একটি হাসপাতালে প্রতিদিনই জন্ম নিচ্ছে ১০ থেকে ১৫ জন রোহিঙ্গা শিশু !

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৬২ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ২৭ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।

————————————————————————————————————-

আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বরং অনুপ্রবেশ ও জন্মহার মিলিয়ে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও আস্তে আস্তে ধসে পড়ছে, তহবিল সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। তারা বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে, ফলে তাদের কোনো নাগরিকত্বও নেই। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চিত অন্ধকারেই আটকে আছে।

————————————————————————————————————

কক্সবাজারের উখিয়ার একটি হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ড। সেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন রোহিঙ্গা নারী সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। এই ছবিটি প্রথম দৃষ্টিতে জীবনের জয়গান বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পর্দার আড়ালের সত্যটি ভিন্ন। এই নবজাতকদের আগমন কোনো আনন্দবার্তা নয়, বরং এক প্রলম্বিত সংকটের গভীর থেকে গভীরতর হওয়ার সতর্কঘণ্টা। তাদের মায়েরা অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক, অপুষ্টির শিকার। তাদের জন্মই হচ্ছে এক অনিশ্চয়তার মাঝে, এক রাষ্ট্রহীন পরিচয় নিয়ে।

আট বছর ধরে যখন একজন রোহিঙ্গাকেও স্বদেশে ফেরত পাঠানো যায়নি, আন্তর্জাতিক সহায়তা যখন তলানিতে এবং নতুন করে যখন অনুপ্রবেশের স্রোত থামছে না, তখন এই বিপুল সংখ্যক নবজাতকের জন্ম রোহিঙ্গা সংকটকে এক নতুন এবং সম্ভবত আরও জটিল অধ্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে।

৬ লাখ রোহিঙ্গা শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার!

একটি মানবিক সংকট কতটা বহুমাত্রিক রূপ নিতে পারে, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তার এক নির্মোহ উদাহরণ। আমরা প্রায়শই প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু এর ভেতরে নীরবে যে একটি জনসংখ্যাগত বিস্ফোরণ ঘটছে, তা অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়।

ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের ডা. কাজী গোলাম রসুল যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা ভয়াবহ। অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অপুষ্টিতে ভোগা মায়েরা যখন সন্তান জন্ম দিচ্ছেন, তখন আমরা শুধু একটি শিশুর জন্ম দেখছি না, দেখছি একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শুরু, যার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের ভিত্তিটাই নড়বড়ে। ক্যাম্পগুলোতে বাল্যবিয়ে যখন একটি সাধারণ ঘটনা, তখন বুঝতে হবে এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি হতাশা, শিক্ষার অভাব এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থাহীনতার এক করুণ প্রকাশ।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, তহবিলের অভাবে ১২ বছরের কম বয়সী প্রায় পাঁচ লাখ শিশু আজ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। ক্যাম্পের অনানুষ্ঠানিক স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা একটি আস্ত প্রজন্মকে বেড়ে ওঠতে দেখছি, যাদের অক্ষরজ্ঞান নেই, ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন নেই এবং রাষ্ট্রীয় কোনো পরিচয় নেই। এই শিশুরা যখন কৈশোরে পৌঁছাবে, তখন তাদের হতাশা, বঞ্চনা এবং পরিচয়হীনতার সংকট কোন পথে ধাবিত হবে, তা সহজেই অনুমেয়। অপরাধ, মাদক চোরাচালান এবং উগ্রবাদে ঝুঁকে পড়ার জন্য এর চেয়ে উর্বর ক্ষেত্র আর কী হতে পারে ?

https://www.ekusheypatrika.com/wp-content/uploads/2025/08/Screenshot-2025-08-27-113428-e1756272890424.jpg

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন তহবিলের জোগান কমিয়ে দিয়ে তাদের দায়িত্ব সারছে, তখন তারা হয়তো বুঝতে পারছে না যে, আজকের সাশ্রয় আগামী দিনের জন্য এক বিশাল নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে, যার প্রভাব শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের ওপর পড়বে।

—————————————————————————————————————–

সংকটের অন্য পিঠে রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘ সহানুভূতি ক্লান্তি ’ এবং মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ঔদাসীন্য। আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত না নেয়াটা মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাবকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। উল্টো রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে ২০২৪ সাল থেকেই নতুন করে সোয়া লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা প্রমাণ করে সমস্যার মূল কারণটি আগের মতোই জ্বলজ্বল করছে।

——————————————————————————————————————–

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহর এই তথ্যটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশ একাই এই ভার আর কতদিন বইবে ? একদিকে নতুন করে আসা মানুষের চাপ, অন্যদিকে পুরনোদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি—দুইয়ে মিলে কক্সবাজারের স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই গভীর হতাশার মাঝে এক টুকরো আশার আলো হয়ে এসেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। তার সাত দফা প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি নতুন কূটনৈতিক গতি সঞ্চারের চেষ্টা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই জটিল জট কি কেবল সদিচ্ছা দিয়ে খোলা সম্ভব ? মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘসহ বিশ্বের তাবড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। সেখানে একটি নতুন সরকার রাতারাতি কী পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। তবে এই উদ্যোগ জরুরি ছিল, কারণ এটি অন্তত বিশ্ব ফোরামে মরে যাওয়া আলোচনাকে নতুন করে প্রাণ দেবে।

মানবিকতার খাতিরে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু শুধু আশ্রয় আর ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কঠোর কূটনৈতিক বাস্তবতা, মিয়ানমারের ওপর সমন্বিত আন্তর্জাতিক চাপ এবং এই জনগোষ্ঠীর জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। অন্যথায়, ক্যাম্পের এই নতুন প্রজন্ম একদিন বাংলাদেশের জন্য আশার আলো নয়, বরং এক গভীর সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

শেষ পর্যন্ত, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু আশ্রয়প্রার্থীদের মানবিক সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট এবং বিশ্বের জন্য একটি নৈতিক পরীক্ষা। উখিয়ার হাসপাতালের আঁতুড়ঘরে যে শিশুটি আজ জন্ম নিচ্ছে, সে কোনো পাপ করেনি। তার রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন জীবনের দায়ভার আমাদের সবার।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ঢল পেরিয়েছে আট বছর। সেই সময়টাতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ভূগোল বদলে গেছে। সীমিত আট হাজার একরের বনভূমিতে গড়ে ওঠা ৩৩টি ক্যাম্পে এখন গাদাগাদি করে বসবাস করছে ১৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।

সরকারি হিসেবে নিবন্ধিত সংখ্যা ১১ লাখ ৪৮ হাজার ৫২৯ হলেও অনিবন্ধিতসহ এ সংখ্যা অনেক বেশি। শুধু ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারে।

——————————————————————————————————————-

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৮৭ জন শিশু জন্ম নিচ্ছে ক্যাম্পে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার। আট বছরে জন্ম নিয়েছে দুই লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু। সীমিত জায়গায় লাখ লাখ মানুষ বসবাস করছে। কিন্তু নতুন ক্যাম্প করার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো সমাধান নেই।

——————————————————————————————————————–

নতুন জন্ম ছাড়াও অনুপ্রবেশ থেমে নেই। রোহিঙ্গা নেতা দীল মোহাম্মদ দাবি করেছেন, গত এক বছরে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব রোহিঙ্গার মধ্যে অনেকেই শহরের ভেতরেও বসতি গড়ে তুলেছে। সরকারি নিবন্ধনের বাইরে থাকা এ জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই।

এদিকে ক্যাম্পে জনসংখ্যা বাড়লেও পরিবার পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের আগ্রহ প্রায় নেই বললেই চলে। এনজিও কর্মীরা জানান, রোহিঙ্গা দম্পতিরা জন্মনিয়ন্ত্রণে খুবই অনাগ্রহী। কেউ কেউ একাধিক স্ত্রী রাখেন এবং প্রতিটি পরিবারে গড়ে সাত থেকে আটজন সন্তান রয়েছে। এক এনজিও কর্মীর ভাষায়, অনেক পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৭-৮ জন। সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও সাড়া পাওয়া যায় না।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ জানিয়েছে, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে শিশু আছে প্রায় ছয় লাখ। এর মধ্যে পাঁচ বছরের নিচে রয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার শিশু। শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক সংকটে পড়েছে। অর্থ সংকটের কারণে গত জুনে ৪ হাজার ৫০০ লার্নিং সেন্টার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রায় দেড় লাখ শিশু পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েছে। চাকরি হারিয়েছেন স্থানীয় এক হাজার ১৭৯ শিক্ষক।

———————————————————————————————————-

ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এ বিষয়ে বলেন, আমি ৩০ বছরের কর্মজীবনে এত ভয়াবহ অর্থ সংকট দেখিনি। ফিলিস্তিনসহ অন্যত্র বিশ্ব মনোযোগ চলে গেছে। ফলে রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া শিশুরা আরও বেশি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

————————————————————————————————————

শিক্ষার অভাবের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। মাতৃস্বাস্থ্য প্রকল্প ব্যাহত হচ্ছে, শিশু পুষ্টি কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পথে। এনজিও সূত্রে জানা গেছে, ক্যাম্পে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে একজন শাররিক নির্যাতনের শিকার হয়। আবার যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা শিশুরা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে, যা তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) হিসেবে , এ বছর বাল্যবিয়ে বেড়েছে ৩ শতাংশ এবং শিশুশ্রম বেড়েছে ৭ শতাংশ। নজরদারি সীমিত হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভাষ্যমতে, স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুরা এখন অলস সময় কাটাচ্ছে, কেউ দিনমজুরের কাজে নামছে, আবার কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, এ বছর রোহিঙ্গাদের সহায়তায় দরকার ২৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি মিলেছে মাত্র ৩৮ শতাংশ। ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি জুলিয়েট মুরেকেইসনি বলেন, এই শরণার্থীরা আগেই সব হারিয়েছে। এখন তহবিল সংকটে জীবন রক্ষাকারী কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, রান্নার গ্যাস, সাবান আর শিক্ষা—সবই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

 

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!