য হয়ে উদ্যোক্তাদের বিপুল অর্থ ও সময় অপচয় করে বিদেশি তৃতীয় পক্ষের এজেন্সি থেকে টেস্ট ও কোয়ালিটি সনদ নিতে হয়। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগী সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

শুধু হালাল পণ্যই নয়, সামগ্রিক মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের সনাতন পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব পুরো রপ্তানি খাতকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। দেশে ১৯৮৫ সালে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএসটিআই খাদ্য, প্রসাধন, নির্মাণসামগ্রী, ইলেকট্রনিকসসহ ১৯১টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মান নির্ধারণ বাধ্য করলেও তাদের কার্যপদ্ধতি ও ল্যাব সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে বেশ পিছিয়ে। খবর : অন্য দৈনিক

উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন, ল্যাবে টেস্ট রিপোর্ট পেতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, যা ব্যবসা পরিচালনার গতি কমিয়ে দেয়। আবার একবার সিএম লাইসেন্স দেওয়ার পর বাজারে বা কারখানায় নিয়মিত গোপন তদারকির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ঢাকার বাইরে পর্যাপ্ত ল্যাব না থাকায় একদিকে দেশের ভেতরে নিম্নমানের পণ্যের দাপট বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশীয় পণ্যের সামগ্রিক গুণগত মান নিয়ে অনাস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএসটিআইকে ঢেলে সাজানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনে সূচনা হয়ে ১৯৭০ সাল থেকে পালিত হওয়া ‘বিশ্ব মান দিবস’-এর মূল চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। এ বছর ৫৭তম বিশ্ব মান দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে, ‘ অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ’।

—————————————————————————————————————————–

তবে বিএসটিআই বলছে, জাতীয় প্রমিতকরণ সংস্থা হিসেবে এরই মধ্যে ৪ হাজার ৬৩১টি প্রমিত মান (বিডিএস) প্রণয়ন করেছে, যার মধ্যে ১৯১টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মান অর্জন বাধ্যতামূলক। এসডিজি-৭ অর্জনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুরক্ষায় সংস্থাটি সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ৭৯টি বিশেষ মান প্রণয়নসহ জার্মান প্রযুক্তির অত্যাধুনিক ‘ সান সিমুলেটর ’ ল্যাব স্থাপন করেছে। এ ছাড়া অনলাইন ই-বিএসটিআই সার্ভিস, ডিজিটাল কিউআর কোড ট্র্যাকিং, আন্তর্জাতিক আইএসও/আইইসি মান রক্ষা এবং খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে সারা দেশে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা তাদের অন্যতম বড় সফলতা।

—————————————————————————————————————————–

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, শিল্প খাতের প্রসারের সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাঠামোগত সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে বিশ্বমানের আধুনিক ল্যাবরেটরি না থাকলে ঢাকার বাইরের উৎপাদকরা যেমন হয়রানির শিকার হবেন, তেমনি ভোক্তারাও মানহীন পণ্য ব্যবহারে বাধ্য হবেন। বিএসটিআইকে একটি স্বায়ত্তশাসিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের সংস্থায় রূপান্তর করা জরুরি।

ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেছেন, ব্যবসায়ীরা নিয়মিত লাইসেন্স ফি ও রাজস্ব দিচ্ছেন, কিন্তু ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। বিএসটিআইয়ের প্রক্রিয়াগুলোকে শতভাগ ডিজিটালাইজড করার পাশাপাশি সৎ ব্যবসায়ীদের যেন হয়রানির শিকার না হতে হয়, সে বিষয়ে নজর রাখা প্রয়োজন।

 

 

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!