আত্মহত্যাকারীদের অধিকাংশেরই থাকে মানসিক সমস্যা

  • আপডেট সময় বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।

বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ৫ জনে একজন এবং শিশুদের প্রতি ৮ জনের একজন কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় ভোগেন। অথচ দেশের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে নেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। এমনকি এই সেবা সব সরকারি মেডিকেল কলেজেও নেই। বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন মাত্র ৩৫০ জন। অর্থাৎ প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য রয়েছেন ০ দশমিক ১৭ জন।

সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা সহজলভ্য না হওয়াসহ নানা কারণে মানসিক রোগীদের অধিকাংশই থেকে যাচ্ছেন চিকিৎসার বাইরে। যাদের বড় একটা অংশ শিকার হন নানা অন্যায় আচরণের। অনেকে বেছে নেন আত্মহননে পথ। অথচ এর বেশির ভাগই চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দশম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। আর আত্মহত্যা যারা করেন তাদের অধিকাংশেরই থাকে মানসিক সমস্যা। বেশির ভাগই ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত্যা করেন। সচেতন থাকলে এসব আত্মহত্যার অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তারা বলছেন, নেশা করা ব্যক্তিদের ৫০-৬০ শতাংশের মানসিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর বাইরে সম্পর্কে টানাপোড়েন, বিচ্ছেদ, বেকারত্ব, আর্থিক সমস্যা, চাকরি হারানো, জীবনে কোনো খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে, বাবা-মা বা প্রিয় কারও মৃত্যু হলে কিংবা দূরে চলে গেলে, নিজে কিংবা প্রিয়জন দুর্ঘটনার শিকার হলে, বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হলে এবং প্রত্যাশিত কিছু না পাওয়া ব্যক্তিদের মানসিক রোগে ভোগার আশঙ্কা বেশি থাকে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মিলা আক্তার (ছদ্মনাম) জানান, তিনি ভালোবেসে পরিবারের অমতে পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের দুই বছরের মাথায় সেই ছেলে তাকে ছেড়ে দেন। কেননা, তার স্বামী আরেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তবে মিলা ভাবতেন স্বামী তার কাছে ফিরবেন। এমন আশায় তিনি কাটিয়ে দেন আরও দুই বছর। কিন্তু না; স্বামী আর ফেরেননি। আরেক নারীকে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন তিনি। দেনমোহরের টাকা পেতে আদালতের আশ্রয় নিতে হয় মিলাকে। কিন্তু আজও তা পাননি।

মিলা জানান, চার বছরে পারিবারিক সম্মান নষ্ট হওয়াসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে অনেকেটা ভেঙে পড়েন। কয়েকবার আত্মহত্যার চিন্তাও মাথায় চলে আসে। রাতে তার ঘুম আসত না। বুক ধড়ফড় করত। মনে হতো নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিকমতো খেতে পারতাম না। চেহারাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছিল, কারও কথা শুনতে পারতাম না।

তিনি বলেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলেও আমি বা আমার পরিবারের কেউ মানসিক ডাক্তার দেখানোর কথা চিন্তা করিনি। অবস্থা দিন দিন অবনতি দেখে এক বন্ধু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে এখন বেশ ভালো অনুভব করছি।

মিলা বলেন, আমি এই বিষয়ে উদাসীন ছিলাম। ভাবতাম ডাক্তার কীভাবে আমার এই সমস্যা সমাধান করবে। মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করত। কিন্তু ওই চিকিৎসক দেখানোর পর আমি অনেক ভালো অনুভব করছি। ঘুম হচ্ছে, খেতে পারছি। যে বিষয়গুলো মানতে কষ্ট হতো সেই বিষয়গুলো এখন মাথায়ই আসে না।

শুধু মিলা নন ; মানসিক সমস্যায় থাকা অধিকাংশই চিকিৎসা নেয়ার বিষয়ে উদাসীন। তারা গুরুত্বই দেন না। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার পর ৯০ শতাংশের ওপর নেতিবাচক মানসিক প্রভাব পড়েছে। অথচ তাদের ৭৮ শতাংশই কোনো ধরনের মানসিক সেবা নেননি। মাত্র ২২ শতাংশ সেবা নিয়ে ভালো ফল পেয়েছেন।

————————————————————————————————————–

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ২০১৮-১৯ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগেন। তাদের ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বিষণ্নতা এবং ৪ দশমিক ৫ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগে ভোগেন। অথচ এদের ৯২ শতাংশেরও বেশি বিজ্ঞানসম্মত কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাননি বা নেননি। একই জরিপের ফল অনুযায়ী, ১৮ বছরের কমবয়সী শিশু-কিশোরদের মাঝে মানসিক রোগাক্রান্তের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। যাদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কখনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসেনি।

————————————————————————————————————–

মানসিক রোগে ভোগা সত্ত্বেও এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাবঞ্চিত থাকার পেছনে নানা কারণ উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হচ্ছে- মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর স্বল্পতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র-শয্যা-ওষুধসংকট, বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যে নগণ্য বরাদ্দসহ বিভিন্ন কারণের পাশাপাশি একটি বড় প্রভাবক হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব এবং কুসংস্কার।

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তারা মানসিক সেবা সম্পর্কে ঠিকমতো ধারণা রাখেন না। সামাজিক ট্যাবু বা লজ্জার কারণ ভেবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছেন ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। সেবা কোথা থেকে নিতে পারবেন সেই বিষয়ে জানেন না বলে জানিয়েছেন ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সেবা গ্রহণ করেননি ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী।

খবর : অন্য দৈনিক

ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালে এই হাসপাতালের অন্তবিভাগে ৫৯ হাজার ৮২৯ জন, বহির্বিভাগে ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫৬ জন এবং জরুরি বিভাগে ৫৬ হাজার ৫৪১ জন সেবা নিয়েছেন।

—————————————————————————————————————-

জানা গেছে, দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসক অনেক কম। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কর্মরত জনশক্তি প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যার জন্য মাত্র ০ দশমিক ৫০ জন। দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইক্রিয়াট্রিস্ট) আছেন ৩৫০ জনের মতো। অর্থাৎ প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যার জন্য ০ দশমিক ১৭ জন। সাইকোলজিস্ট আছেন ৫৬৫ জন; প্রতি ১ লাখের জন্য ০ দশমিক ৩৪ জন। সাইক্রিয়াটিক সোশ্যাল ওয়ার্কার ৭ জন। প্রতি ১ লাখের জন্য শূন্য দশমিক ৪ জন। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আছেন ৩২৪ জন। প্রতি ১ লাখে ০ দশমিক ১৮ জন।

—————————————————————————————————————-

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, জেলা-উপজেলার হাসপাতালে মানসিক সেবার চিকিৎসক নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রামের আওতায় দেশের ১০টি জেলার চিকিৎসকদের কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারা কিছু সেবা দিতে পারেন।

তিনি বলেন, সংকট সমাধানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানোর চেষ্টার পাশাপাশি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের মাধ্যমে চিকিৎসক বাড়ানো যেতে পারে। এ ছাড়া প্রাইমারি স্বাস্থ্যসেবায় যারা আছেন তাদের বেসিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনলে তারা ন্যূনতম সাপোর্ট দিতে পারেন। এমবিবিএস কারিকুলামে পরিধি বাড়ানো যেতে পারে। সাইক্রাটিক নার্সিং ডিপ্লোমা চালু হয়েছে। আগামীতে প্রথম ব্যাচ বের হবে। এটিও চলমান রাখার তাগিদ দেন তিনি। পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. তাইয়্যেবুর রহমান বলেন, দেশে মানসিক রোগীদের জন্য হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ১ হাজার ২১০টি। এর মধ্যে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে তিন শ, পাবনায় পাঁচ শ শয্যা, বিএসএমএমইউতে ৪০ শয্যা, সরকারি ৩৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা রয়েছে মাত্র ১৫০টি। সিএমএইচে ২০ শয্যা ও ড্রাগ এডিকশনে (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন) ২০০ শয্যা।

তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় একীভূত করতে হবে। মানসিক রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে শহর থকে গ্রাম পর্যন্ত- সর্বত্র। সামাজিক নিরাপত্তা-স্থিতিশীলতা ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য মাদক নির্মূলে রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনও আরও সক্রিয় ও গতিশীল করতে হবে।

ডা. মো. তাইয়্যেবুর রহমান বলেন, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের জন্য যথেষ্ট পদ সৃষ্টি করা। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসার পাশাপাশি গুরুতর মানসিক রোগীদের পুনর্বাসনের ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নতুন বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য ২.০ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!